লুব-রেফ (বাংলাদেশ) লিমিটেড

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭২ সালে অর্থনীতিতে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন এক টগবগে যুবক। তখন ড. মুহাম্মদ ইউনূস ছিলেন তার শিক্ষক। তিনি ও বিভাগের অন্য শিক্ষকরা উদ্যোক্তা হওয়ার প্রেরণা দিতেন তাকে। তারা যে কোনো কাজে নেমে পড়ার পরামর্শও দিতেন। কারণ যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে জাতীয়করণের সময়ে ব্যক্তি উদ্যোগে

ব্যবসা-বাণিজ্য করার তেমন সুযোগ ছিল না। কর্মসংস্থানের সুযোগ কম ছিল। অবকাঠামোও উন্নত ছিল না। শুধু ছিল সরকারি চাকরির সুযোগ। এ সীমিত সম্ভাবনার মাঝে প্রতিনিয়ত সংশয়ে কাটত তার সময়। ক্ষণে ক্ষণে বদল হতো ভাবনাগুলো। মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশে চলে যাওয়ার ইচ্ছাও ছিল তার। তবে উদ্যোগী হওয়ার ভাবনা মাথায় ঘুরপাক খেত। এভাবে চলতে চলতে একদিন ঘুরে যায় ভাগ্যের চাকা। এর সঙ্গে যোগ করেন স্বীয় দক্ষতা ও যোগ্যতা। তাই চার দশকের পথচলার মাধ্যমে হয়ে ওঠেন বেসরকারি খাতে দেশের প্রথম লুব্রিক্যাটিং গ্রিজ উৎপাদক, প্রথম বাঙালি গ্রিজ মেকার এবং এ খাতের প্রথম রফতানিকারক। এতক্ষণ বলা হচ্ছে মোহাম্মদ ইউসূফের স্বপ্নযাত্রার কথা।

বর্তমানে দেশে প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ড লুব-রেফের ব্র্যান্ড বিএনও। আজকের এই অবস্থানে আসার জন্য অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আসতে হয়েছে এ সফল উদ্যোক্তাকে।

১৯৭৬ সালে নিউ ইরা স্টিল কোম্পানির জিএমের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। তিনি তার প্রতিষ্ঠানের গ্রিজ সরবরাহের সুযোগ করে দেন। তার কথামতো সদরঘাটের গ্রিজ বিক্রেতার কাছ থেকে আট হাজার টাকায় কিনে তা আট হাজার ২০০ টাকায় ওই প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করেন। এতে খরচ বাদ দিয়ে লাভ হয় ১৫০ টাকা। সেই থেকে তার স্বপ্ন বড় হতে থাকে। তখন উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে যৌথভাবে একটি কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ প্রতিষ্ঠা করেন এবং লুব্রিক্যান্টের ব্যবসায় যুক্ত হন। গ্রিজ ও লুব্রিক্যান্ট সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে থাকেন। ১৯৮০ সালে তৎকালীন শিল্প ব্যাংকের এমডি মহিউদ্দিন খান আলমগীর এবং পরে তৌফিক এলাহী ও ইসলামী ব্যাংকের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা নিয়ে গ্রিজ হাউজ লিমিটেড কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর একসময় লুব-রেফ (বাংলাদেশ) লিমিটেড গঠন করেন। এর মধ্য দিয়ে দেশের বেসরকারি খাতে প্রথম লুব্রিক্যান্ট ব্লেন্ডিং প্লান্ট চালু হয়। এ ব্যবসার প্রতি তার ভালো লাগা চোখে পড়ার মতো। এখনও সুযোগ পেলেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে লুব্রিক্যান্ট ও পেট্রোকেমিক্যাল-সম্পর্কিত কর্মশালায় অংশ নেন মোহাম্মদ ইউসূফ।

লুব-রেফ (বাংলাদেশ) লিমিটেড বর্তমানে দেশের অন্যতম নির্ভরযোগ্য লুব্রিক্যান্ট প্রস্তুতকারক ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে মানুষের আস্থা অর্জন করেছে। বর্তমানে ৩৫ ধরনের পেট্রো রাসায়নিক পণ্য তৈরি করছে প্রতিষ্ঠানটি। বার্ষিক ১২ হাজার ৫৫০ টন সক্ষমতার ব্লেন্ডিং প্লান্টের ৫০ দশমিক শূন্য ছয় শতাংশ সদ্ব্যবহার করতে পারছে লুব-রেফ, যা ২০১৫ সালে ছিল ৩০ শতাংশ। অন্যদিকে চার হাজার ৪০৭ টন ক্ষমতাসম্পন্ন রি-রিফাইনিং ইউনিটের ৯১ দশমিক ৮৫ শতাংশ ব্যবহƒত হচ্ছে, যা ২০১৫ সালে ছিল ৬৫ দশমিক ৬৭ শতাংশ। আর ৩০ জুন সমাপ্ত ২০১৭ হিসাববছরে লুব-রেফের বিক্রি ছিল ১১৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকা ও কর-পরবর্তী মুনাফা ১৫ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে ৯০ কোটি ১৬ লাখ টাকা বিক্রির বিপরীতে তাদের মুনাফা ছিল ৯ কোটি ৩৩ লাখ টাকা।

উৎপাদিত পণ্যের সর্বোচ্চ মান বজায় রাখার জন্য আছে অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি। এ ল্যাবরেটরি উন্নত বিশ্বের সেরা কোম্পানিগুলোর যন্ত্রপাতি দ্বারা সমৃদ্ধ। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানের টেকনিক্যাল স্বীকৃতি পেয়েছে ল্যাবরেটরিটি। নিজেদের পণ্যের মান নিশ্চিত করার পাশাপাশি আধুনিক টেস্টিং ল্যাব হিসেবে অন্য প্রতিষ্ঠানকেও টেস্টিং সেবা দেওয়া হয় এখান থেকে।

ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক গতিশীলতার সঙ্গে দেশে বাড়ছে লুব্রিক্যান্টের চাহিদা। আগামীতে এ চাহিদা কয়েকগুণ বাড়বে, কারণ দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের অংশ হিসেবে সম্প্রসারিত রেলপথ, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সড়ক পরিবহন, জাহাজ, উড়োজাহাজ চলাচল, ম্যানুফ্যাকচারিং কারখানা প্রভৃতিতে প্রচুর লুব্রিক্যান্ট ব্যবহার করা হচ্ছে এবং হবে। ক্রমবর্ধমান এ চাহিদার বিপরীতে ব্র্যান্ডটিকে একটি শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার জন্য সম্প্রসারণ ও সহায়ক বেশ কিছু প্রকল্প নিয়ে কাজ শুরু করতে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। এজন্য পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়ে আইপিওর ১৫০ কোটি টাকার মধ্যে ৯৮ কোটি টাকা কোম্পানির সম্প্রসারণ প্রকল্পগুলোয় বিনিয়োগ করতে চায় কোম্পানিটি। উচ্চ সুদের ঋণ পরিশোধে ব্যয় হবে ৪৬ কোটি টাকা। বাকি ছয় কোটি টাকায় আইপিও প্রক্রিয়াসহ অন্য ব্যয় নির্বাহ করা হবে। তবে সম্প্রসারণের জন্য তাদের কোনো জমি ক্রয় বা পূর্ত প্রকল্প প্রয়োজন হবে না। আইপিওর অর্থ হাতে পাওয়ার পর যন্ত্রপাতি আমদানির প্রক্রিয়া শুরু করবে। এক বছরের মধ্যে তা স্থাপন করে সেখানে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করতে পারবে প্রতিষ্ঠানটি। কেননা এরই মধ্যে স্থানীয় প্লান্টে বিশ্বমানের লুব্রিক্যান্ট প্রস্তুত করে বাজারের আস্থা অর্জন করেছে লুব-রেফের ব্র্যান্ড বিএনও। প্রতিযোগিতামূলক দামে দেশে অটোমোটিভ, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ও মেরিন লুব্রিক্যান্ট বিক্রি প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া সম্প্রসারণ প্রক্রিয়া শেষ হলে রফতানির প্রক্রিয়াও এগিয়ে নেবে লুব-রেফ।

‘ব্যবসায় এসেছি দেশের সেবা করার জন্যÑআমদানিনির্ভর পেট্রোকেমিক্যাল ও লুব্রিক্যান্ট ট্রেডিং হতে পেট্রোকেমিক্যাল ও লুব্রিক্যান্ট শিল্পে রূপান্তর করার জন্য। এ রূপান্তরের জন্য বিনিয়োগকারীদের সহযাত্রী হিসেবে চাই। বর্তমানে স্থানীয় লুব্রিক্যান্ট বাজারের প্রায় পাঁচ শতাংশ বিএনও ব্র্যান্ডের দখলে আছে। সক্ষমতা ও বিপণন প্রচেষ্টা সফল হলে এ হার ২৫ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব। এতে আমাদের আয় কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে। এজন্য পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হচ্ছি। ব্যাপক সম্প্রসারণ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আমাদের বেজ অয়েল রিফাইনারি, ট্যাংক টার্মিনাল, বার্থ অপারেটিং জেটি, বিটুমিন প্লান্ট, হাইড্রোজেন প্লান্ট ও পাওয়ার প্লান্ট রয়েছে। বছরে ৭০ হাজার টন ক্ষমতাসম্পন্ন বেজ অয়েল রিফাইনারিটি চালু হওয়ার পর দেশের লুব্রিক্যান্ট ইন্ডাস্ট্রিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ হবে। ফলে শিল্প সুরক্ষা ও বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে অনেক টেকনিশিয়ান তৈরি হবে’

মোহাম্মদ ইউসুফ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক

 

সাইফুল আলম