শর্ত পূরণ করেই এমপিওভুক্ত হোক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

আবদুল মকিম চৌধুরী: জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানসহ কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিকের অনুরোধে আমরণ অনশন ভেঙেছেন নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীরা। গতকাল বুধবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনের সড়কের উত্তর পাশে বিশিষ্ট নাগরিকেরা শিক্ষকদের অনুরোধ করলে অনশন ভাঙেন তারা।
স্বীকৃতি পাওয়া সব বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির দাবিতে গত ২৫ জুন থেকে আমরণ অনশন করে আসছিলেন এই শিক্ষক-কর্মচারীরা। এর আগে গত ১০ জুন থেকে একই জায়গায় তারা অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছিলেন। এমপিও ভুক্তি নিয়ে বিভিন্নভাবে চেষ্টা-তদবিরও করছেন শিক্ষকেরা। যেমন, গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর যশোর সফরকালে শিক্ষামন্ত্রীর গাড়িবহর আটকে দিয়েছেন তারা।
জাতীয় প্রেস ক্লাবে অনশন চলাকালে বঙ্গবন্ধুর বাংলায়/ শিক্ষক কেন রাস্তায়, প্রশ্ন প্রধানমন্ত্রীকে/ শিক্ষক কেন সড়কে এ ধরনের  স্লোগান দিয়েছেন তারা। ভালো খবর, অনশন প্রত্যাহার করেছেন তারা। এটি তাদের জন্যই নয়, দেশ-জাতির জন্য স্বস্তির।
শিক্ষকের মর্যাদা নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। তারা মানুষ গড়ার কারিগর। সব পেশায়ই ভালো-মন্দ ব্যক্তি আছে। সবাইকে যেমন ভালো বলার সুযোগ নেই, তেমনি খারাপ বলারও যুক্তি নেই। শিক্ষকেরা হয়তো পরিতোষ লাভ করেবেন, বিভিন্ন পেশার পরিচয়দানকারীদের (ভুয়া) আটকের কথা শোনা গেলেও ভুয়া শিক্ষকের কথা শোনা যায়নি কখনো। কিন্তু একটি বিষয় শিক্ষক সম্প্রদায়ের জন্য বিব্রতকর, তারা নিজেরাই নিজেদের অনুকরণীয় ব্যক্তি বলে মনে করেন না। অথচ ছাত্র-ছাত্রীদের বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান বিতরণের পাশাপাশি নৈতিকতা ও মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়ার দায়িত্বও শিক্ষকের। প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ শিক্ষার্থীই এখন আর নৈতিকতার ক্ষেত্রে নিজের শিক্ষককে আদর্শ বা অনুকরণীয় মনে করে না।
নৈতিকতা ও মূল্যবোধের চর্চা বিষয়ে জানতে এ বছরের প্রথম দিবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জরিপ চালায় বেসরকারি গবেষণা সংস্থা গণসাক্ষরতা অভিযান। এতে বিভিন্ন পর্যায়ের ১ হাজার ৪০০ শিক্ষার্থী, ৫৭৬ শিক্ষক, ১ হাজার ২৮০ অভিভাবক ও স্কুল কমিটির সদস্যের মতামত নেওয়া হয়। ‘ছাত্ররা শিক্ষকদের নৈতিকতা ও সততার উদাহরণ হিসেবে দেখতে চায়, কিন্তু বর্তমান সমাজে আশা করা যায় না’ শীর্ষক জরিপে অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে এ বিষয়ে মতামত দিতে বলা হয়। জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, প্রাথমিকের ৫০ শতাংশ, মাধ্যমিকের ৬৪ ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী বিষয়টির সঙ্গে একমত পোষণ করে। অর্থাৎ অধিকাংশ শিক্ষার্থীই নৈতিকতার ক্ষেত্রে তাদের শিক্ষককে অনুকরণীয় বা আদর্শ বলে মনে করে না। এমনকি ৬৫ শতাংশ অভিভাবক ও প্রায় ৫০ শতাংশ শিক্ষকও বিষয়টির সঙ্গে সহমত পোষণ করেন।
জরিপে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ‘বিদ্যালয়ের নৈতিকতা ও মূল্যবোধ: শিক্ষায় প্রাণের উজ্জীবন’ শীর্ষক এডুকেশন ওয়াচ-২০১৭ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে গণসাক্ষরতা অভিযান। গত ৯ মে রাজধানীর এলজিইডি মিলনায়তনে প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়।
আন্দোলনরত শিক্ষকরা দাবি করছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (স্কুল-কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিওর নীতিমালা ২০১৮ জারি করা হয়েছে। নীতিমালার শর্ত পূরণে যোগ্য ১০০ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সারাদেশে খুঁজে পাওয়া যাবে না। নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তির আবেদন করার যোগ্যতাই নেই সিংহভাগ শিক্ষকের।
নীতিমালা অনুযায়ী, এমপিওভুক্তি পেতে প্রথমে নতুন করে আবেদন করতে হবে। শর্তপূরণ না হলে আবেদন করতে পারবে না কোনো প্রতিষ্ঠান। এরপর জমাকৃত আবেদনের তথ্য যাচাই-বাছাই করে এমপিও দেওয়ার জন্য সুপারিশ করা হবে। এক্ষেত্রে আবেদনের শর্ত হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার সময়, শিক্ষার্থীসংখ্যা, পরীক্ষার্থী সংখ্যা ও পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলের বিষয় সর্বাধিক গুরুত্ব পাবে।
নীতিমালা অনুযায়ী, একটি প্রতিষ্ঠানকে এমপিও পেতে প্রধান চারটি শর্ত পূরণ করতে হবে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ১০০ নম্বর। এতে একাডেমিক স্বীকৃতির তারিখের জন্য রাখা হয়েছে ২৫ নম্বর। প্রতি দুই বছরের জন্য ৫ নম্বর এবং ১০ বা এর চেয়ে বেশি বছর হলে পাবে ২৫ নম্বর। শিক্ষার্থীসংখ্যার জন্য ২৫ নম্বর। আর শিক্ষার্থীর কাম্য সংখ্যা থাকলে ওই প্রতিষ্ঠান পাবে ১৫ নম্বর এবং এর পরবর্তী ১০ শতাংশ বৃদ্ধির জন্য পাবে ৫ নম্বর। পরীক্ষার্থী এবং উত্তীর্ণের সংখ্যায়ও শিক্ষার্থী সংখ্যার মতোই একইভাবে নম্বর বণ্টন করা হয়েছে।
এমপিও নীতিমালায়, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরিতে নিয়োগের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ও অবসরের বয়স নির্দিষ্ট করা হয়েছে। শিক্ষক নিয়োগে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) মেধাক্রম, মনোনয়ন, নির্বাচন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ইনডেক্স নম্বর বা নিবন্ধন সনদ ছাড়া কাউকে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষা জীবনে শুধু একটি তৃতীয় বিভাগ/সমমান গ্রহণযোগ্য হবে।
কাম্য যোগ্যতা পূরণ করতে নীতিমালা অনুযায়ী, সহশিক্ষা ও বালক প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি নি¤œ-মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শহরে ২০০ ও মফস্বলে ১৫০ জন শিক্ষার্থী থাকতে হবে। মাধ্যমিকে শহরে ৩০০ ও মফস্বলে ২০০ শিক্ষার্থী থাকতে হবে। স্কুল অ্যান্ড কলেজে শহরে ৪৫০ ও মফস্বলে ৩২০ জন শিক্ষার্থী থাকতে হবে। উচ্চ মাধ্যমিক কলেজে শহরে ২০০ ও মফস্বলে ১৫০ জন শিক্ষার্থী থাকতে হবে। স্নাতক পাস কলেজে শহরে ২৫০ ও মফস্বলে ২০০ শিক্ষার্থী থাকতে হবে। আর প্রতিটি শ্রেণির পরীক্ষায় শহরে ৬০ ও মফস্বলে ৪০ জন শিক্ষার্থীর অংশ নিতে হবে। এর মধ্যে ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে উত্তীর্ণ হতে হবে।
শিক্ষকনেতাদের তথ্যমতে, সারা দেশে ১৫ থেকে ২০ বছর যাবত পাঁচ হাজারের বেশি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থীদের বিনা বেতনে পাঠদান করে আসছেন। অনেকের চাকরির মেয়াদ আছে আর ৫-১০ বছর। এমপিওভুক্তির জন্য আরোপিত নতুন শর্তকে ‘অমানবিক ও অযৌক্তিক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন তারা।
এমপিওভুক্তি আট বছর বন্ধ রয়েছে। এমপিরা নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার তাগিদ দিচ্ছেন। এ নিয়ে কয়েক দফা শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ জাতীয় সংসদে এমপিদের তোপের মুখেও পড়েছেন। সারাদেশে এমপিদের চাপ এবং আগামী সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি করা হবে এমনটি ভাবা হচ্ছিল। ২০১০ সালে সর্বশেষ ১ হাজার ৬২৪টি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হয়েছিল। ২০১১ সালে এক হাজার স্কুল-মাদরাসা এমপিওভুক্তি করার ঘোষণা দেয়া হলেও তা করা হয়নি। নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি বন্ধ রয়েছে ২০১১ সাল থেকে।
বর্তমানে দেশে ২৭ হাজার এমপিওভুক্ত বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদরাসা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক রয়েছেন ৩ লাখ ৫৭ হাজার ২৮৮ জন এবং কর্মচারী রয়েছেন ১ লাখ ৫ হাজার ৩৭৫ জন। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে স্কুল ১৬ হাজার ১১৮টি, কলেজ ২৩৭০টি এবং মাদরাসা রয়েছে ৭ হাজার ৫৯৭টি। অভিযোগ আছে, অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা ৩ হাজারের বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অপ্রয়োজনীয়। বছরের পর বছর শিক্ষার্থী পায় না। পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিলেও একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারে না।
এবারের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলেও শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চিত্র উঠে এসেছে। শিক্ষার্থী না পাওয়াসহ নানা অভিযোগে সারা দেশে ২০২টি মাদরাসা বন্ধ করে দেয় মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড। এর মধ্যে মাগুরার রিজিয়া রুবিয়া মহিলা দাখিল মাদরাসার ২০ ছাত্রী দাখিল পরীক্ষা দিয়ে সবাই ফেল করায় এলাকাবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করে। এমপিওভুক্ত এ প্রতিষ্ঠানটিতে ১৪ জন শিক্ষক ও তিন কর্মচারী রয়েছেন। তার পরও এমপিওভুক্ত হওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানের পেছনে প্রতি মাসে সরকারের কোটি কোটি টাকা গচ্চা যাচ্ছে।
অন্যদিকে এমপিওভুক্ত হওয়ার জন্য যেসব শর্ত পূরণ করা উচিত তার সব থাকা সত্ত্বেও সাত হাজার স্কুল, কলেজ ও মাদরাসা এমপিওভুক্ত হতে পারেনি।
গত ৭ মে প্রকাশিত এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার সারাদেশে ১০৯ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে একজনও পাস করতে পারেনি। এসসব প্রতিষ্ঠানের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছে শিক্ষাবোর্ডগুলো। এসব প্রতিষ্ঠানের পাঠদান, নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি এবং এমপিও বাতিলের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এ বছর গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৯৩টি। সে হিসেবে শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ১৬টি। এবারের ফলে সবচেয়ে বেশি বিপর্যয় হয়েছে মাদ্রাসা বোর্ডে। এই বোর্ডের ৯৬ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সব পরীক্ষার্থী এবার ফেল করেছে। একটি দাখিল মাদ্রাসায় অন্তত ১৪ শিক্ষক-কর্মচারী এমপিও সুবিধা পেয়ে থাকেন। এ সুবিধা পাওয়ার জন্য ওই প্রতিষ্ঠানে ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীর ৭৫ শতাংশ পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ৫০ শতাংশ পাস করা বাধ্যতামূলক। এ পরীক্ষায় পর পর দুই বছর (২০১৭ ও ২০১৮) কোনো পরীক্ষার্থী অংশ না নেওয়ায় একাডেমিক স্বীকৃতি বাতিল হওয়া ২২০টি মাদরাসার এমপিও বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
টানা দুই বছর দাখিল পরীক্ষায় কোনো পরীক্ষার্থী না থাকায় করায় ২০২টি মাদরাসার প্রধানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। বেশির ভাগ মাদ্রাসা শোকজের জবাব দেয়নি। জবাব দেওয়া মাদ্রাসাগুলোর বক্তব্যও সন্তোষজনক ছিল না। ফলে গত ২৮ মে এসব মাদরাসার পাঠদানের অনুমতি স্থগিত ও একাডেমিক স্বীকৃতি বাতিলসহ অনলাইন পাসওয়ার্ড, মাদরাসার কোড নম্বর এবং ইআইআইএন নম্বর বন্ধ করে দেয় মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড।
প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক এমপিওভুক্তি প্রয়োজন কি না। এটি কার কতটা উপকারে আসবে। তহবিলের সংকুলানই কোথা থেকে হবে। গত ৩ জুলাই ( জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী কথা বলেছেন, এমপিওভুক্তি করার মতো খুব খারাপ কার্যক্রম আমরা গ্রহণ করেছিলাম, যা এখনও চালিয়ে যাচ্ছি। স্পষ্ট করে বলছি, আমি এটার পক্ষে নই। এমপিওভুক্তি নিয়ে অনেক জালিয়াতি ছিল, শিক্ষামন্ত্রী এখন সেটা কমিয়ে আনার জন্য কাজ করছেন। এমপিভুক্তির মাধ্যমে মূলত কয়েকজন শিক্ষক ও কিছু সংখ্যক কর্মচারীকে বেতন দেয়া হয়। কিন্তু শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য এমপিওভুক্তি যথাযথ কার্যক্রম নয়। শিক্ষার মান উন্নয়নে এর চেয়ে বরং অনেক ভালো কার্যক্রম হলো ছাত্র-উপবৃত্তি, শিক্ষার উপকরণ ও শিক্ষার্থীদের টিফিন দেওয়া।
অর্থমন্ত্রী অনুযোগ প্রকাশ করে বলেছেন, সংসদ সদস্যরা এসব নিয়ে কেন মোটেই নজর দেন না এবং বারবার এ নিয়ে কথা বলছেন, যা মোটেও ভালো কাজ নয়।
অর্থমন্ত্রী ১৪ জানুয়ারি বলেছিলেন, শিক্ষকরা তো দাবি করতেই পারেন। কিন্তু তাদের সব দাবি পূরণ করা সম্ভব নয়। কারণ সব দাবি পূরণ করার মতো সরকারের সার্মথ্য নেই।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিক্ষকতা পেশাকে সম্মানের সঙ্গে দেখা হয়, কম নয় বেতনভাতা, সুযোগ সুবিধাও। ওই দেশগুলোর শিক্ষকেরা নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন। আমাদের দেশে কোনোকালেই শিক্ষকদের বেতন সম্মানজনক ছিল না। কায়ক্লেশে দিন যাপন করতেন শিক্ষকেরা। এটি এখন নিছকই পেশা। সময়মতো কর্মস্থলে অবস্থান করেন না। প্রশ্নপত্র ফাঁস, কোচিং বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অনিয়মে জড়িত। শিক্ষামন্ত্রী নৈতিকতাবর্জিত শিক্ষকদের গেটআউট করে দেওয়া হবে বলেও ঘোষণা দিয়েছেন।
শিক্ষকদের নিয়ে সাধারণ্যের দৃষ্টিভঙ্গী ইতিবাচক নয়। অনেকে মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তি শিক্ষকদেরই ভাগ্যের পরিবর্তন করবে, শিক্ষাদানের উন্নতি হবে না। এমপিওভুক্ত হলে শিক্ষকেরা প্রতিষ্ঠানপ্রধানের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের করবেন। যখন-তখন ছুটি নিয়ে কর্মস্থল থেকে চলে যাবেন। পরিচালনা পরিষদের সিদ্ধান্তকে অমান্য করবেন। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে অমনোযোগী হবেন। কোচিং বাণিজ্যে আগ্রহী কিংবা ছাত্রছাত্রীদের প্রাইভেট-কোচিং পড়তে চাপ দেবেন। অভিভাবকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করবেন। নিজেকে জবাবদিহির বাইরে মনে করবেন।
এমপিওভুক্ত হলেই আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো মানুষ গড়ার প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। এমপিওভুক্তিকে ‘খারাপ’ কাজ মন্তব্য করে করণীয় সম্পর্কেও বলেছেন তিনি। এগুলো হলোÑ ছাত্র-উপবৃত্তি, শিক্ষার উপকরণ ও শিক্ষার্থীদের টিফিন দেওয়া।
অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে একমত পোষণ করে উপবৃত্তিকে অর্থবহ ও বিদ্যমান নিয়মনীতি কঠোরভাবে পরিপালনের গুরুত্ব দিতে হবে। উপবৃত্তি প্রাপ্তির শর্ত হলোÑ শিক্ষার্থী অভাবগ্রস্ত, ক্লাসে কমপক্ষে ৭৫ শতাংশ উপস্থিত থাকতে হবে, বার্ষিক পরীক্ষায় ন্যূনতম ৪৫ নম্বর পেতে হবে, অবিবাহিত হতে হবে। এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যথানিয়মে উপবৃত্তির যোগ্যদের তালিকা তৈরি করছে না। বাড়িতে আলিশান ভবন আছে, এমন শিক্ষার্থীকে গৃহহীন হিসেবে দেখানো হয়। স্থানীয় নেতাদের আবদার রক্ষা করতে গিয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীকে পাস দেখাতে হয়। ফলে যার রোল নম্বর ৫ সে চলে যায় শেষদিকে, যার রোল নম্বর শেষ দিকে, সে চলে আসে প্রথম ১০ জনের মধ্যে। এতে বৃত্তি পাওয়ার সুবিধা পায় অপেক্ষাকৃত অবস্থাপন্ন ও অমেধাবী শিক্ষার্থীরা।
উপবৃত্তি পাওয়া শিক্ষার্থীরা ভাতা পায়। আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাদের কাছ থেকে টিউশন ফি পায় না। এতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আয় কমে। অবশ্য বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীপ্রতি টিউশন ফি হিসেবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বার্ষিক ১০০ টাকা পায়। এটি অপ্রতুল। এটি শিক্ষার্থীপ্রতি অন্তত ২ হাজার টাকা করা যেতে পারে।
শিক্ষা উপকরণ ও টিফিন দেওয়ার কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী। এর বাইরে অবকাঠামো নির্মাণেও গুরুত্ব দিতে হবে। এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই ভবন নির্মাণের জন্য বরাদ্দ পায়। এমন দৃষ্টান্তও আছে টানা ৪০ শতাংশের কম শিক্ষার্থী পাস করা প্রতিষ্ঠান চার কোটি টাকা বরাদ্দ পায়। কয়েক বছর শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠান দুই-চার লাখ টাকা অনুদান পায় না। শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধে এমপিওভুক্ত ও নন-এমপিও ভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কী ব্যবস্থা নেন, সে বিষয়ে নজরদারি নেই জনপ্রতিনিধিদের। তারা শুধু নির্বাচনের বছর অর্থ বরাদ্দের দাবি করছেন। এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান সরকারের কাছে বেশি গুরুত্ব পায়। বারবার ধরনা দিয়েও একটি গভীর নলকূপ পায়নি আর্সেনিক-আক্রান্ত এলাকার একটি নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। খালি গ্লাস নিয়ে শতশত শিক্ষার্থী-অভিভাবক ঘেরাও করেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিকে। আজ হোক, কাল হোক সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ক্রমান্বয়ে এমপিওভুক্ত করতে হবে। সে ক্ষেত্রে ব্যয়ভার বহন করতে হবে সাধারণ মানুষকেই। ফলে এমপিওভুক্তি যেন কেবল শিক্ষকদের ভাগ্যোন্নয়ন নয়, শিক্ষার মান উন্নয়নেও ভূমিকা রাখে; সে বিষয়ও দেখতে হবে। শিক্ষকেরা বলছেন, নীতিমালার শর্ত পূরণে যোগ্য ১০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সারাদেশে খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও আছে, যেগুলো এমপিওভুক্তির জন্য আবেদন করেনি। কখনও আবেদন করবে না এমন কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও আছে। এ প্রতিষ্ঠানগুলোর পাবলিক পরীক্ষায় ভালো ফল করে। অভিভাবকদের আস্থাও রয়েছে এসব প্রতিষ্ঠানে।
সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, শর্ত পূরণে করেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হবে। শিক্ষকেরা প্রকৃত অর্থে মানুষ গড়ার কারিগর হবেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মানুষ গড়ার কারখানা হয়ে উঠবে।

গণমাধ্যমকর্মী
[email protected]