লাখো কোটি টাকার ঘরে খেলাপি ঋণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা। আর অবলোপনকৃত ঋণসহ এ পরিমাণ এক লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকঋণের এ চিত্র দাঁড়িয়েছে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ এ পরিমাণ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য থেকে জানা যায়, রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংক মিলে মোট যে ঋণ বিতরণ হয়েছে তার মধ্যে ১১ দশমিক ৫৪ শতাংশ খেলাপি। অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকেই খেলাপির হার দাঁড়িয়েছে ৩১ দশমিক ২৩ শতাংশ। মোট খেলাপি ঋণের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতেই পরিমাণ ৪৮ হাজার ৮০ কোটি টাকা। গত জুনের তুলনায় সরকারি ও বেসরকারি খাতের ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সূত্র জানিয়েছে।
খেলাপি ঋণ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর শেষে দেশের সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ব্যাংক খাতে মোট বিতরণ করা ঋণের মধ্যে খেলাপি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণ স্থিতির ১১ দশমিক ৫৪ শতাংশ। এই সময় পর্যন্ত দেশের ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ করেছে আট লাখ ৬৮ হাজার সাত কোটি টাকা। এর সঙ্গে আদায় অযোগ্য হওয়ায় খেলাপি থেকে বাদ দেওয়া অবলোপনকৃত (রাইট অফ) ঋণের পরিমাণ যোগ করলে টাকার অঙ্কে এই পরিমাণ এক লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকাররা।
সূত্র অনুযায়ী, চলতি বছরের গত জুন শেষে ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৮৯ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত ঋণের ১০ দশমিক ৪১ শতাংশ ছিল। তিন মাসের ব্যবধানে গত জুনের তুলনায় খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১০ হাজার ৩০ কোটি টাকা।
তিন মাসের ব্যবধানে বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘ব্যাংকের ঋণ মঞ্জুরির দুর্বলতার কারণে ঋণ খেলাপি হয়ে যেতে পারে। অনেক সময় ইচ্ছাকৃত খেলাপিরা ঋণ নিয়ে দেয় না। আবার প্রকৃত অনেক কারণেও ঋণখেলাপিতে পরিণত হতে পারে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকেরও তদারকির দুর্বলতা থাকতে পারে। ঠিক কোন কারণে তিন মাসে এত বেশি ঋণ খেলাপি হলো সেটা আলাদা করে বলা কঠিন।’
তবে ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ আবার ১০ শতাংশের ঘরে নেমে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, সেপ্টেম্বর শেষে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ছয় ব্যাংকের (সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক, বিডিবিএল) খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৪৮ হাজার ৮০ কোটি টাকা, যা ওই সময় পর্যন্ত এ খাতের ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের ৩১ দশমিক ২৩ শতাংশ। ওই সময় পর্যন্ত এই ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণ ছিল এক লাখ ৫৩ হাজার ৯৩৩ কোটি টাকা। গত জুন শেষে এসব ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের ২৮ দশমিক ২৪ শতাংশ খেলাপি ঋণ ছিল।
এছাড়া বেসরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৪৩ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা, যা ওই সময় পর্যন্ত বিতরণ করা ঋণের ছয় দশমিক ৬৫ শতাংশ। সেপ্টেম্বর শেষে বিতরণ করা ঋণের স্থিতি ছিল ছয় লাখ ৬৫ হাজার ৩১৫ কোটি টাকা। গত জুন শেষে এসব ব্যাংকের মোট বিতরণকৃত ঋণের ছয় দশমিক শূন্য এক শতাংশ খেলাপি ছিল। এছাড়া বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৩৮২ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ খাতের ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের স্থিতি ছিল ৩৩ হাজার ৫৮২ কোটি টাকা।
বিশেষায়িত দুই ব্যাংকের খেলাপি ঋণ (বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক রাকাব) দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজার ২৪১ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বর শেষে এই দুই ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণ ছিল ২৪ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা।
গত ডিসেম্বরে (২০১৭) দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের স্থিতি ছিল ৭৪ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা। মার্চ শেষে তা বেড়ে হয় ৮৮ হাজার ৫৮৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, জুনে হয় ৮৯ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা। সে হিসেবে ৯ মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২৫ হাজার ৬৭ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, গত জুন পর্যন্ত প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ রয়েছে বলে জানা গেছে। যেসব খেলাপি ঋণ আর আদায় করা সম্ভব নয়, সেই ঋণগুলো অবলোপন করে (রাইট অফ) ব্যাংকগুলো তাদের স্থিতিপত্র পরিষ্কার রাখতে চেষ্টা করে। সে হিসেবে বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ রয়েছে প্রায় এক লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকার বেশি।
প্রতি তিন মাস পরপর ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের তথ্য প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে তথ্য নিয়ে সে তথ্য সংকলন করে ওই প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়। গতকাল বুধবার ওই প্রতিবেদন চূড়ান্ত করেন গভর্নর ফজলে কবির বলে দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে।