লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং আর ঝুট কাপড়ে সমৃদ্ধ বগুড়ার অর্থনীতি

উত্তরের বিভিন্ন জেলার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আবর্তিত হচ্ছে বিভিন্ন খাত ঘিরে। এসব খাত একদিকে অবদান রাখছে জেলাগুলোর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে, অন্যদিকে কর্মসংস্থানেও ভূমিকা রাখছে। উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডভিত্তিক এসব খাত নিয়ে ধারাবাহিক আয়োজনের চতুর্থ পর্ব

মেহেদী হাসান: বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের এক ঐতিহ্যবাহী জেলা বগুড়া। কৃষি, শিল্প আর ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর ভর করেই ঘুরছে এখানকার অর্থনীতির চাকা। ফলে বেড়েছে কর্মসংস্থান, চাঙ্গা হয়ে উঠছে জেলার অর্থনীতি। তবে বগুড়ার অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছে মূলত ঝুট কাপড় আর লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং (বিশেষত কৃষি যন্ত্রাংশ)।

বগুড়ার লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প দেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বর্তমানে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ কৃষি যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশের ৮০ শতাংশ চাহিদা মেটায় বগুড়ার লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প। অন্যদিকে ঝুট কাপড় থেকে শীতবস্ত্র তৈরিও বড় ভূমিকা রাখছে এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে।

বগুড়া শহরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথা এলাকায় একটি সরু গলিতে গড়ে উঠেছে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প, যেখানে পানির পাম্প, টিউবওয়েল, সেন্টিফিউগাল পাম্প, লাইনার, পিস্টন, শ্যালো ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ, সাইকেল, রিকশা পার্টস, জুট মিলের যন্ত্রাংশ, পিনারসহ নানা ধরনের কৃষি যন্ত্রাংশ তৈরি করা হয়।

বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প মালিক সমিতির তথ্যমতে, বগুড়ার এই শিল্পাঞ্চলে প্রায় এক হাজার ছোট, বড় ও মাঝারি মানের কৃষিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ও ওয়ার্কশপ রয়েছে, যেখানে প্রায় এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে। বগুড়ায় তৈরি এসব কৃষি যন্ত্রপাতি বিক্রি করার জন্য বগুড়া শহরে গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি মার্কেট, যেখানে রয়েছে তিন শতাধিক বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান। তাদের বার্ষিক বিক্রি হাজার কোটি টাকার ওপরে। বগুড়ার এই শিল্পাঞ্চল দেশের অভ্যন্তরীণ কৃষি যন্ত্রপাতি এবং যন্ত্রাংশের ৮০ শতাংশ পূরণ করে। এছাড়া পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতেও বগুড়ায় তৈরি বেশ কিছু যন্ত্রাংশ রফতানি হয় বলে সমিতি সূত্রে জানা যায়।

ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি ও মেসার্স কামাল মেশিন টুলসের স্বত্বাধিকারী কামাল মিয়া শেয়ার বিজকে বলেন, ‘স্বাধীনতার পর থেকে এখানকার স্থানীয় কারিগররা চট্টগ্রাম ডকইয়ার্ডসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভাঙা জাহাজের লোহালক্কড়সহ পরিত্যক্ত লোহা সংগ্রহ করে। তারপর এসব লোহা গলিয়ে নানা ধরনের কৃষি যন্ত্রাংশ তৈরি করা হয়। এসব যন্ত্রাংশের চাহিদা এখন সারা দেশের কৃষকদের কাছে।’

কৃষিভিত্তিক এই শিল্পের ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও নানা সমস্যার কারণে তা দ্রুত এগিয়ে যেতে পারছে না। এসব সমস্যার সমাধান এবং সরকারি সহযোগিতা পেলে এই শিল্প দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রফতানি করে প্রচুর পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।

বেলাল ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসের স্বত্বাধিকারী আলাউদ্দিন বেলাল ১৯৯১ সাল থেকে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত। লায়নার, পিস্টন, শ্যালো ও ডিপ মেশিনের যাবতীয় খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরি করেন তিনি। জানতে চাইলে তিনি বলেন, রংপুর, দিনাজপুর, ঢাকা, পটুয়াখালী, বরগুনা এবং খুলনাসহ দেশের প্রায় প্রতিটি জেলাতেই আমাদের কৃষি যন্ত্রাংশের চাহিদা রয়েছে।

কৃষি যন্ত্রাংশের সমস্যার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘চায়নার যন্ত্রাংশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় আমরা টিকতে পারছি না। কেননা চায়নার যন্ত্রাংশ দেখতে আমাদের যন্ত্রাংশের তুলনায় অনেক চকচকে ও মসৃণ। তাই ক্রেতারা আমাদের পণ্যের চেয়ে চায়নার পণ্য কিনতেই বেশি আগ্রহী।’ তাই দেশে যেসব কৃষি যন্ত্রাংশ তৈরি করা হয়, তা আমদানি নিষিদ্ধ করার দাবি জানান তিনি।

বগুড়ার কৃষি যন্ত্রাংশ শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলেন, আমরা দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখলেও এই খাত এখন অবহেলার শিকার। এই শিল্পের জন্য একটি জোন তৈরি করা অনেকদিনের দাবি। আমাদের কারখানায় লোহার যন্ত্রাংশ তৈরি করা হলেও মেটালকে ট্রিটমেন্ট করা হয় না বলে অনেক উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে অপূর্ণতা থেকে যায়। হিট ট্রিটমেন্টের অভাবে তার সঠিক স্থায়িত্ব থাকে না। তাই বগুড়ায় একটি হিট ট্রিটমেন্ট (এক ধরনের যন্ত্র) অত্যন্ত জরুরি। সরকার কৃষি খাতে ভর্তুকি দিচ্ছে। যদি এই শিল্পে এরকম কোনো সুবিধা দেওয়া হয়, তাহলে উৎপাদিত কৃষি যন্ত্রপাতির উৎপাদন খরচ কম হবে। কৃষক কম মূল্যে যন্ত্রপাতি পাবে। এছাড়া এই শিল্পকারখানায় চাহিদামতো গ্যাসের সরবরাহ দেওয়ার আহ্বান জানান তারা।

অন্যদিকে বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার সাঁওইল গ্রামে গড়ে উঠেছে এক বড় তাঁতশিল্প, যেখানে পোশাক কারখানার ঝুট কাপড় থেকে তৈরি হয় নানা ধরনের শীতবস্ত্র। সাঁওইল বাজার সুতা ব্যবসায়ী সমিতির তথ্যমতে, গ্রাম ও এর আশপাশে প্রায় ১৫ হাজার তাঁতশিল্পে প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক কাজ করেন। এছাড়া গ্রামের কারিগরদের তৈরি শীতবস্ত্র ও সুতা বিক্রি করতে সাঁওইল বাজারে এক হাজার দুইশর বেশি দোকান রয়েছে। সপ্তাহে রোববার ও বুধবার সাঁওইল বাজারে হাট বসে। সেখানে প্রতি হাটেই প্রায় ১০ কোটি টাকার লেনদেন হয়। মূলত শীতকে কেন্দ্র করেই এই হাট জমে ওঠে। শীতের সময় প্রায় ৫০টি জেলার মানুষ এই গ্রামে শীতবস্ত্র কিনতে আসেন। তবে সারা বছরই কম-বেশি বেচাকেনা চলে।

বগুড়া শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরের এই গ্রামটি যে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে এত বড় ভূমিকা রাখবে, তা হয়তো ১৯৮৫ সালের আগে কেউ চিন্তাও করেনি। ঝুট কাপড়ে কীভাবে একটি গ্রামের মানুষের ভাগ্য বদলে যায়, সেই গল্পই বলছিলেন সাঁওইল বাজার সুতা ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন।

তিনি জানান, ১৯৮৫ সাল থেকে সাঁওইল গ্রামে এই ব্যবসা শুরু হয়। ঢাকা, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পোশাক কারখানায় যেসব ঝুট কাপড় জমা হতো তা তারা সংগ্রহ করতেন। এই ঝুট কাপড়গুলো একসময় ফেলে দেওয়া হতো। তবে বগুড়ার ব্যবসায়ীরা এগুলো সংগ্রহ করে নিয়ে আসতেন। এরপরে তারা কোনো ধরনের আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়াই এসব কাপড় থেকে সুতা বের করেন এবং সেই সুতা থেকে তৈরি করেন বাহারি ডিজাইন আর কারুকার্যমণ্ডিত শীতবস্ত্র। এর মধ্যে রয়েছে কম্বল, চাদর, সুয়েটার, মাফলার, তোয়ালে, কার্ডিগান, গামছাসহ নানা ধরনের পোশাক। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয় সেগুলো।

তোফাজ্জল হোসেন জানান, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা ভিড় জমান বগুড়ার সাঁওইল গ্রামে। দেশের নামিদামি ব্র্যান্ডগুলোও এই গ্রাম থেকে শীতবস্ত্র সংগ্রহ করে। এছাড়া সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ত্রাণকাজে ব্যবহার করা শীতবস্ত্রের জোগান দেন এখানকার ব্যবসায়ীরা।

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের কাছে কোনো কিছুই ফেলনা নয়। আমরা ঝুট কাপড় সংগ্রহের পর সেটা থেকে সুতা বের করি। এর মধ্যে ভালো মানের সুতা দিয়ে শীতবস্ত্র তৈরি হয়। আর নিম্নমানের সুতা দিয়ে দড়ি তৈরি হয়। এছাড়া যেসব সুতা একেবারেই নিম্নমানের, অর্থাৎ যা দিয়ে দড়িও তৈরি করা সম্ভব নয়, সেগুলো দিয়ে তুলা তৈরি করি। লেপ-তোশক ও বালিশ তৈরিতে এ তুলা ব্যবহার করা হয়।’

সাঁওইল গ্রামের ব্যবসায়ীরা জানান, একসময় এই অঞ্চলের মানুষ নানারকম অভাবে দিন পার করতো। তবে এখন সবাই সচ্ছল। ঝুট কাপড়ের ব্যবসা এই এলাকার মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করে দিয়েছে।

সুতা ব্যবসায়ী নুর ইসলাম বলেন, ‘আমাদের গ্রামে এখন আর কোনো ভিক্ষুক নেই। এখানে সবাই কাজ করে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করেছে। কেউ ভিক্ষা চাইতে এলে তাকে আমরা কাজে লাগিয়ে দিই।’

সাঁওইল গ্রামের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উন্নয়নে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে সরকারের এসএমই (ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প) ফাউন্ডেশন। এসব উদ্যোক্তাদের মাঝে স্বল্পসুদে ঋণ সহায়তা দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ফলে ওই অঞ্চলের শীতবস্ত্র ও সুতা ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসাকে আরও প্রসারিত করেছেন; কমেছে ব্যবসায় ঝুঁকি, বেড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য। তবে এই ঋণ সহায়তার পরিমাণ আরও বাড়ানোর আহ্বান জানান সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

আগামীতে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে শীতবস্ত্র বিদেশে রফতানির সম্ভাবনা দেখছেন সাঁওইল অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা। তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি নানারকম সমস্যার কথাও জানান তারা। তারা বলেন, এখানকার তাঁতশিল্পের কারিগরদের প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা হলে নতুন নতুন ডিজাইনের পোশাক তৈরি করতে পারবেন তারা।

ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে পণ্য পরিবহনে নানা ধরনের বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন সাঁওইল গ্রামের উদ্যোক্তারা। এছাড়া সাঁওইল বাজারকে সম্প্রসারিত করতে তিন থেকে চারতলা ভবন নির্মাণে সরকারি সহায়তার দাবি জানান এ অঞ্চলের শীতবস্ত্র ও সুতা ব্যবসায়ীরা।