‘লক্ষ্য অর্জনে এগিয়ে যেতে হবে’

 

একটি প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন বিভাগ-প্রধানের সাফল্যের ওপর নির্ভর করে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও’র সফলতা। সিইও সফল হলে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা বেশি হয়। খুশি হন শেয়ারহোল্ডাররা। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সিইও’র সুনাম। প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও), কোম্পানি সচিব, চিফ কমপ্লায়েন্স অফিসার, চিফ মার্কেটিং অফিসারসহ এইচআর প্রধানরা থাকেন পাদপ্রদীপের আড়ালে। টপ ম্যানেজমেন্টের বড় অংশ হলেও তারা আলোচনার বাইরে থাকতে পছন্দ করেন। অন্তর্মুখী এসব কর্মকর্তা সব সময় কেবল প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকেন। সেসব কর্মকর্তাকে নিয়ে আমাদের নিয়মিত আয়োজন ‘টপ ম্যানেজমেন্ট’। শেয়ার বিজের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এবার এনভয় টেক্সটাইলস লিমিটেডের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) সাইফুল ইসলাম, এফসিএমএ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. হাসানুজ্জামান পিয়াস

সাইফুল ইসলাম, এফসিএমএ, এনভয় টেক্সটাইলস লিমিটেডের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও)। ঢাকা কলেজ থেকে অ্যাকাউন্টিংয়ে স্নাতকোত্তর শেষে কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্সি পেশাগত ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। তিনি দি ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএমএবি) একজন সম্মানিত ফেলো

শেয়ার বিজ: ক্যারিয়ারের গল্প দিয়ে শুরু করতে চাই

সাইফুল ইসলাম, এফসিএমএ: ক্যারিয়ার শুরু করি ২০০৫ সালে অ্যাসেট ডেভেলপমেন্টস অ্যান্ড হোল্ডিংস লিমিটেডের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফাইন্যান্স বিভাগের এক্সিকিউটিভ হিসেবে। এরপর এনএজেড বাংলাদেশ লিমিটেডে যোগ দিই। তারপর সুবাস্তু ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডে কিছুদিন কাজ করার পর ২০০৮ সালে এনভয় টেক্সটাইলস লিমিটেডে সিনিয়র ম্যানেজার হিসেবে যোগ দিই। ২০১২ সালে পদোন্নতি পেয়ে সিএফও হিসেবে দায়িত্ব নিই।

শেয়ার বিজ: পেশা হিসেবে ফাইন্যান্সকে কেন বেছে নিলেন?

সাইফুল ইসলাম: ছোটবেলা থেকে ইচ্ছা ছিল বাণিজ্য বিভাগে পড়ালেখা করব। এটি একদিকে যেমন ভালো চাকরির সুযোগ করে দেয়, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানে ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে কাজ করার সুযোগ থাকে। এমন চিন্তা নিয়েই বাণিজ্য বিভাগে পড়ালেখা করি। এরপর কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্সি নিয়ে পেশাগত পড়ালেখা শেষ করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নানা দায়িত্ব পালনের পর ফাইন্যান্স পেশায় চলে আসি।

শেয়ার বিজ: প্রতিষ্ঠানে দক্ষ ফাইন্যান্স কর্মকর্তার ভূমিকা গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে চাই

সাইফুল ইসলাম: দক্ষ ফাইন্যান্স কর্মকর্তার ভূমিকা ও গুরুত্ব অনেক। তিনি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ আর্থিক নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। একই সঙ্গে ফাইন্যান্স প্ল্যানিং, বাজেটিং ও কস্ট কন্ট্রোলিংয়ের দায়িত্বে থাকেন ফাইন্যান্স কর্মকর্তা। তাছাড়া শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ বিবেচনা করে প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্বও ফাইন্যান্স কর্মকর্তার ওপর বর্তায়। প্রতিষ্ঠানের মুনাফা বৃদ্ধিতে যথাযথ সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে থাকেন তিনি। ফাইন্যান্স বিভাগ প্রতিষ্ঠানের সব দিক সম্পর্কে অবগত থাকে। প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা, শক্তিশালী দিক বা কোথায় উন্নতির প্রয়োজন সবকিছু সম্পর্কে সঠিক স্বচ্ছ ধারণা ফাইন্যান্স বিভাগের কাছেই থাকে। ফাইন্যান্স বিভাগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ প্রজেকশন। প্রতিষ্ঠানের অতীত, বর্তমান ফাইন্যান্সিয়াল গ্রোথ অ্যানালাইসিস করে, সরকারের নানা পলিসি চিন্তা করে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা বা ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্ত নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ফাইন্যান্স বিভাগ। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানের টেকসই উন্নয়নে ফাইন্যান্স বিভাগের গুরুত্ব বা ভূমিকা অপরিসীম।

শেয়ার বিজ: ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট (এফআরএ) প্রতিষ্ঠানের ওপর কেমন প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন?

সাইফুল ইসলাম: অনেক সমালোচনার পর এফআরএ পাস হয়েছে। কাউন্সিল গঠন হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের ওপর এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করি। ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিংয়ের স্বচ্ছতা বাড়ানোর জন্য আইনটি করা হয়েছে। এটা ভালো উদ্যোগ। প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীর জন্য ভালো হবে। কিন্তু সঠিকভাবে বাস্তবায়ন জরুরি। আর যেসব প্রতিষ্ঠান তাদের ফাইন্যন্সিয়াল রিপোর্ট স্বচ্ছতার সঙ্গে তৈরি করে আসছে কিংবা প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরছে, আইন-কানুন সবকিছু মেনে কাজ করছে, তাদের জন্য এটি মোটেও বোঝা নয়।

শেয়ার বিজ: বাংলাদেশের করনীতিকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

সাইফুল ইসলাম: ভ্যাট, আয়কর ও করপোরেট করের বিষয়টি বেশ জটিল। করপোরেট করের বিষয়টি নিয়ে আরও চিন্তার সুযোগ রয়েছে। আমাদের এ সেক্টরের কথা যদি বলি, নতুন যে কর আইন করা হয়েছে, তা মোটেও সুখকর নয়। রফতানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য অগ্রিম কর, ন্যূনতম প্রদেয় কর হিসেবে গণ্য করার আইন করাই এক বিশাল বোঝা হিসেবে দেখা দিয়েছে। আমার মনে হয় এর পুনর্মূল্যায়ন দরকার। ব্যক্তিগত আয়করের বিষয়টিতে ন্যূনতম আয়ের যে পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে, তা বর্ধিত করা যেতে পারে। বিনিয়োগ রেয়াতের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা উচিত বলে মনে করি।

শেয়ার বিজ: কর্মক্ষেত্রে ফাইন্যান্স কর্মকর্তার জন্য চ্যালেঞ্জিং বিষয় কী?

সাইফুল ইসলাম: সময়ের সঙ্গে আইন-কানুন, তথ্যপ্রযুক্তি, ব্যবসার পরিবেশ-পরিস্থিতি পরিবর্তিত হচ্ছে, যা এ পেশার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। একজন ফাইন্যান্স কর্মকর্তার অন্যতম বড় দায়িত্ব হচ্ছে, বিভিন্ন কমপ্লায়েন্সকে পরিপালন করা। আর একটি প্রতিষ্ঠানের ফাইন্যান্সিয়াল কমপ্লায়েন্সগুলো কমপ্লাই করার পাশাপাশি প্রতিনিয়তই নানা নতুন আইন-কানুন যোগ হচ্ছে কিংবা পরিবর্তন হচ্ছে। এ সবকিছুর সঙ্গে সব সময় আপডেট থাকার সঙ্গে তা পরিপালন করাটাও কম চ্যালেঞ্জের নয়। এছাড়া প্রতিষ্ঠানের বাজেটিং ও কস্ট কন্ট্রোলিংয়ের মধ্যেও বেশ চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

শেয়ার বিজ: পেশা হিসেবে ফাইন্যান্স কর্মকর্তাকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

সাইফুল ইসলাম: দায়িত্বপূর্ণ ও সম্মানজনক একটি পেশা ফাইন্যান্স। প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ফাইন্যান্স কর্মকর্তা।

শেয়ার বিজ: যারা পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের উদ্দেশে কিছু বলুন

সাইফুল ইসলাম: আগ্রহীদের স্বাগত জানাই। লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে হবে। সেটি হতে পারে কাজের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে, নানা প্রশিক্ষণ নিয়ে কিংবা নানা ধরনের পেশাগত ডিগ্রির মাধ্যমে। আর দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা রাখতে হবে। কোথায় কোন অবস্থানে নিজেকে দেখতে চান, তার পরিকল্পনা করতে হবে। ওই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য কী কী করতে হবে, তা ছক করে নিতে হবে। নিজের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে একটি একটি করে তার সমাধান করতে হবে। প্রতিষ্ঠানের পণ্য, ব্যবসার প্রকৃতি ছাড়াও বিভিন্ন বিভাগের কাজের ধরন সম্পর্কে জানতে হবে, বুঝতে হবে।

শেয়ার বিজ: সফল ফাইন্যান্স কর্মকর্তা হতে হলে কী কী গুণ থাকা জরুরি বলে মনে করেন?

সাইফুল ইসলাম: প্রথমত ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টরের নানা বিষয়ে গভীর জ্ঞান রাখতে হবে। যেমন অ্যাকাউন্টিং প্রসেস, ফাইন্যান্স প্রসেস, ফান্ড ম্যানেজমেন্ট, আয়কর, ভ্যাট, আমদানি, রফতানি, কাস্টমস অ্যান্ড বন্ড, কোম্পানির ইন্টারনাল অডিট, কস্টিং অ্যান্ড বাজেটিং প্রভৃতি। এরপর প্রতিষ্ঠানের অপারেশন বুঝতে হবে, কোম্পানির পণ্য ও তার প্রকৃতি, মার্কেটিং ডিস্ট্রিবিউশন সম্পর্ক জ্ঞান রাখতে হবে। কেবল অ্যাকাউন্টস কিংবা ফাইন্যান্স নয়, অন্য বিভাগের সঙ্গেও কাজ করার মানসিকতা থাকতে হবে। প্রযুক্তি ব্যবহারে হতে হবে দক্ষ, সময়ের সঙ্গে নিজেকে আপডেট রাখতে হবে। এছাড়া সৎ, দক্ষ ও পরিশ্রমী হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।