রেকর্ড ৯ হাজার ৩১০ কোটি টাকা লোকসানে পিডিবি

ইসমাইল আলী:  গত ১০ বছরে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বেড়েছে তিনগুণের বেশি। এর মধ্যে বেসরকারি খাতের অংশই বেশি। যদিও এসব কেন্দ্রের বড় অংশই ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলভিত্তিক। এতে উচ্চ মূল্যে বিদ্যুৎ কিনে কম মূল্যে বিক্রি করায় প্রতি বছর বড় অঙ্কের লোকসান গুনছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। তবে গত অর্থবছর সংস্থাটির লোকসান রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে।
তথ্যমতে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড় ব্যয় ছিল ছয় টাকা ২৫ পয়সা। আর এ বিদ্যুৎ বিক্রির পাইকারি (বাল্ক) মূল্য ছিল চার টাকা ৮৪ পয়সা। এতে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে পিডিবির লোকসান দাঁড়ায় ৯ হাজার ৩১০ কোটি ১৫ লাখ টাকা। সংস্থাটির ইতিহাসে এটি সর্বোচ্চ লোকসান। এর আগে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে সর্বোচ্চ সাত হাজার ২৮২ কোটি ৯৯ লাখ টাকা লোকসান দিয়েছিল পিডিবি।
এদিকে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে চার হাজার ৪৩৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা লোকসান দিয়েছিল পিডিবি। এ হিসেবে গত অর্থবছর সংস্থাটির লোকসান বেড়েছে চার হাজার ৮৭৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা বা প্রায় ১১০ শতাংশ। যদিও গত অর্থবছরই পিডিবিকে প্রথমবারের মতো ৯৫৬ কোটি ২০ লাখ টাকা ভর্তুকি দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। তবে ভর্তুকি বাদ দিয়েও সংস্থাটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ লোকসান হয়েছে গত অর্থবছর। আর গত ১০ বছরে সংস্থাটির পুঞ্জীভূত লোকসান দাঁড়িয়েছে ৪৯ হাজার ৫৩৩ কোটি ২৩ লাখ টাকা।
রেকর্ড লোকসানের পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে বলে মনে করেন পিডিবির মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্যিক পরিচালক) মো. কাওসার আমীর আলী। তিনি শেয়ার বিজকে বলেন, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো এখন আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সরাসরি জ্বালানি তেল আমদানি করে। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ায় বেসরকারি তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। এছাড়া ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধিও এগুলোর ব্যয় বৃদ্ধির আরেকটি কারণ।
তিনি আরও বলেন, গত অর্থবছর নতুন এক হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার তেলভিত্তিক কেন্দ্র বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করেছে। পাশাপাশি গ্যাসের সংকটের কারণে পুরোনো কয়েকটি কেন্দ্রও তেলে চালাতে হয়েছে। আবার বিদ্যুতের বাল্ক মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হলেও তা অনুমোদন করেনি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। উল্টো তা ছয় পয়সা কমানো হয়েছে। সব মিলিয়ে পিডিবির লোকসান বেড়ে গেছে।
পিডিবির তথ্যমতে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সংস্থাটির লোকসান ছিল তিন হাজার ৮৭৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। এর আগে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে পিডিবি লোকসান গুনে ছয় হাজার ৮০৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা, ২০১২-১৩ অর্থবছর পাঁচ হাজার ৪৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকা, ২০১১-১২ অর্থবছরে ছয় হাজার ৬৯৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ও ২০১০-১১ অর্থবছরে চার হাজার ৬২০ কোটি ৬৪ লাখ টাকা।
তার আগের দুই অর্থবছর পিডিবির লোকসান ছিল অনেক কম। এর মধ্যে ২০০৯-১০ অর্থবছরে সংস্থাটি লোকসান গুনে ৬৩৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকা ও ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ৮২৮ কোটি ৬১ লাখ টাকা। তবে ওই দুই অর্থবছরে বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল খুবই কম।
এদিকে লোকসানের ঘাটতি মেটাতে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রতি বছর ঋণ নিচ্ছে পিডিবি। আবার এ ঋণের ওপর তিন শতাংশ সুদও দাবি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। যদিও লোকসানের কারণে ঋণ পরিশোধ না করে তা ভর্তুকিতে রূপান্তরের জন্য বরাবরই প্রস্তাব দিয়ে আসছে পিডিবি। প্রতিবারই বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ঘোষণায় সরকারের প্রতি এ আহ্বান জানিয়েছে বিইআরসি। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত অর্থবছরই বিদ্যুৎ খাতে প্রথম ভর্তুকি দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়।
যদিও লোকসানের ঘাটতি পূরণে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে এখনও ৫০ হাজার ৭৪০ কোটি ৪৯ লাখ টাকা ঋণ রয়েছে পিডিবির। এর মধ্যে বাজেটারি সহায়তা বাবদ দেওয়া হয়েছে ৪৩ হাজার ১৬০ কোটি ১২ লাখ টাকা। আর সরকারি ঋণ সাত হাজার ৫৮০ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। এতে পিডিবির ব্যালেন্স শিটের অবস্থা খুবই করুণ হয়ে পড়েছে।
বিপুল এ আর্থিক চাপ সামাল দিতে পিডিবিকে প্রদত্ত পুরো ঋণ মওকুফ বা ভর্তুকিতে রূপান্তর করার বিকল্প নেই বলে মনে করেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী খালেদ মাহমুদ। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দেশের বিদ্যুৎ ঘাটতি নিরসনের লক্ষ্যে সরকারি খাতের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের এ খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করছে। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন বর্তমান অবস্থায় পৌঁছেছে। তবে বেসরকারি কেন্দ্রগুলো থেকে উচ্চ মূল্যে বিদ্যুৎ কেনায় পিডিবির বড় অঙ্কের লোকসান হচ্ছে। এজন্য ঋণ মওকুফ চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে দুই মন্ত্রণালয়ের মধ্যে আলোচনা চলছে।
গতবছর অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে এ বিষয়ে বলা হয়েছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী পিডিবিকে প্রদত্ত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় সরকার যে অর্থ প্রদান করে, তার ঋণ-ইক্যুইটি অনুপাত ৪০: ৬০ রাখার বিধান রয়েছে। কিন্তু বিগত ২০১৪-১৫ অর্থবছরের নিরীক্ষিত হিসাব অনুযায়ী পিডিবির ঋণ-ইক্যুইটি অনুপাত ১১৪: (১৪)। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী তা ৪০: ৬০-এ উন্নীত করার লক্ষ্যে পিডিবির ঋণকে ইক্যুইটিতে রূপান্তর করা দরকার।
এতে আরো বলা হয়, পিডিবির আওতায় ইসিএ ফাইন্যান্সিং-সহ ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করে একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ প্রদানের সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য পিডিবির ফিন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্ট ও ব্যালেন্স শিট অবলোকন করে থাকে। এক্ষেত্রে ইক্যুইটি ঋণাত্মক থাকায় ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করছে ও সরকার কর্তৃক প্রদত্ত ঋণকে ইক্যুইটিতে রূপান্তরের জন্য পিডিবিকে পরামর্শ প্রদান করেছে।
জানতে চাইলে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, বিভিন্ন বিদেশি ব্যাংক ও সংস্থা থেকে ঋণ নিয়ে পিডিবি বেশকিছু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে। তারা পিডিবির বিশাল অঙ্কের ঋণের বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করছে। সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে পিডিবিকে এ ঋণের বোঝায় চাপা পড়তে হয়েছে। তাই এ ঋণকে ভর্তুকি বা মওকুফের দাবি জানানো হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে দুই মন্ত্রণালয়ের মধ্যে আলোচনা চলছে। আশা করা যায় শিগগিরই এ বিষয়ে সমাধানে পৌঁছানো যাবে।