রেলওয়ের লোকসান বৃদ্ধির কারণ খতিয়ে দেখুন

জাতীয় সংসদে টেবিলে উত্থাপিত এক প্রশ্নের জবাবে রেলপথমন্ত্রী জানিয়েছেন, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশ রেলওয়ের নিট লোকসান ছিল ১ হাজার ৮৫২ কোটি ৯৪ লাখ ৬৬ হাজার টাকা। সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন মতে, আগের অর্থবছরের তুলনায় এ সময়ে লোকসান বেড়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচশ কোটি টাকা। আরেক প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী অবশ্য জানিয়েছেন, রেলওয়ের যাত্রী পরিবহন উত্তরোত্তর বাড়ছে। এ-সংক্রান্ত কিছু তথ্যও তিনি তুলে ধরেছেন সংসদে। তা সত্ত্বেও রাষ্ট্রায়ত্ত এ সংস্থাটির লোকসান কী কারণে বাড়ল, তা তিনি সংসদকে স্পষ্ট করেননি। আমরা মনে করি, অবস্থার উন্নতির স্বার্থেই এর কারণ খতিয়ে দেখা দরকার। এ লক্ষ্যে রেলপথ মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও প্রত্যাশিত। সমস্যা চিহ্নিতের পাশাপাশি সেগুলো সমাধানে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হলে সংস্থাটি তার লোকসান কমাতে পারবে বলেই ধারণা।
বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে রেলওয়ের উন্নয়নে নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। এসবের উল্লেখযোগ্য হলো অবকাঠামো উন্নয়ন ও জনবল নিয়োগ। অভিযোগ পাওয়া যায়, এ সত্ত্বেও রেলওয়ের সেবার মান খুব একটা বাড়েনি। তাহলে সংস্থাটির আয় বাড়বে কীভাবে? বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও বহুমুখী পরিবহন ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ সামছুল হক সহযোগী এক দৈনিককে কিছুদিন আগে বলেছিলেন, আয় ও লাভ বৃদ্ধির বিবেচনা নয়Ñরেলওয়ের উল্লিখিত প্রকল্পের কোনো কোনোটি গ্রহণ করা হয়েছে নিতান্ত রাজনৈতিক বিবেচনায়। সংস্থাটির আয় বৃদ্ধির যে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে, সেটিও সঠিকভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে তার বক্তব্য গুরুত্বসহ নেওয়া দরকার। মনে রাখা চাই, রেলের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো যদি যথাযথ বিবেচনায় নেওয়া না হয়, তাহলে বিনিয়োগ ও সুদ পরিশোধ বাবদ ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সংস্থাটির লোকসান আরও বাড়বে। এজন্য চলমান প্রকল্পগুলোর যথার্থতা মূল্যায়ন ও উপযুক্ত ক্ষেত্রে এর পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন।
রেলপথে ভ্রমণে যাত্রীদের আগ্রহ এখন বাড়ছে নানা কারণে। এ পথে যাত্রী বৃদ্ধির যে তথ্য মন্ত্রী তুলে ধরেছেন, তার পেছনে ওইসব উপাদান ও বাস্তবতারও ভূমিকা রয়েছে। এ তথ্যও মনে রাখা দরকার, সারা বছর দেশে এখন পরিবহন হয় প্রায় ২৩ লাখ পণ্যবাহী কন্টেইনার। এর প্রায় ৯৩ শতাংশই পরিবহন হয় সড়কপথে। অনেকের জানা, রেলপথে পণ্য পরিবহন অপেক্ষাকৃত সাশ্রয়ী। এ অবস্থায় রেলপথে আকৃষ্ট হওয়ার কথা ব্যবসায়ীদের দৃষ্টি। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠবে, এমন পরিস্থিতিতেও রেলওয়ে সেবাগ্রহীতা, বিশেষত বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন বাড়াতে পারছে না কেন? আমাদের ধারণা, প্রত্যাশিত তথা প্রতিযোগিতামূলক মানের সেবা জোগানো গেলে পণ্য পরিবহন খাত থেকেও আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে রেলওয়ের লোকসান অন্তত কমানো সম্ভব। পণ্য পরিবহন ব্যয় কমলে বাজারেও এর কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা। গত বছর রেলপথমন্ত্রী বলেছিলেন, ২০১৮ সালের মধ্যে রেলের উন্নতি দৃশ্যমান হবে। এ বছরের অর্ধেক সময় কিন্তু অতিবাহিত হতে চলেছে। আমরা চাইব, বছরের বাকি সময়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের উন্নতি সত্যিকার অর্থেই দৃশ্যমান হবে এবং লোকসান কমাতে সক্ষম হবে সংস্থাটি।