রোগটি মনে

মানসিক রোগ হলো কতগুলো আবেগীয়, শারীরিক বা আচরণগত সমস্যা বা অস্বাভাবিকতার সমষ্টি, যা ব্যক্তিকে কষ্ট দেয় বা তার সামাজিক ও দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাহত করে। অন্যভাবে বলা যায়, ব্যক্তির চিন্তা, কাজ, প্রত্যক্ষণ ও অনুভূতি ঠিক যেভাবে হওয়ার কথা সেভাবে না হলে তাকে মানসিক রোগ বলা হয়। অর্থাৎ মানসিক রোগে ব্যক্তির চিন্তা, বিশ্বাস, আবেগ ও কাজে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। এছাড়া শরীরে ব্যথাসহ আপাত নিউরোলজিক্যাল উপসর্গও মানসিক রোগের কারণে হতে পারে। রোগভেদে এগুলোর যেকোনো একটিতে বা সবগুলোর ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ ধরনের অসুস্থতায় মানুষের আচার, আচরণ, কথাবার্তা ও চিন্তাচেতনা অস্বাভাবিক হয়ে
যায়। মৃদু ও তীব্রÑদু’ধরনের হতে পারে মানসিক রোগ

মৃদু
এক্ষেত্রে জীবনের স্বাভাবিক অনুভূতিগুলো (দুঃখবোধ, দুশ্চিন্তা প্রভৃতি) প্রকট আকার ধারণ করে। লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে অহেতুক মানসিক অস্থিরতা, দুশ্চিন্তা-ভয়ভীতি, মাথাব্যথা, মাথাঘোরা, খিঁচুনি, শ্বাসকষ্ট, বুক ধরফর করা, একই চিন্তা বা কাজ বারবার করা (শুচিবাই), অবসাদ, বিষণœতা, অশান্তি, বিরক্তি, অসহায় বোধ, কাজে মন না বসা, স্মরণশক্তি কমে যাওয়া, অনিদ্রা, ক্ষুধামান্দ্য, আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে যাওয়া প্রভৃতি।

তীব্র
এক্ষেত্রে আচার-আচরণ, কথাবার্তা স্পষ্টভাবে অস্বাভাবিক হয়। ফলে আশপাশের মানুষরা এটা বুঝতে পারেন। যেসব লক্ষণ দেখা যায় তা হলো অহেতুক মারামারি, ভাঙচুর করা, গভীর রাতে বাড়ির বাইরে চলে যাওয়া, আবোল-তাবোল বলা, সন্দেহ প্রবণতা, একা একা হাসা ও কথা বলা, নিজেকে বড় মনে করা, বেশি বেশি খরচ করা, স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধি লোপ পাওয়া, ঠিকমতো ঘুম না হওয়া, খাওয়া-দাওয়া ঠিকমতো না করা প্রভৃতি। কয়েকটি মানসিক রোগ সম্পর্কে জেনে নেওয়া যেতে পারে

সিজোফ্রেনিয়া
এটি মস্তিষ্কের মারাত্মক রোগ। এতে মনের স্বাভাবিকতা হারিয়ে যায়। মস্তিষ্কের বিঘœ
ঘটে। মূল কারণ জানা না গেলেও সিজোফ্রেনিয়ার জন্য নি¤œলিখিত কারণগুলো দায়ী বলে মনে করা হয়
পারিবারিক ও বংশগত (মা-বাবার কারও থাকলে তাদের বাচ্চাদের হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে)
পুষ্টিহীনতা
রোগজীবাণু দ্বারা মস্তিষ্কে সংক্রমণ ঘটলে
বিভিন্ন ওষুধ, যেমন ডায়ইউরেটিস
মাথায় আঘাত
লক্ষণ
রোগীর চিন্তাশক্তি নষ্ট হয়
সামাজিক পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে পারে না এবং সমাজ থেকে পৃথক হয়ে যায়
মানসিকভাবে অস্থিতিশীল হয়
রোগীর মনে হয় অন্যেরা তার চিন্তাভাবনা টের পাচ্ছে
রোগী মনে করে তার কর্মব্যস্ততা অন্যের দ্বারা পরিচালিত
রোগীর দৃষ্টিভ্রম হয়
রোগী মনে করে চারপাশের সবাই তার
প্রতি ষড়যন্ত্র করছে। গোপনে তার ক্ষতির চেষ্টা করছে

প্রতিরোধ

মানসিক চাপ কমাতে হবে
মদ ও নেশাজাতীয় খাবার পরিহার করতে হবে
ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চলতে হবে

মৃগীরোগ

মৃগীরোগ আমাদের দেশে অতিপরিচিত। যেকোনো বয়সে এটি হতে পারে। এটা কোনো সংক্রামক রোগ নয়, বরং গুরুতর স্নায়ুরোগ। মস্তিষ্ক মানবদেহের নানা কার্যক্রম পরিচালনা করে। মস্তিষ্কের কোষগুলো হঠাৎ অতিমাত্রায় উত্তেজিত হয়ে পড়লে মৃগীরোগ দেখা দেয়। রোগীর খিঁচুনি হয়। রোগী অজ্ঞান হয়ে যায়। রোগী বারবার আক্রান্ত হয়, কিন্তু পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যায়।

কারণ

মাথায় আঘাত পেলে
জটিল ও দেরিতে প্রসব হলে
মস্তিষ্কে প্রদাহ হলে, যেমন মেনিনজাইটিস
মস্তিষ্কে টিউমার হলে
স মদপানের অভ্যাস থাকলে
চিকিৎসা
রোগীকে নিউরো মেডিসিন (স্নায়ু) বিশেষজ্ঞের কাছে নিতে হবে
ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চলতে হবে
রোগী মূর্ছা গেলে বিপজ্জনক জায়গা থেকে সরিয়ে আনতে হবে। যেমনÑআগুন, পানি, যন্ত্রপাতি প্রভৃতি
রোগী যেন কোনো ধরনের আঘাত না পায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে
মাথা পাশ ফিরিয়ে ও সামান্য নিচের দিকে হেলান দিয়ে রাখতে হবে, যেন ভালোভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারে ও মুখের ফেনা বা লালা গড়িয়ে পড়ে যেতে পারে
রোগীর আশেপাশে ভিড় করা যাবে না
রোগীকে ঘুমাতে দিতে হবে। প্রয়োজনে রোগীকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে
পরামর্শ
যেসব কাজ জীবনের প্রতি ঝুঁকিপূর্ণ তা রোগীর করা উচিত নয়। যেমনÑগাড়ি চালানো, আগুনের পাশে কাজ করা, যন্ত্রপাতি চালানো, উঁচুতে কাজ করা প্রভৃতি
সাঁতার কাটা, গাড়ি চালানো, সাইকেল চালানো প্রভৃতি পুরোপুরি বাদ দিতে হবে
স্বাভাবিক কাজকর্ম চালিয়ে যেতে হবে
মৃগীরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় এমন বিষয় বাদ দিতে হবে

হিসটিরিয়া

হিসটিরিয়ার ফলে স্নায়বিক কর্মকাণ্ড নষ্ট হয়। তবে এর সঙ্গে কোনো দৃশ্যমান রোগের সংস্পর্শ থাকে না। রোগীর অজান্তে হয়ে থাকে রোগটি।
কারণ
কখনও পারিবারিক ইতিহাস থাকে
মানসিক চাপ
ব্যক্তিত্বসম্পন্ন রোগীর ক্ষেত্রে ঘটে
লক্ষণ
সাধারণত তরুণ বয়সে বেশি দেখা যায়
ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের বেশি হয়
হাত-পা শক্ত হয়ে যায়
মুখ শক্ত হয়ে যায়
কাঁপুনি থাকতে পারে
কথা বলতে পারে না
চোখে অন্ধকার লাগে
কানে কম শোনে
কানে ঝিঁঝিঁ শব্দ শোনা যায়
মাঝে মাঝে মাথাব্যথা হয়
বমি হতে পারে
চিকিৎসা
মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে
পরামর্শ
রোগীর প্রতি আন্তরিক হতে হবে
দুশ্চিন্তা-হতাশা কমাতে হবে
ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চলতে হবে