র‌্যাগিং বন্ধে নিয়মিত হল পরিদর্শন করা উচিত

শতাব্দী জুবায়ের: উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় ‘র‌্যাগিং’ নামের এক ধরনের সহিংসতা নীরবে-নিভৃতেই চলে আসছে দীর্ঘকাল থেকে। সদ্য ক্যাম্পাসে আসা এক শিক্ষার্থী কতটা মানসিক চাপে থাকে, সেটা তাদের চেহারার দিকে তাকালেই বোঝা যায়। বাবা-মা, ভাইবোন সবাইকে ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে শিক্ষাগ্রহণ করতে। নতুন আসা শিক্ষার্থীর কাছে ‘র‌্যাগ’ একটি আতঙ্কের নাম। সাধারণত গ্রাম থেকে আসা ছেলেমেয়েরা এর দ্বারা ভুক্তভোগী হয় বেশি। কারণ তারা শহর বা ক্যাম্পাসের এমন পরিস্থিতির সঙ্গে পূর্বপরিচিত নয়। আর এই সহজ-সরল ছেলেমেয়েদের যাচ্ছেতাই ব্যবহার করে কিছু সিনিয়র। শারীরিক ও মানসিক এমন নির্যাতনে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে অনেকে। এমনকি অনেক শিক্ষার্থী ভয়ে আর ক্যাম্পাসেই ফিরতে চায় না।

‘র‌্যাগিং’ মানে নবাগত শিক্ষার্থীদের প্রথমেই একটা হোঁচট খাওয়ার মতো ব্যাপার মনে হয়। এ ভয়াবহ হোঁচট আমিও খেয়েছিলাম। তবে সেটি সেরে উঠতে অনেকটা সময় লেগেছে। তবে এখন ওই সিনিয়রদের দেখলে মন থেকে শ্রদ্ধা আসে না। মানলাম তারা পরিচিত হতে চান; কিন্তু পরিচিতের মাধ্যম কি র‌্যাগ হতে হবে? স্নেহ, ভালোবাসা দিয়ে কাছে নেওয়া যায় না? স্নেহ, ভালোবাসার সম্পর্কের চেয়ে শক্তিশালী সম্পর্ক  আর কী হতে পারে?

র‌্যাগিং কীÑএ বিষয়টা সবার জানা দরকার। র‌্যাগিং হচ্ছে ৫-১০ জন ক্যাম্পাসের সিনিয়র শিক্ষার্থীর সমন্বয়ে নব্য ভর্তি হতে আসা বা ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীকে নানা প্রশ্নে জর্জরিত করে হাসি-তামাশা করা, নানাভাবে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীকে মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতন করা। নতুন শিক্ষার্থীকে করা যে কোনো প্রশ্নের উত্তর সঠিক হলেও প্রশ্নকর্তা নানাভাবে তাকে হাসির পাত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে থাকেন; বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে অপমান করতেও কুণ্ঠাবোধ করেন না। অর্থাৎ আপনি প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিলেও কোনোভাবেই সে উত্তর তাদের কাছে টিকবে না, বরঞ্চ উত্তরের প্রেক্ষাপট নিয়ে আপনাকে আরও বেশি পরিমাণে নাজেহাল করতে পারে। জুনিয়রদের নাজেহালেই থাকে র‌্যাগিংয়ের উদ্দেশ্য এবং সেটা যে কোনো উপায়েই হয়ে থাকে।

কী কী বিষয়ে করানো হয় র‌্যাগিং, এর একটু ধারণা দিতে চাই। পরিচিত হওয়া, পরিচয় দিতে শেখানো, আদব-কায়দা শেখানো, খোঁজ-খবর নেওয়া,  ম্যানার (আদব-কায়দা) শেখানোর নামে রাতভর দাঁড় করিয়ে রেখে শাস্তি দেওয়া, বিভিন্ন দোষ খুঁজে বের করে অশ্রাব্য ভাষায় গালমন্দ ও মারধর করা, মজা, সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্কোন্নয়ন, বড় ভাইদের নাম মুখস্থ রাখা, পিতা-মাতা ও পরিবারের অন্যদের জড়িয়ে অশ্লীল ভাষা ব্যবহার, সবার সামনে পুরোপুরি নগ্ন করে নাচানো, সবার সামনে যৌন অভিনয়ে বাধ্য করা, উলঙ্গ ছবি আঁকানো, পর্নো দৃশ্য দেখতে বাধ্য করা, রাতে মশার কামড় খাওয়ানোর জন্য বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখা, কান ধরে উঠবস করানো, প্রকাশ্যে কোনো মেয়েকে প্রেমের প্রস্তাব দিতে বাধ্য করা, সিগারেট, গাঁজা, মদপানে বাধ্য করা, ম্যাচের কাঠি দিয়ে রুম, মাঠের মাপ নেওয়া, কোনো আদেশ না মানলে গায়ে হাত তোলা ছাড়াও কথার মারপ্যাঁচে বিব্রত করা হয়। র‌্যাগের মধ্যে এগুলোই বেশি দেখা যায়। এসব কি কোনো নিয়মে পড়ে? কোনো বিকৃত মানসিকতার মানুষ ছাড়া এগুলো কেউ করতে পারে?

দেশের মোট উচ্চশিক্ষার্থীর একটি ক্ষুদ্র অংশ (পাঁচ শতাংশ) পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। তারাই দেশের ভবিষ্যৎ কর্ণধার; যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েই তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু তাদের মধ্যেও কেউ যদি র‌্যাগিংয়ের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথমেই ছিটকে পড়েন, তাহলে উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় তৈরি হওয়াটা  অস্বাভাবিক কিছু নয়।

স্বপ্নসিঁড়িতে পা রাখতেই যদি ‘র‌্যাগিং’ আতঙ্কটি তাদের পেছনে লেগে থাকে, তাহলে ওই শিক্ষার্থীকে প্রতিটি ক্ষণ কতটা ভয়াবহভাবে অতিবাহিত করতে হয়Ñতা যারা র‌্যাগিংয়ের শিকার হয়েছিলেন, তারা  সহজেই অনুমান করতে পারবেন।

র‌্যাগিং বন্ধে নিয়মিত হল পরিদর্শন করা উচিত হলের আবাসিক শিক্ষকদের। সিনিয়ররা জুনিয়রদের কাছ থেকে মজা না নিয়ে তাদের কিছু শেখানোর চেষ্টা করা, তাদের মানসিক যাতনা না দিয়ে আশ্রয় দেওয়াই প্রকৃত সিনিয়রের উচিত। শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিতে র‌্যাগিংমুক্ত পরিবেশ আবশ্যক। একজন  শিক্ষার্থী যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখেন, তখন তার শিক্ষা নিশ্চিত করা ও নিরাপত্তা প্রদানের দায়িত্ব থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারে না। নবীন শিক্ষার্থীর পড়ালেখার পরিবেশ সৃষ্টি ও তার নিরাপত্তার পরিবেশ তৈরি করা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারে সবার দায়িত্ব ও কর্তব্য। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন র‌্যাগারদের নিরুৎসাহিত করবে, প্রয়োজনে শাস্তির ব্যবস্থা করবে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া একজন শিক্ষার্থীকে কেন এমন বিষয়ে শাস্তি পেতে হবে! প্রত্যেকে এ বিষয়ে নিজে থেকে সচেতন হলেই র‌্যাগ বন্ধ হয়ে যায়। ‘র‌্যাগ’ নামের নীরব নিপীড়ন নির্যাতন ও চিরস্থায়ী ক্ষত থেকে রক্ষা পাক নবীন শিক্ষার্থীরা।

 

শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

smjubayer85Ñgmail.com