সুস্বাস্থ্য

লক্ষ্মী ট্যারা তাকেই বলে

আমার দিকে তাকিয়েই কথা বলছেন। তবে দেখা যাচ্ছে তিনি অন্যদিকে তাকিয়ে আছেন। চোখের এ ধরনের সমস্যাকে সাধারণত ‘ট্যারা চোখ’ বা ‘লক্ষ্মী ট্যারা’ বলা হয়। সামান্য বাঁকা চোখ দেখতে সুন্দর মনে হয়, তাই একে লক্ষ্মী ট্যারা বলা হয়।
আমাদের চক্ষুগোলকের চারপাশে কিছু মাংসপেশি রয়েছে, যা স্নায়ু দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে চোখের অবস্থান নিয়ন্ত্রণ করে। ডান পাশের পেশি সংকুচিত হলে চোখ ডানদিকে যায়, বাম পাশের পেশি সংকুচিত হলে বামদিকে যায়। স্বাভাবিক অবস্থায় কোনো পেশির সংকোচন না হলে চোখের অবস্থান সোজা থাকে। কোন কারণে স্নায়ু দুর্বলতা কিংবা সরাসরি কোন পাশের মাংসপেশীর দুর্বলতার কারণে চোখের অবস্থানের ভারসাম্যহীনতা ঘটে। ফলে চোখ উল্টো দিকে বেঁকে যায়। একে ট্যারা চোখ বলা হয়। এতে শুধু সৌন্দর্যহানিই ঘটে না, চোখের স্বাভাবিক কর্মশক্তিতেও ব্যাঘাত ঘটে।

কারণ
বিভিন্ন কারণে চোখ ট্যারা হয়। যেমন শিশু ভূমিষ্ট হওয়ার সময় বিলম্ব হলে কিংবা আঘাতপ্রাপ্ত হলে ট্যারা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে ট্যারা চোখের সঙ্গে জন্মগত ছানিপড়া রোগও থাকতে পারে। যেসব মানুষের দৃষ্টিস্বল্পতা রয়েছে, তাদের চোখ মাঝে মধ্যে ও পরবর্তী সময়ে স্থায়ীভাবে ট্যারা হয়ে যেতে পারেন। অনেকের চোখে জন্মগত ও গঠনগত পরিবর্তন থাকে, তারা ট্যারাচোখের অধিকারী হতে পারেন। তাদের বয়স বাড়ার সঙ্গেও চোখ ট্যারা হতে পারে। চোখে আঘাত জনিত কারণে যে কোন বয়সে ট্যারা হতে পারে। কোনো কারণে যে কোনো একটি চোখের দৃষ্টিশক্তি কম থাকলেও ট্যারা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া চোখের মাংসপেশীকে নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ু দূর্বল হয়ে গেলে, অনিয়ন্ত্রিত মাংসপেশী চোখের স্বাভাবিক অবস্থান ধরে না রাখার কারণও অন্যতম। সাধারণত ডায়াবেটিস, ভাইরাসজনিত রোগ, মস্তিষ্কে রক্ত ক্ষরণ, মস্তিস্কের টিউমার প্রভৃতি কারণে স্নায়ু দুর্বল হয়ে চোখ ট্যারা হয়ে যায়। শিশুদের ক্ষেত্রে চোখে ক্যান্সার বা রেটিনো ব্লাসটোমাতে অন্যান্য উপসর্গের সঙ্গে প্রাথমিকভাবে চোখ বাঁকাও হতে পারে।

সমস্যা
চোখ ট্যারা হলে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। ট্যারা চোখটি সাধারণত তারা ব্যবহার করে না। ফলে এক সময় ওই চোখ অকার্যকর হয়ে পড়ে। তাছাড়া বাঁকা চোখের ভেতর দিয়ে আলোকরশ্মি চোখের সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ ম্যাকুলায় যেতে পারে না বিধায় চোখের কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়। একে অ্যামব্লায়োপিয়া বা অলস চোখ বলা হয়। সাধারণত ১২ বছরের আগে বাঁকা চোখের সঠিক চিকিৎসা না করালে শিশুদের অ্যামব্লায়োপিয়া হতে পারে। স্নায়ু দুর্বলতার কারণে চোখ বাঁকা হলে, রোগী একটি জিনিসকে ২টি দেখতে পারে। একে ডিপ্লোপিয়া বলা হয়। ডিপ্লোপিয়ার কারণে রোগীর দৈনন্দিন কর্মজীবন বিঘিœত ঘটে। ট্যারা চোখের রোগীদের অনেক সামাজিক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। এদের অস্বাভাবিক মনে করে অন্যরা তাদের সঙ্গে সহজে মিশতে চায় না। এতে তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। বিবাহযোগ্য ছেলে-মেয়েরা ট্যারা চোখ নিয়ে বেশ অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়েন।

চিকিৎসা
শিশুদের ক্ষেত্রে দেরি না করে চোখ পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া উচিত। চশমা দিয়ে দৃষ্টি স্বল্পতার চিকিৎসা করালে অনেক ক্ষেত্রে চোখ সোজা হয়ে যায়। ডাক্তারের পরামর্শে প্রিজম নামক স্বচ্ছ লেন্স ব্যবহারের মাধ্যমে অনেক বাঁকা চোখ সোজা হয়। অপারেশনের মাধ্যমেও ট্যারা চোখ সোজা করা যায়। মাংসপেশীর কিছু অংশ কেটে সুবিধাজনক স্থানে আবার সেলাই করে লাগিয়ে দিলে কাজ হয়। অর্থাৎ এতে নতুন করে চোখের ভারসাম্য তৈরি হয়ে বাঁকা চোখ সোজা হয়ে যায়। আর অবশ্যই মনে রাখতে হবে, ১০ থেকে ১২ বছর বয়সের আগেই ট্যারা বা লক্ষ্মী ট্যারা চোখের চিকিৎসা করাতে হবে। তবে সব ট্যারা চোখের অপারেশনের দরকার পড়ে না। চিকিৎসকদের দেওয়া কিছু চোখের ব্যায়াম ও চশমা দিয়ে যদি বাঁকা চোখ সোজা না হয় তাহলে অপারেশন দরকার হতে পারে। এজন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

সর্বশেষ..



/* ]]> */