প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

লাখো গ্রাহককে ক্ষুদ্রঋণ দেওয়া ‘স্বনির্ভর’ এখন নিজেই অসহায়

গত শতকের শেষদিকে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সোনালী, অগ্রণী ও কৃষি ব্যাংক থেকে অর্থ নিয়ে ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ করেছিল ‘স্বনির্ভর বাংলাদেশ’ নামের একটি এনজিও। প্রথমদিকে ভালোভাবে চললেও অব্যবস্থাপনার কারণে ২০০০ সালের পর গ্রাহক থেকে ওই ঋণ আর আদায় করা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ ১৯ বছর পর এখন হঠাৎ ঋণ আদায়ে সরাসরি গ্রাহককে চিঠি দিচ্ছে ব্যাংকগুলো। বিস্মৃতির আড়ালে চলে যাওয়া দু’দশক আগের ঋণ পরিশোধের চিঠি পেয়ে রীতিমতো যেন আকাশ থেকে পড়েছেন গ্রাহক। কয়েকজন ঋণগ্রহীতা এরই মধ্যে মারাও গেছেন। এ নিয়ে তিন পর্বের ধারাবাহিকের শেষ পর্ব আজ।

মাসুম বিল্লাহ ও শেখ শাফায়াত হোসেন: অসহায় ও দরিদ্র মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের লক্ষ্যে ১৯৭৫ সালে যাত্রা করে বেসরকারি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান ‘স্বনির্ভর বাংলাদেশ’। লাখ লাখ কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ করে আসা এই বেসরকারি সংস্থাটি (এনজিও) এখন মৃতপ্রায়। ঢাকার লালমাটিয়ায় সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়সহ দুটি ভবন রয়েছে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে সংস্থাটির কার্যক্রম। ১৯৯৮ সালে সংস্থাটি কয়েকটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের কাছ থেকে বড় অঙ্কের তহবিল নিয়ে ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ করে। সংস্থাটির মাঠকর্মীদের দুর্বলতায় এক সময় ওই ঋণগুলোর কিস্তি আদায় বন্ধ করে দেয় স্বনির্ভর বাংলাদেশ। দীর্ঘ দু’দশক পর এখন ব্যাংকগুলো নিজেরাই ওই ঋণ আদায়ে সরাসরি গ্রাহকদের চিঠি দিচ্ছে। অবশ্য বকেয়া ঋণ হলেও এতকাল পর হঠাৎ করে সমুদয় ঋণ একসঙ্গে ফেরতের চিঠি পেয়ে হতবাক গ্রাহকও।
গত ১৮ জুন ‘স্বনির্ভর বাংলাদেশ’-এর বর্তমান কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা পেতে লালমাটিয়ায় সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, ভবনের সামনের সবগুলো ফটকই বন্ধ। ঠিক কোন ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করা যাবে, তা বুঝে উঠতেই বেশ সময় লেগে যাবে যে কোনো আগন্তুকের। ভবনটির বাইরে থেকে ভেতরের যতটুকু দেখা যায়, তাতে রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব ফুটে ওঠে। বাইরে থেকে ভবনের ওপরতলার একটি জানালা দিয়ে সিলিংফ্যান চলতে দেখে বোঝা যায় ভেতরে কেউ আছে। পরে বন্ধ সদর দরজার পাশের ছোট একটি পকেট দরজায় কয়েকবার কড়া নাড়ার পর ভেতর থেকে একজন এসে প্রতিবেদকের পরিচয় ও আগমনের হেতু জানতে চান। এর কিছুক্ষণ পর ভেতর থেকে একজন অফিস সহায়ক এসে জানান, অফিসে কথা বলার মতো কেউ নেই। পরে ফোন নম্বর জোগাড় করে ‘স্বনির্ভর বাংলাদেশ’-এর অর্থায়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ গিয়াসউদ্দিনের সঙ্গে কথা হয় প্রতিবেদকের।
গিয়াসউদ্দিন জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে এনজিওটির সঙ্গে যুক্ত। এখনও অনেক জেলায় তাদের ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম রয়েছে। তবে ১৯৯৮ সালের ওই ঋণগুলো সম্পর্কে তার কোনো ধারণা নেই।
রাজধানীর লালমাটিয়ার শতকোটি টাকা মূল্যের দুটি অফিস থাকার পরও বেসরকারি সংস্থাটির সংকট কাটছে না। জানা গেছে, ঋণ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে পড়ায় প্রায় ৭০০ কোটি টাকা মাঠে পড়ে ছিল। মাঝে কিছুদিন গ্রুপিং, দখল আর পাল্টা দখলের ভিড়ে সংস্থার শতকোটি টাকাও বেহাত হওয়ার উপক্রম হয়। কর্মীদের বেতন-ভাতা বকেয়া। কর্তৃত্ব নিয়ে দুই গ্রুপের পাল্টাপাল্টি কমিটি, কয়েক মাস পরপর প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় দখলে নেওয়া আর মামলা-মোকদ্দমায় সংস্থাটির সব অর্জন ভেস্তে যেতে থাকে।
জানা গেছে, সাবেক সচিব ও সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) সাবেক চেয়ারম্যান এসএম আল-হোসায়নী ১৯৭৫ সালে স্বনির্ভর বাংলাদেশ গঠন করেন। এর অঙ্গসংগঠন হিসেবে ১৯৮১ সালে গঠন করা হয় ‘স্বনির্ভর ওয়ার্কার্স ট্রাস্ট’। প্রতিষ্ঠাকালে কফিল উদ্দিন মাহমুদকে সভাপতি করে ১১ সদস্যের একটি ট্রাস্টি কমিটি গঠন করা হয়। পরবর্তী সময়ে এসএম আল-হোসায়নী সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ট্রাস্টের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কৃষিবিদ মমতাজ উদ্দিন খান, সাবেক সচিব এমএ সাত্তার, সাবেক আইজিপি আলমগীর এমএ কবির প্রমুখ। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া থেকে কার্যক্রম শুরু করে ‘স্বনির্ভর বাংলাদেশ’। বর্তমানে দেশের ৪৪ জেলায় এর কার্যক্রম আছে।
২০১২ সালে স্বনির্ভর বাংলাদেশের সভাপতি এসএম আল-হোসায়নী সংস্থার পরিচালক (করপোরেট রিলেশন) আক্তার হোসেন খানের পরামর্শে স্বনির্ভর বাংলাদেশের গভর্নিং বোর্ডের সদস্য (ট্রেজারার) হিসেবে নজরুল ইসলাম খানকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর থেকে সংস্থার পরিচালনায় কার্যনির্বাহী কমিটির মধ্যে দ্বিধাবিভক্তি শুরু হয়। সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এসএম আল-হোসায়নীকে সরিয়ে দেওয়ারও প্রক্রিয়া শুরু হয় তখন। এক পর্যায়ে এসএম আল-হোসায়নীকে সংস্থায় আত্তীকরণের অভিযোগে বরখাস্ত করা হয়। সংস্থার পুরোনো ও প্রতিষ্ঠাকালীন কর্মকর্তাদের প্রধান কার্যালয় থেকে বের করে দেওয়া হয়।
এরপর থেকে মামলা-মোকদ্দমার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির নানা পটপরিবর্তন ঘটে। নতুন কমিটি ভেঙে দেওয়ার জন্য সমাজসেবা অধিদফতরে অভিযোগ করেন এসএম আল-হোসায়নী। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০১৭ সালের ১৩ মার্চ নতুন কমিটির সব সদস্যকে বরখাস্ত করে সমাজসেবা অধিদফতর। ওইদিনই সমাজসেবা অধিদফতর থেকে পাঁচ সদস্যের একটি তত্ত্বাবধায়ক কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়। কমিটির আহ্বায়ক করা হয় সারোয়ার আলম রাজীবকে।
বরখাস্ত কার্যনির্বাহী কমিটির সভাপতি, সহসভাপতি ও কোষাধ্যক্ষ আগেই পদত্যাগ করায় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ড. মামুন অর রশীদ স্বনির্ভর বাংলাদেশের প্রধান কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে সমাজসেবা কার্যালয়ের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে ২০১৭ সালের ৬ এপ্রিল তত্ত্বাবধায়ক কমিটির আহ্বায়কের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করেন।
বর্তমানে এসএম আল-হোসায়নী আবারও স্বনির্ভর বাংলাদেশের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। তবে সার্বিক বিষয়ে তার মন্তব্য নিতে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে বেহাল অবস্থা দেখা যায়। স্বনির্ভর বাংলাদেশের অর্থায়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন বলেন, ‘চেয়ারম্যান এসএম আল-হোসায়নী এখন অনেক বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। তাকে পাওয়া যাবে না। তিনি এখন অফিসে তেমন একটা আসেন না।’

ট্যাগ »

সর্বশেষ..