হোম প্রচ্ছদ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে আমানতে ধস

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে আমানতে ধস


Warning: date() expects parameter 2 to be long, string given in /home/sharebiz/public_html/wp-content/themes/Newsmag/includes/wp_booster/td_module_single_base.php on line 290

সোহেল রহমান: ধস নেমেছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর আমানত সংগ্রহে। ৮০’র দশকের মাঝামাঝি সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো যে হারে আমানত সংগ্রহ করতো, বর্তমানে তা নেমে এসেছে অর্ধেকেরও কমে। তবে আমানতের হার কমলেও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় মোট আমানতকারীর সংখ্যা অন্যান্য ব্যাংকের তুলনায় বেশি। ব্যাংক পরিচালনায় সনাতনী ধ্যান-ধারণা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা, পেশাদারিত্ব ও আন্তরিকতার অভাবে প্রতি বছরই ব্যাংক খাতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অংশগ্রহণ কমছে। অন্যদিকে সহজে ও দ্রুত সেবা প্রাপ্তি, অধিক মুনাফা ও নিত্যনতুন সেবাপণ্যে চটকদার অফারের কারণে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর প্রতি ঝুঁকছেন গ্রাহক।

দেশের ব্যাংক খাতের তিন দশকের (১৯৮৫-২০১৫) লেনদেনের চিত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৮৫ সালে দেশের ব্যাংক খাতে মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৭১ শতাংশ আমানতই ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয়। অন্যদিকে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় আমানতের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ১৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ ও ছয় দশমিক ৩৭ শতাংশ। এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোয় আমানতের পরিমাণ ছিল চার দশমিক ৪০ শতাংশ।
কিন্তু পরবর্তী প্রথম (১৯৯৫), দ্বিতীয় (২০০৫) ও তৃতীয় দশকে (২০১৫) রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় আমানতের পরিমাণ কমে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৬২ শতাংশ, ৪০ দশমিক ৫১ শতাংশ ও ২৮ দশমিক ২৮ শতাংশে। অর্থাৎ তিন দশকে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় আমানতের পরিমাণ কমেছে প্রায় ৪৩ শতাংশ। একই সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোয়ও আমানতের পরিমাণ কমেছে এক থেকে দেড় শতাংশের বেশি। বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোয় আমানতের পরিমাণ বরাবরই বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর চেয়ে কম। অন্যদিকে আলোচ্য সময়ে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় (ইসলামি ব্যাংকগুলোসহ) আমানতের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ২৭ দশমিক ৮৬, ৪৬ দশমিক ৪৮ ও ৬৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ। অর্থাৎ তিন দশকে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় আমানতের পরিমাণ বেড়েছে ৪৬ দশমিক ১০ শতাংশ।

পর্যালোচনায় দেখা যায়, আমানতের পরিমাণ ও হারের দিক থেকে পিছিয়ে পড়লেও আমানতকারীর সংখ্যা ও হারে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। যদিও গত তিন দশকে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় আমানতকারীর হার ব্যাপক কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৮৫ সালে দেশের ব্যাংক খাতে মোট আমানতকারীর সংখ্যা ছিল এক কোটি ৪৫ লাখ ৭২ হাজার ৩৮৯ জন। এর মধ্যে ৭৫ শতাংশ আমানতকারীই ছিলেন রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর। অবশিষ্টের মধ্যে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ও রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোয় আমানতকারীর হার ছিল যথাক্রমে ১৩ শতাংশ ও ১১ দশমিক ৩৪ শতাংশ। আর বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় আমানতকারীর হার ছিল মাত্র দশমিক ছয় শতাংশ।

কিন্তু পরবর্তী সময়ে প্রথম (১৯৯৫), দ্বিতীয় (২০০৫) ও তৃতীয় দশকে (২০১৫) রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় আমানতকারীর হার কমে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৭১ দশমিক ৭০, ৬২ দশমিক ৩৭ ও ৩৯ দশমিক ৮৮ শতাংশে। অর্থাৎ তিন দশকে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় আমানতকারীর হার কমেছে ৩৫ শতাংশের বেশি। তবে এক্ষেত্রে একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকে আমানতকারীর হার কমলেও তিন দশকে বিশেষায়িত ব্যাংকে আমানতকারীর হার বেড়েছে তিন শতাংশের বেশি। অন্যদিকে আলোচ্য সময় বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকে (ইসলামি ব্যাংকগুলোসহ) আমানতকারীর হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ১৪ দশমিক ৫৩, ২৩ দশমিক ৫৪ ও ৪৫ শতাংশ। অর্থাৎ তিন দশকে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় আমানতকারীর হার বেড়েছে ৩২ শতাংশ। এছাড়া বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় আমানতকারীর হার এখনও এক শতাংশের কম।
ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় ক্ষুদ্র আমানতকারীর সংখ্যা অধিক হওয়ায় মোট আমানতের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম হলেও আমানতকারীর সংখ্যা বেশি। অন্যদিকে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ঝোঁক মূলত বড় আমানতকারীর দিকে। সে কারণে ওইসব ব্যাংকে আমানতকারীর সংখ্যা কম হলেও আমানতের পরিমাণ বেশি।

বাড়ছে ইসলামি ব্যাংকিং

দেশে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের ব্যাপ্তি বাড়ছে। গত দেড় দশকে ইসলামি ব্যাংকগুলো রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে। পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০০০ সালের পর থেকে ইসলামি ব্যাংকগুলোয় আমানত ও আমানতকারীর হার বাড়ছে।
২০০০ সালে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ইসলামি ব্যাংকগুলোয় মোট আমানতের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ১৯ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা (২৫.৪০%) ও চার হাজার ৬৮৭ কোটি টাকা (৬.০৭%)। পরবর্তী সময়ে ২০০৫, ২০১০ ও ২০১৫ সালে উভয় ক্যাটাগরির ব্যাংকে মোট আমানতের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৫২ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা (৩৪.২২%) ও ১৮ হাজার ৯৯২ কোটি টাকা (১২.২৬%); এক লাখ ৬৪ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা (৪৪.৭০%) ও ৫৯ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা (১৬.১১%); তিন লাখ ৫৭ হাজার ৬৯৬ কোটি টাকা (৪৫.০৫%) ও এক লাখ ৫৩ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকা (১৯.৩৯%)। অর্থাৎ তিন দশকে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় আমানত বেড়েছে আড়াইগুণ আর মাত্র দেড় দশকে ইসলামি ব্যাংকগুলোয় বেড়েছে তিনগুণেরও বেশি।

সর্বশেষ পরিস্থিতি

সার্বিকভাবে ব্যাংক খাতে আমানতের সুদহার হ্রাস, সঞ্চয়পত্রের সুদহার নিয়ে টানা-হেঁচড়া, গত কয়েক বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত একাধিক ব্যাংকে বড় ধরনের ঋণ কেলেঙ্কারি এবং অনিয়ম সত্ত্বেও সার্বিকভাবে ব্যাংক খাতে আমানতের পরিমাণ ও আমানতকারীর সংখ্যা বাড়ছে। তবে মোট আমানতের পরিমাণ বাড়লেও প্রবৃদ্ধির হার কমেছে। ২০১৪ সালে ব্যাংক খাতে আমানত প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ। গত বছর (২০১৬) এ প্রবৃদ্ধির হার কমে দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ১২ শতাংশে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০১৬ সালের শেষে ব্যাংক খাতে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে আট লাখ ৯৯ হাজার ৪১৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় ২৮ দশমিক ১৫, বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় ৪৫ দশমিক ২৩, ইসলামি ব্যাংকগুলোয় ১৯ দশমিক ৫৬, বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় চার দশমিক ১৮ ও রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোয় দুই দশমিক ৮৮ শতাংশ আমানত রয়েছে। এর আগের বছর (২০১৫) ব্যাংক খাতে মোট আমানতের পরিমাণ ছিল সাত লাখ ৯৩ হাজার ৯৮২ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংক খাতে মোট আমানত বেড়েছে এক লাখ পাঁচ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা।

অন্যদিকে আলোচ্য বছরে ব্যাংক খাতে মোট আমানতকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে আট কোটি ১৪ লাখ ২৬ হাজার ৯৪৬ জন। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় ৪০ দশমিক ৫০, বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকে ২৭ দশমিক ৫২, ইসলামি ব্যাংকগুলোয় ১৮ দশমিক শূন্য দুই, রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকে ১৩ দশমিক ৫২ ও বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকে দশমিক ৪৪ শতাংশ আমানতকারী রয়েছেন। এর আগের বছর (২০১৫) ব্যাংক খাতে মোট আমানতকারীর সংখ্যা ছিল সাত কোটি ৬২ লাখ ২৩ হাজার ৪৬৪। এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংক খাতে মোট আমানতকারী বেড়েছে ৫২ লাখ ৩ হাজার ৪৮২ জন।