শরীরের ক্ষত দেখানো যায়, মনের নয়

প্রতিবছর জানুয়ারির শেষ রোববার আন্তর্জাতিকভাবে কুষ্ঠরোগীদের প্রতি করণীয় ও সচেতনতার জন্য বিশ্বব্যাপী ১০০টিরও বেশি দেশে বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস পালিত হয়। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘কুষ্ঠরোগে বালক-বালিকায়, আর কোনো প্রতিবন্ধিতা নয়’। দ্য লেপ্রসি মিশন ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এর প্রোগ্রাম সাপোর্ট কো-অর্ডিনেটর জিপ্তাহ বৈরাগীর সঙ্গে কথা বলে ফিচারটি তৈরি করেছেন জাহিদ হাসান

 

কুষ্ঠরোগে যুগ যুগ ধরে নানা ধরনের কুসংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাস জড়িয়ে আছে। একজন কুষ্ঠরোগী তার শরীরের চিহ্নগুলো দেখাতে পারেন কিন্তু মনের ক্ষত? তিনি মনে করেন, আমি কী পাপ করেছি? আমার বংশে কী কারও এ রোগ ছিল? কুষ্ঠ মানেই তো বিকলাঙ্গতা। কুষ্ঠ কী ভালো হয়Ñইত্যাদি নানা প্রশ্ন তার মনে ঘুরপাক খায়। তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। নিজেকে করুণার পাত্র মনে করেন।

কুষ্ঠ শুধু শরীরকেই নয়, মনকেও এভাবে আক্রান্ত করে। ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবন ব্যাহত করে। ভ্রান্ত ধারণা, কুসংস্কার ও কুষ্ঠ আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি সমাজের নানা বৈষম্যমূলক আচরণের ফলে ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন, এমনকি সামাজিক জীবনেও নানা বিপত্তির সৃষ্টি হয়। এভাবেই কুষ্ঠ একটি সামাজিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। সে কারণে কুষ্ঠরোগ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি এ রোগ সম্পর্কে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টিও গুরুত্বপূর্ণ।

মানব জাতির ইতিহাসে কুষ্ঠ একটি প্রাচীন রোগ। ভারতীয় উপমহাদেশকেই কুষ্ঠরোগের আদি জš§স্থান বলে ধারণা করা হয়। খ্রিষ্টপূর্ব ছয়শ বছর আগে ‘সুসরতা সমহিতা’ নামে আদি ভারতীয় পুস্তকে কুষ্ঠরোগের বর্ণনা রয়েছে। কুষ্ঠরোগের ইতিহাসকে তিনটি যুগে ভাগ করা হয়। নরওয়ের চিকিৎসা বিজ্ঞানী ডা. আরমার হ্যানসেন সর্বপ্রথম ১৮৭৩ সালে কুষ্ঠরোগের জীবাণু আবিষ্কার করেন। তার নামানুসারে কুষ্ঠরোগকে ‘হ্যানসেন ডিজিজ’ বলা হতো। পরবর্তীতে এ জীবাণুর নামকরণ হয় ‘মাইকো ব্যাকটেরিয়াম লেপ্রি’ নামে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিবরণ অনুযায়ী ২০০০ সালেই বিশ্ব কুষ্ঠমুক্ত হয়েছে। কিন্তু কয়েকটি দেশ আজও এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে সক্ষম হয়নি যেমন ব্রাজিল, ভারত, নেপাল, মোজাম্বিক, সেন্ট্রাল আফ্রিকা রিপাবলিক, অ্যাঙ্গোলা, কঙ্গো, তানজানিয়া প্রভৃতি।

কুষ্ঠরোগকে জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা হয় আমাদের দেশে। ১৯৮৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় দুই লাখ ১৩ হাজার ৫১৯ জনকে কুষ্ঠ রোগের আধুনিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। গত পাঁচ বছরের সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতি বছর তিন হাজার ৫০০’র মতো নতুন কুষ্ঠ আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হন। অথচ ১৯৯৮ সালে আমরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলাম। তখন দেশে মোট জনসংখ্যা ও কুষ্ঠ আক্রান্তের হার প্রতি ১০ হাজারে এক-এর নিচে এসেছিল (০.৮৭/১০০০০)। ২০০৪ সালে এ প্রিভিলেন্স রেট ০.৫১/১০০০০-এ নেমে আসে। জাতীয়ভাবে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হলেও আঞ্চলিকভাবে কয়েকটি জেলায় এই হার এক-এর ওপরে থেকে গেছে।

কুষ্ঠরোগের লক্ষণ

হালকা ফ্যাকাশে অথবা লালচে ধরনের অনুভূতিহীন দাগ, দানা বা গুটি।

প্রান্তিক স্নায়ু মোটা হওয়া (স্নায়ুর কার্যকারিতা থাকতে পারে, আবার নাও থাকতে পারে)।

চামড়ার রসের মধ্যে জীবাণুর উপস্থিতি।

 

মনে রাখতে হবে

কুষ্ঠরোগের দাগ কখনও চুলকায় না, ঘাম হয় না ও দাগযুক্ত জায়গার সূক্ষ্ম লোমগুলো ঝরে যায়।

দানা বা গুটি, লালচে মুখ ও চামড়া মোটা, কানের লতি মোটা ও চোখের ভ্রু উঠে যাওয়াও এ রোগের লক্ষণ হতে পারে।

এছাড়াও দীর্ঘদিন থেকে বেদনাহীন ঘা, হাত ও পায়ের অনুভূতি নষ্ট হওয়াও কুষ্ঠরোগের লক্ষণ হতে পারে।

 

কুষ্ঠরোগের জটিলতা

আক্রান্ত স্থানে অনুভূতি থাকে না।

অসার হাত-পায়ে রোগীর অজান্তে আঘাতজনিত কারণে ক্ষত বা ঘা দেখা দিতে পারে।

ব্যথা না থাকার কারণে অযতœ ও চিকিৎসার অবহেলায় এ ঘা বৃদ্ধি পেতে পারে। এই ক্ষত বা ঘায়ে কুষ্ঠ জীবাণু থাকে না। অন্যান্য সাধারণ ঘা বা ক্ষতের মতো চিকিৎসা করালে এই ঘা ভালো হয়ে যায়। ঘায়ের চিকিৎসা না করালে পরিণতিতে অঙ্গহানি বা বিকলাঙ্গতা দেখা দিতে পারে।

 

কুষ্ঠজনিত কারণে বিকলাঙ্গ রোগীদের সাধারণত পাঁচটি শারীরিক সমস্যা দেখা যায়।

১. চোখ বন্ধ করার সমস্যা।

২. হাতে অনুভূতি লোপ পাওয়া।

৩. দুর্বলতা ও হাতের বিকলাঙ্গতা।

৪. পায়ের অনুভূতি হ্রাস ও ঘা হওয়া।

৫. দুর্বলতা ও পায়ের বিকলাঙ্গতা।

 

চিকিৎসা পদ্ধতি

এমডিটি (মাল্টিড্রাগ থেরাপি) বা একাধিক ওষুধের সমন্বিত চিকিৎসা। ১৯৮২ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ চিকিৎসা পদ্ধতি চালু করে।

 

এমডিটিতে ব্যবহৃত ওষুধ

রিফামপিসিন।

ক্লোফাজিমিন।

ড্যাপসোন (ডিডিএস)।

 

ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

কুষ্ঠরোগে ব্যবহৃত ওষুধে তেমন কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। তবে চিকিৎসার সময় কখনও কখনও কোনো কোনো রোগীর ক্ষেত্রে ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।