দুরে কোথাও

লাল শাপলার সাতলা বিলে

সাতলা নামের মধ্যে আছে এক অন্য রকম আদিমতা। প্রকৃতির যত সৌন্দর্যের অনেকটাই তার আদিমতার মধ্যে। আধুনিকতার আড়ালে অনেক বুনো সৌন্দর্য বিলীন। তবে নয়াকান্দি গ্রামটা এখনও ব্যতিক্রম। বলছি বরিশালের উজিপুর উপজেলার নয়াকান্দি গ্রামের সাতলা বিলের কথা।
অনেক বছর ধরে যাই-যাই করে যাওয়া হয়নি। এবার সুযোগ হয়ে গেল। দুই দিনের ট্রিপ। ঈদের আগের এক রাতে লঞ্চে চড়ি। লঞ্চ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আমার খুবই কম। রাজধানীর সদরঘাট থেকে লঞ্চ ছাড়ে রাত ৯টায়। সব ঠিক থাকলে বরিশাল ঘাটে পৌঁছাবে ভোর ৪টায়। এ দীর্ঘসময় ফেসবুকিং, গল্পগুজব আর একটু ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিলাম। লঞ্চ পৌঁছাল সময়মতো। ঘাট থেকে অটোতে করে চলে যাই শহরের ১নং পুল ঘাটে, এখানে আমার বন্ধুর বাড়ি। পুরোটা দিন ওদের সঙ্গে আড্ডা, নাশতা, বিশ্রাম ও ভোজন সেরে অতঃপর বিকালে বরিশাল শহরের প্ল্যানেট পার্কে ঘোরাঘুরি। সময়টা যে কখন কেটে গেল টেরই পেলাম না। রাতের লঞ্চে লিটন ভাইয়েরাও আসবেন।
সাতলা বিলের ফুটন্ত লাল শাপলা দেখতে হলে যতটা সম্ভব ভোরে পৌঁছাতে হবে উজিপুরে। তাই সেলফোনে তাদের বারবার বলতে হচ্ছে যেন এক মিনিটও নষ্ট না হয়। বরিশালবাসীর জনপ্রিয় বাহন মাহেন্দ্রর চালক গিয়াসকেও সেভাবেই বলা। আমিও আজ বেশি রাত না জেগে মোবাইল ফোনে অ্যালার্ম দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি।
সকালের ফাঁকা রাস্তার সুযোগে দেড় ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছাই নয়াকান্দির কালবিলা। সড়কের পাশে খেয়াঘাট। গাড়ি থেকে নেমে হুড়মুড় করে নৌকায় চড়ে বসি। দূর থেকেই চোখে ধরা দেয় লাল শাপলা। ছোট নৌকা এগিয়ে যায়। যতই এগোয়, ততই যেন চোখে-মুখে মুগ্ধতা।
একসময় নিজেকে আবিষ্কার করি বিশাল লালের মধ্যে। লাল শাপলার রাজ্যে নৌকা চলে, আমি বিস্ময়ে তাকিয়ে রই। পুরো সাতলা বিলটিই মনে হয় ফরাসি লাল মখমলে ঢাকা। যুগল ছাড়া তখনও কোনো পর্যটক আসেনি। ফলে বিলের মধ্যে একটা নিঝুম ভাব। মাঝেমধ্যে টুপটাপ মাছের লাফঝাঁপ। সাতলা বিলের চারপাশ পুরোটাই নৈসর্গিক। বিশাল আয়তনের এ সাতলা বিল থেকে অনেক পরিবারের সদস্যরা শাপলা বিক্রি করে জীবিকানির্বাহ করেন। থই-থই পানির বুকে মাথা উঁচু করে থাকা সবুজে ঘেরা বিচ্ছিন্ন বাড়িগুলোর সৌন্দর্য বেশ দৃষ্টিনন্দন। আর নারকেল গাছে থাকা থোকায় থোকায় ডাব তৃষ্ণার্ত ভ্রমণপিয়াসীদের বেশ হাতছানি দেয়।
মাঝি মতিলাল রায় জানালেন, আগে এখানে সাদা ও বেগুনি শাপলা ফুটত। এখন আর দেখা যায় না। তিনি প্রায় ৫০ বছর ধরে বিলটিতে এ রকম হাজার হাজার শাপলা ফুটতে দেখছেন। আগে তেমন পর্যটক আসতেন না। এখন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীর আগমন ঘটে। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের আর্থিক সচ্ছলতা এসেছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আনাগোনা বাড়তে থাকে। ধীরে ধীরে নৈঃশব্দ্য ভাবটা উবে গেল পর্যটকদের বিচরণে।
গ্রামটা ঘুরে দেখি। সকাল প্রায় সোয়া ১০টায় আবার পানিতে ভাসি। ততক্ষণে শাপলা অনেকটাই গুটিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ দৃষ্টিতে এলো বিলের একপাশে সাদা সাদা কী যেন ভাসছে। মাঝি জানালেন ডেপ ফুল। নৌকা সেদিকটায় গেল। অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য। সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে জানতে পারলাম, এগুলো চাঁদমালা ফুল। ডেপ আঞ্চলিক নাম। সত্যি বলতে কি, আমি এ ফুলের নাম কখনও শুনিনি। ফুলের নামও যেমন চাঁদমালা, এর বিচরণও তেমনÑমালার মতোই পানিতে ভেসে আছে।

যেভাবে যাবেন
প্রতিদিন রাত সাড়ে ৮টা থেকে ৯টা পর্যন্ত বেশ কয়েকটি বিলাসবহুল লঞ্চ সদরঘাট থেকে বরিশালের উদ্দেশে ছাড়ে। লঞ্চ টার্মিনাল থেকে রিজার্ভ করা মাহেন্দ্রে অথবা নথুল্লাবাদ থেকে বাসে উজিরপুর উপজেলার হারতার নয়াকান্দি।

খরচ
লঞ্চের ডেকে ভাড়া জনপ্রতি ১৫০ টাকা। কেবিন এক হাজার টাকা থেকে পাঁচ হাজার টাকার ওপরে। মাহেন্দ্র সারা দিনের জন্য দুই হাজার টাকা। নৌকা ভাড়া দরদাম করে নেওয়াই ভালো।

রবিউল কমল

সর্বশেষ..