রিইনভেস্টমেন্ট আইন অনুমোদনে বিলম্ব কেন?

গতকালের শেয়ার বিজে প্রকাশিত ‘আলোর মুখ দেখছে না মিউচুয়াল ফান্ডের রিইনভেস্টমেন্ট আইন’ শিরোনামের খবরটি এর মধ্যে অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকবে। প্রতিবেদক জানিয়েছেন, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত মিউচুয়াল ফান্ডে লভ্যাংশ হিসেবে রিইনভেস্টমেন্ট বন্ধ করতে আইনের সংশোধনী খসড়া প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত হলেও তিন বছরেও তার অনুমোদন দিতে পারেনি বা দেয়নি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। খেয়াল করার মতো বিষয়, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলাপচারিতায় এ দৈনিক অনেকটা নিশ্চিত হয়েছে রিইনভেস্টমেন্ট চান না তারা। কারণটাও স্পষ্ট। গত কয়েক বছর ধরে রিইনভেস্টমেন্ট আকারে বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দিচ্ছে একাধিক মিউচুয়াল ফান্ড; তাতে ইউনিট হোল্ডারদের সর্বমোট ক্ষতি হয়েছে অন্তত ৫০০ কোটি টাকা। এ অবস্থায় তারা রিইনভেস্টমেন্টে আগ্রহী হবেন না, তা সহজেই অনুমেয়। প্রশ্ন হলো, তাহলে কেন আইনটির অনুমোদন দিচ্ছে না নিয়ন্ত্রক সংস্থা? নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্চেন্ট ব্যাংক কর্মকর্তা আমাদের জানিয়েছেন, ‘একটি পক্ষকে সুযোগ করে দিতেই বিএসইসি সম্ভবত বিষয়টি ঝুলিয়ে রেখেছে। তা না হলে বিষয়টি এতদিনে চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ার কথা’। তার এ মতের সমর্থন সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও পেয়েছি আমরা। তবু কারিগরি ইস্যু বিবেচনায় এ ব্যাপারে বিএসইসির ভূমিকা নিয়ে ঢালাও মন্তব্য করা যুক্তিযুক্ত হবে না। অবশ্য সে ক্ষেত্রে জিজ্ঞাস্যÑসংশোধিত রিইনভেস্টমেন্ট আইনে কী এমন রয়েছে, যা একটি পক্ষকে সুবিধা দেবে আর ক্ষতিগ্রস্ত করবে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের?

প্রস্তাবিত সংশোধনী খসড়ায় বলা হয়েছে, কোনো মিউচুয়াল ফান্ড থেকে বিনিয়োগকারীদের কতটুকু লভ্যাংশ বাবদ রিইনভেস্টমেন্ট হিসেবে দিতে পারবেÑতা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হবে। কোনো মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটপ্রতি সম্পদ মূল্য ওই ফান্ডের বাজারদরের তুলনায় কম হলে লভ্যাংশ আকারে রিইনভেস্টমেন্টের প্রস্তাব করতে পারবে না সম্পদ ব্যবস্থাপক কোম্পানি। মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর রাখার ধারা অন্তর্ভুক্ত করা হবে; চাইলে মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডকে বে-মেয়াদিতে রূপান্তরের সুযোগ বহাল থাকবে। আরও লক্ষণীয়, লভ্যাংশ আকারে রিইনভেস্টমেন্টের অনুমোদন থাকলেও বিনিয়োগকারীকে নগদ বা রিইনভেস্টমেন্টÑউভয় পদ্ধতির মাঝে যে কোনো একটি বেছে নেওয়ার সুযোগ প্রদানের ইস্যুটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে প্রস্তাবিত খসড়ায়। বিচার্য বিষয়, মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর জন্য সুযোগ কিন্তু খুব কম রাখা হয়েছে এতে। অবশ্যই এখানে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অগ্রাধিকারের প্রশ্নটি ক্ষুণœ হচ্ছে না। কিন্তু এ বাস্তবতা অস্বীকারের উপায় নেই যে, মিউচুয়াল ফান্ডগুলো পুঁজিবাজারেরই গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যদি এ ফান্ডগুলোকে বাজারে বেআইনি ঘোষণা করা হতো, তাহলে একটা কথা ছিল। ওগুলোকে কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন দেওয়া হবে, আবার তাদের ব্যবসা বন্ধের লক্ষ্যে অযাচিত হস্তক্ষেপ করা হবেÑএমনটা কাম্য নয় মোটেই। দুশ্চিন্তা এ নিয়েও রয়েছে যে, এখনই একশ্রেণির মিউচুয়াল ফান্ড যে পরিমাণ শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, তাতে প্রস্তাবিত খসড়া আইনে কোনো রকম ছাড় দেওয়া হলে এরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে। সে ক্ষেত্রে এগুলো যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায়, তাও বড় বিবেচ্য। এ অবস্থায় নীতিনির্ধারকদের উচিত হবে প্রস্তাবিত চূড়ান্ত খসড়ায় যথাসম্ভব ভারসাম্য বজায় রেখে দ্রুত আইনটি অনুমোদনের লক্ষ্যে ব্যবস্থা নেওয়া। যদি কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকেওÑবিষয়টি এত দিন ঝুলিয়ে রাখা ঠিক হবে না। হতে পারে, বিএসইসি’র সিদ্ধান্তহীনতার জন্যই অহেতুক সন্দেহ করছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। আর আমরা বিশ্বাস করি, এ ধরনের বিলম্ব পুঁজিবাজারের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়। তাতে বিভ্রান্তির অবকাশ রয়ে যায়। ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইস্যুটির দ্রুত সুরাহা করবে, এমনটাই কাম্য।