শতবর্ষী সোনাতলা

যশোরের অভয়নগর উপজেলার সিদ্দিপাশা গ্রামের ভৈরব নদের গা ঘেঁষে গড়ে উঠেছে সোনাতলা বাজার। শত বর্ষের পুরোনো বাজার এটি।

ব্রিটিশ আমলে রাজা-বাদশারা এখানে স্বর্ণ বেচাকেনা করতেন। তাই এর নামকরণ করা হয় সোনাতলা বাজার। ভৈরব নদের চারপাশে জেগে ওঠা গ্রামের চারদিকে চোখে পড়ে শত বছরের পুরোনো বাড়ি, যা অনেকটাই বিলুপ্তির পথে। টিকে থাকা কিছু ভবনের সংস্কার প্রয়োজন। মজার বিষয়, এ নদের অন্য পাশে খুলনাÑনদটি দুই জেলাকে বিভক্ত করেছে।

নদের পাড়ের মানুষের জীবিকার প্রধান উৎস পান। সোনাতলা বাজারকে স্থানীয়রা বেছে নিয়েছেন পান কেনাবেচার জন্য। পানের পাশাপাশি এখানে সুপারিরও বড় বাজার রয়েছে। এছাড়া কলার পাইকারি বাজার হিসেবে এর সুনাম রয়েছে।

সোনাতলা বাজার কিছু নিয়ম মেনে চলে। সকাল ৯টায় বাজারের কার্যক্রম শুরু হয়। বাজার কমিটি ৯টার দিকে বাজার শুরু করার জন্য বাঁশি বাজায়। এর মধ্য দিয়েই কেনাবেচা শুরু হয়। চলে ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে দরকষাকষি। তবে অল্প সময়েই বিক্রেতারা পান বিক্রি করতে পারেন।

স্থানীয়রাই মূলত পান চাষ করেন। তাই পানগুলো নিয়ে ৯টার আগেই তারা বাজারে ভিড় জমান। দেড়শর বেশি পানচাষি এখানে পান সরবরাহ করেন। বাজারে রয়েছে ছোট-বড় প্রায় ৫০০ দোকান। প্রতিদিন প্রায় পাঁচ লাখ টাকার বেশি লেনদেন হয় এখানে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় সব ধরনের পণ্য পাওয়া যায় এ বাজারে। বিশেষ করে ফরমালিনমুক্ত সবজি ও তাজা মাছের জন্য নামডাক রয়েছে এর। বাজারে পাওয়া যায় কাপড়, টিন, ইলেকট্রনিক পণ্য, রড, সিমেন্টসহ সব ধরেনের পণ্য। স্থানীয়রা তাদের জীবিকার প্রধান উৎস হিসেবে বেছে নিয়েছেন এ বাজারকে। এলাকাসহ পাশের জেলার মানুষের কাছে বিক্রি করেন তারা। ঈদ ও পূজায় বেচাকেনা হয় বেশি। এ বাজারের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও বেশ ভালো। পুলিশি পাহারা রয়েছে। রাতে পুলিশের টহল বসে বাজারে। বিক্রেতা ও ক্রেতারা নির্ভয়ে লেনদেন করতে পারেন। এছাড়া কিছু পাইকার আগে থেকেই পান কিনে রাখেন, যা সকালে বাজারের মাধ্যমে নদী পার হয়ে খুলনার বড়বাজারে সরবরাহ করা হয়।

প্রতিবছর সরকারের কাছ থেকে ইজারা নেয় বাজার মালিক সমিতি। তবু বাজারে কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এখানে খুলনাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে পান সংগ্রহ করার জন্য পাইকাররা আসেন। অথচ বাজার বাজারে কোনো পাবলিক টয়লেট নেই। এ সমস্যা সমাধানে বাজার সমিতি ইতোমধ্যে কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করলেও কোনো সাড়া পায়নি। বাজারে একটি পোস্ট অফিস রয়েছে। তবে এর সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বাজার কমিটি এসব সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ক্রেতাদের পছন্দের বাজার এটি। কারণ এখানে সবকিছুই পাওয়া যায়। অনেকে এ বাজারকে প্যাকেজও বলে থাকেন। কারণ বাজারে এসে ফিরে যান না কোনো ক্রেতা।

 

বাজার ঘিরে চঞ্চল জনপদ

ভৈরব নদের পাড়ের মানুষগুলো সোনাতলা বাজারকে বেশি প্রাধান্য দেয়। বাজারকে কেন্দ্র করে এখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হয়েছে। যত দূর চোখ যায় পিচঢালা রাস্তা দেখা যায়। তাছাড়া এখানে বিদ্যুতের লাইনও এসেছে। মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে বিদ্যুৎ সুবিধা। এখানকার কৃষক বা সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন জীবনযাপন, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষার প্রতি বেশি গুরত্ব দেয়। বলা যায়, বাজার ঘিরেই চঞ্চল থাকে এ জনপদ।

নদীপথে খুলনা ও যশোরের যোগাযোগ রয়েছে বাজারের। সড়কপথে এ দুই জেলার যাতায়াত ব্যবস্থাও ভালো।

এখানকার মানুষ খুব অতিথিপরায়ণ। পর্যটকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত দাম রাখে না। সহজেই মিশতে পারে। এখানকার দই ও মিষ্টি খুব স্বাদের। খাঁটি গরুর দুধ দিয়ে তৈরি হয়। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে মিষ্টি ও দই কিনতে আসেন।

এখানকার বেশিরভাগ মানুষ কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। কেউ মাছ চাষ করেন। কেউ বা পান চাষের সঙ্গে জড়িত। ধান, হলুদসহ অন্য সবজিরও চাষাবাদ করেন অনেকে।