শব্দদূষণ কমাতে প্রয়োজন ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতনতা

তৌহিদুর রহমান:  যানজট, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, সুপেয় পানির অভাব, আবাসন সঙ্কটসহ আরো অনেক কিছুতেই জর্জরিত রাজধানী ঢাকা। অব্যাহতভাবে বাড়তে থাকা এসব সমস্যা থেকে কবে মুক্তি মিলবে তার জবাবও যেন কারোরই জানা নেই। এসব সমস্যা যেহারে বাড়ছে তাতে সহসা সমাধান হওয়ার সম্ভাবনাও ক্ষীণ হয়ে আসছে। তবে কিছু সমস্যা পুরোপুরি সমাধান না হলেও সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা সম্ভব। শুধু আমাদের মত সাধারণ মানুষকে একটু সচেতন হতে হবে। তেমনই একটি সমস্যা হল শব্দদূষণ। আমরা একটু এগিয়ে আসলে এ সমস্যা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মানুষের জন্য সহনশীল শব্দের মাত্রা হল ৪৫ ডেসিবল। ৬০ ডেসিবল মাত্রার শব্দ মানুষের শ্রবণশক্তির জন্য ক্ষতিকর। এর বেশি হলে শ্রবণশক্তি কমে যাওয়াসহ নানা ধরণের জটিলতা দেখা দিতে পারে। আর একশ’ ডেসিবলের কাছাকাছি গেলে শ্রবণশক্তি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ঢাকা শহরের শব্দ দূষণ এসব মাত্রাকে অনেক আগেই অতিক্রম করেছে। বিভিন্ন সংস্থার তথ্যানুযায়ী, ঢাকা শহরের কিছু স্থানে শব্দ দূষণের সর্বোচ্চ মাত্রা একশ’ ডেসিবলেরও উপরে অবস্থান করছে।

গত বছর বাংলাদেশ পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) এক রিপোর্টে বলা হয়, ঢাকার অন্যতম বাণিজ্যিক এলাকা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আশেপাশে সর্বোচ্চ ১০৮ দশমিক ৯ ডেসিবল শব্দ রেকর্ড করা হয়েছে। আর নিরব এলাকার মধ্যে ইডেন মহিলা কলেজের মত একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনেও দিনের বেলায় সর্বোচ্চ ১০৪ দশমিক চার ডেসিবল শব্দ রেকর্ড করা হয়! শুধু তাই নয় কলাবাগান এলাকায় রাতের বেলায়ও শব্দের মাত্রা ছিল সর্বোচ্চ ১০৬ দশমিক চার ডেসিবল! এছাড়া বেসরকারি সংস্থা ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ (ডাব্লিউবিবি) ট্রাস্টও সম্প্রতি রাজধানীর ১০টি স্থানের শব্দের মাত্রা পরিমাপ করে। এতে অধিকাংশ স্থানেরই শব্দের সর্বোচ্চ মাত্রা একশ’ ডেসিবলের কাছাকাছি পাওয়া যায়।

এ পরিমাণ শব্দ দূষণের জন্য আসলে দায়ী কে বা কারা ? এর জবাবে সর্বপ্রথমে রাস্তায় চলাচলকারী যানবাহনের সাথে অনেক ক্ষেত্রে আমাদের মত সাধারণ জনতার কথাই আসবে। রাজধানীতে শব্দ দূষণের জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাস-মিনিবাস, ব্যক্তিগত গাড়ির চালকদের অতিরিক্ত হর্ণ বাজানোকেই দায়ী করা হয়। সাথে রয়েছে, মোটরসাইকেল, সিএনজিসহ অন্যান্য ছোট যানবাহনও। এর বাইরে সাউন্ডবক্স ও কল-কারখানাও শব্দ দূষণের জন্য অনেকাংশে দায়ী। বাসচালকরা কিছুটা সচেতন হলে ও অকারণে হর্ণ বাজানো বন্ধ করলে শব্দ দূষণ কমিয়ে নিয়ে আসা অনেকাংশে সম্ভব। এক্ষেত্রে বাস মালিকরাও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন। সাথে সাথে ব্যক্তিগত গাড়ি চালকদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়াতে হবে। এজন্য গাড়ির মালিকদেরকে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে।

শব্দ দূষণের জন্য আমরা কতটা দায়ী তার কয়েকটি উদাহরণ দিলেই বিষয়টি পরিস্কার হবে। সম্প্রতি তীব্র যানজটের কারণে রাজধানীর শাহবাগ মোড় থেকে হেটেই অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলাম। পথিমধ্যে বাংলামোটর সিগন্যালের কাছাকাছি পৌছালে হর্ণের শব্দের পরিমাণ বেড়ে গেল অনেকখানি। বিষয়টা খেয়াল হতেই দেখলাম, ফুটপাতের কাছাকাছি দাড়িয়ে থাকা কিছু মোটরসাইকেল থেকে অনবরত হর্ণ বাজানো হচ্ছে। কিছু বাসও এতে যোগ দিয়ে সমানে হর্ণ বাজিয়ে চলেছে। অথচ ওই সিগন্যালের আগ পর্যন্ত কাওরান বাজারের সিগন্যালের গাড়ি এসে মিশেছে। সেখানে বাংলামোটর সিগন্যাল থেকে গাড়ি তো দূরে থাক, মোটরসাইকেলও বের হওয়ার কোন সুযোগ ছিল না।

এর কয়েকদিন পরই কাওরান বাজার সিগন্যালেও দেখা মিলল প্রায় একই ধরণের দৃশ্য। তবে এবার মোটরসাইকেল নয় মিনিবাসের সারি। প্রচন্ড জ্যামে রাস্তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলেও বেশ কিছু বাস থেকে অনবরত হর্ণ বাজানো হচ্ছিল। লক্ষ্যণীয় বিষয় হল, হর্ণ বাজানো এসব বাসের অধিকাংশই ফুটপাতের কাছাকাছি দাড়ানো ছিল।

আর শব্দ দূষণ নিয়ে রাজধানীতে সম্প্রতি সম্ভবত সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাটাও ঘটে গেল। ঢাকার ওয়ারি এলাকায় একটি গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে উচ্চ ভলিউম দিয়ে বাজানো হচ্ছিল সাউন্ডবক্স। এতে স্বাভাবিকভাবেই সমস্যা হওয়ার কথা এর আশেপাশের অধিবাসীদের। বাস্তবে হয়েছেও তাই। আর এর প্রতিবাদ করাতেই প্রাণ দিতে হল অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা হƒদরোগে আক্রান্ত ষাটোর্ধ্ব নাজমুল হককে। শব্দদূষণ সৃষ্টিকারীরাই তাকে পিটিয়ে মেরে ফেললেন। তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরও মারধর করা হল। শব্দ দূষণের প্রতিবাদ করায় প্রাণহানির ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে তো বটেই, এর আগেও এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে কিনা তা আমার জানা নেই।

শুধু তাই নয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল কিংবা এ ধরণের প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়। কিন্তু এ নিয়মগুলোও আমরা ঠিকভাবে মানি না। রাস্তার ধারে এ ধরণের প্রতিষ্ঠান থাকলে দেখেও দেখেন না যানবাহন চালকরা। প্রায়ই দেখা যায়, বিভিন্ন ধরণের যানবাহন থেকে এসব প্রতিষ্ঠানের সামনেই অনবরত হর্ণ বাজানো হচ্ছে।

এখন কথা হল এ ধরণের শব্দ দূষণের পরিমাণ কি কমানো সম্ভব নয় ? জবাব হল, অবশ্যই সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন আমাদের সবার একটু সদিচ্ছা। যানজটে দাড়িয়ে থেকে আমার-আপনার মত আরো অনেকেরই সমস্যা হচ্ছে বা হবে এটাই স্বাভাবিক। এরমধ্যেই সমাধান হবে না জেনেও অকারণে হর্ণ বাজিয়ে যাওয়ার কোন যৌক্তিকতা থাকতে পারে না। ট্রাফিক তার স্বাভাবিক নিয়মেই চলবে। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের সাথে সম্পৃক্তদের যদি আমরা সহযোগিতা করি তাহলে তাদের কাজ অনেকাংশেই সহজ হয়ে যাবে এতে সন্দেহ নেই। আর আমরা সিগন্যালে থাকলে গাড়ির ইঞ্জিনটাও বন্ধ রাখতে পারি। এসব বিষয়গুলো মানলে যানজট পরিস্থিতি যেমন কিছুটা হলেও সহণীয় হবে, সাথে শব্দ দূষণের পরিমাণও কমে আসবে।

আর বিভিন্ন পারিবারিক বা সামাজিক অনুষ্ঠান করার সময়ও আমাদের সচেতন থাকাটা জরুরী। উচ্চ শব্দে সাউন্ডবক্স না বাজালে এসব অনুষ্ঠানের আনন্দ নষ্ট হয়ে যাবে, বিষয়টা কিন্তু মোটেও তেমন নয়। আনন্দ করার জন্য বিকল্প আরো অনেক উপায় আছে। নিজে আনন্দ করার পাশাপাশি প্রতিবেশিদের সুবিধা-অসুবিধার বিষয়টিতেও আমাদেরকেই নজর রাখতে হবে। মাঝেমধ্যেই দেখা যায়, বিভিন্ন উপলক্ষ্যে রাজধানীতে গাড়িতে করে বিভিন্ন সড়কে ঘুরে ঘুরে সাউন্ডবক্সে গান চালানোর পাশাপাশি উচ্চশব্দে মাইক বাজানো হয়। এগুলো যে সাধারণ মানুষের জন্য ভোগান্তির কারণ হয় তা নতুন করে না বললেও চলে।

শব্দদূষণ রোধে শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা-২০০৬ প্রণয়ন করেছে সরকার। এর আওতায় নীরব, আবাসিক, মিশ্র, বাণিজ্যিক ও শিল্প এলাকায় শব্দের সহণীয় মাত্রা নির্ধারণ করা আছে। এটা অমান্য করলে প্রথমবারে এক মাস কারাদণ্ড বা অনধিক পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড দেয়ার বিধান রয়েছে। পুনরায় এ আইন ভঙ্গ করলে ছয় মাস কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করারও বিধান রয়েছে। তবে এ আইন আমরা কতটা মেনে চলছি তা নিয়ে বড় ধরণের প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়েছে।

শব্দদূষণ সৃষ্টির জন্য আমাদের মত সাধারণ মানুষের দায় অনেকখানি। আমরা যদি নিজ নিজ যায়গা থেকে শব্দ দূষণ কমিয়ে আনতে সচেতন হই, সাথে সাথে অপরকে উৎসাহিত করি তাহলে শব্দ দূষণ অনেকাংশেই কমানো সম্ভব। শুধুমাত্র আইন করেই শব্দ দূষণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এজন্য আমাদেরকেও এগিয়ে আসতে হবে। আর তাহলেই ঢাকা শহরে সর্বসাধারণের কিছুটা হলেও স্বস্তিতে চলাচল করার সুযোগ তৈরি হবে, কমে আসবে ভোগান্তি।

 

গণমাধ্যম কর্মী

[email protected]