আজকের পত্রিকা

শিক্ষা কর্মকর্তাদের উদাসীনতায়ই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অঘটন

আবদুল মকিম চৌধুরী: নির্মাণের চার মাসের মধ্যেই শরীয়তপুর সদর উপজেলার ৪১ নম্বর চর যাদবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবনে ফাটল দেখা দেওয়ার খবরটি প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে।
প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারিতে স্কুল কর্তৃপক্ষকে চার কক্ষের ভবনটি বুঝিয়ে দেয় ঠিকাদার। বুঝিয়ে দেওয়ার পর থেকেই ভবনটির বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখা দিয়েছে। খবরে বলা হয়, প্রতিটি জানালার কলামে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। মেঝের ফ্লোর প্লাস্টারগুলো উঠে গেছে। সিঁড়ি ফেটে আলাদা হয়ে পড়েছে। ভবনের দেওয়ালেও ফাটল ধরেছে। ভবনের গ্রিলগুলোতে বাঁশের চটি দিয়ে ফিক দেওয়া হয়েছে। খবরটি বিদ্যালয় ভবন নির্মাণে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়ম তুলে ধরেনি, স্পষ্ট করেছে জেলা ও উপজেলা শিক্ষা অফিসগুলোর গাফিলতি। প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের দায়িত্বহীনতার এমন দৃষ্টান্ত কম নয়।
বিদ্যা অর্জনের জন্য বিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষার্থীর সম্ভ্রম বা প্রাণ হারানোর ঘটনাও ঘটছে। এতে সংবেদনশীল ব্যক্তিমাত্রই উদ্বিগ্ন হবেন। ফেনী ও বরগুনার তিনটি ঘটনা হতাশাব্যঞ্জক। ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার জায়লস্কর ইউনিয়নের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির এক ছাত্রী অন্তঃসত্ত্বা হয়েছে। ঘটনায় অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক আবদুল করিমকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সভাপতি আবুল বাশার জানান, প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে এর আগেও এলাকার লোকজন, বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকেরা নানা অভিযোগ করেন। তাকে এ বিদ্যালয় থেকে অন্যত্র বদলির জন্য বেশ কয়েকবার লিখিতভাবে থানা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে জানানো হয়েছে। কিন্তু কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি।
খবরে বলা হয়, প্রধান শিক্ষক ঘটনাটির কথা স্বীকার করে শিশুটির পরিবারকে সমঝোতার প্রস্তাব দেন। কিন্তু সমঝোতার প্রস্তাবে সম্মত না হয়ে তার বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলা করেন শিশুটির অভিভাবকরা। প্রথম আলো, ৬ এপ্রিল ২০১৯।
৬ এপ্রিল বরগুনার তালতলী উপজেলার ছোটবগী পিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গ্রেড বিম ধসে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী মানসুরা বেগম নিহত হয়। এ ঘটনায় আহত হয় আরও পাঁচ শিক্ষার্থী। তিন দিন পর একই জেলার পৌর শহরের আমতলাপড়া এলাকার ১৬ নম্বর মধ্য বরগুনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষের ছাদের একাংশ ধসে পড়ে। এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি। তবে আশঙ্কা ছিল। ছাদ ধসে পড়ার সময় শ্রেণিকক্ষে প্রাক-প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের পাঠদান চলছিল। ছাদের একাংশ যেখানে ধসে পড়ে সেখানে রিফাত নামে এক শিক্ষার্থী বসে ঠিল। তবে স্কুলের ড্রেস পরে না আসায় তাকে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। রিফাত ওই জায়গা থেকে উঠে বাড়ি যাওয়ার এক থেকে দেড় মিনিটের ব্যবধানে ছাদ ধসের ঘটনা ঘটে। প্রথম আলো, ১০ এপ্রিল ২০১৯।
ফেনী ও বরগুনার ঘটনাগুলোর দায় এড়াতে পারেন না শিক্ষা কর্মকর্তারা। যথাসময়ে ব্যবস্থা নিলে শিশু দুটি সম্ভ্রম ও প্রাণহানি থেকে হয়তো রেহাই পেত। সম্ভ্রম ও প্রাণহানির জন্য মামলা করা যায়, কিন্তু দায়িত্বে অবহেলা ও ফাঁকিবাজির জন্য তো শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা করা যায় না। শিক্ষা কর্মকর্তারা প্রতিকারে ব্যবস্থা নেবেন না, শিক্ষকও স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে দায়িত্ববান হবেন না। শিক্ষকের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার বিরুদ্ধে মামলা করার কোনো আইনও নেই, যে আইনের বলে সংক্ষুব্ধ অভিভাবক বা নাগরিক মামলা করতে পারেন। আর শিক্ষকদের সংগঠন তো অন্ধভাবেই অভিযুক্ত শিক্ষকের পক্ষ নেবে।
তাই স্কুলে পাঠিয়েই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না, খোঁজ-খবর নিতে হবে স্কুলভবন, শিক্ষক ও শিক্ষার মানের। এর দায় এড়াতে পারেন না শিক্ষা কর্মকর্তারা। আবারও প্রমাণিত হলো কর্মকর্তারা সাধারণ মানুষের অভিযোগ আমলে নেন না। যেন কেবল শিক্ষকদের বিশেষ করে প্রধান শিক্ষকের স্বার্থরক্ষাই তাদের একমাত্র দায়িত্ব।
গ্রামের বাড়ির বিদ্যালয়টির জীর্ণ দশা ও শিক্ষকস্বল্পতা নিয়ে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার দ্বারস্থ হয়েছিলাম। গত বছরের ২৮ সদর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মোল্লার সঙ্গে তার কার্যালয়ে দেখা করি। ৩০৮ শিক্ষার্থীবিশিষ্ট বিদ্যালয়ে তিন শিক্ষক, সেখান থেকে শিক্ষক বদলি না করার জন্য অনুরোধ জানাই। চোখ কপালে তুলে তিনি বললেন, ‘এ কী করে সম্ভব! আমি তো জানতাম না। এ বদলি কার্যকর হবে না।’ বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ সংকট ও ভবন নির্মাণের বিষয়ে তিনি বললেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। এলাকার জীর্ণ বিদ্যালয়ভবনগুলোর তালিকা চেয়েছেন তিনি। এ কর্মকর্তা ‘ওই তালিকায় আপনার বিদ্যালয়ও থাকবে’ বলে নিশ্চিত করেন এবং ১০ দিন পর বিষয়টি জেনে নিতে বলেন। এক মাস পর জীর্ণ বিদ্যালয় ভবনগুলোর তালিকা না হওয়ায় এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে। তিনি জানালেন, এ ধরনের কোনো তালিকার কথা তার জানা নেই। প্রশ্ন ছুড়ে দেন, মন্ত্রী কি জেলা কর্মকর্তা বাদ দিয়ে উপজেলা কর্মকর্তার সঙ্গে সভা করবেন? এ ধরনের কোনো সভা আদৌ হয়নি বলেই জানালেন তিনি।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক বদলি নির্দেশিকা অনুসারে ‘জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার তার নিজ অধিক্ষেত্রে এক উপজেলার মধ্যে সংশ্লিষ্ট উপজেলা শিক্ষা কমিটির সুপারিশক্রমে সহকারী শিক্ষকদের আন্তঃবিদ্যালয় বদলির অনুমোদন প্রদান করতে পারবেন। জেলা প্রাথমিক অফিসারের অনুমোদন গ্রহণ করে উপজেলা/থানা শিক্ষা অফিসার শিক্ষা অফিসার এরূপ বদলির আদেশ জারি করবেন।…’ অর্থাৎ থানা শিক্ষা অফিসারের সুপারিশ ছাড়া কোনো বদলি ও সমন্বয় বদলির সুযোগ নেই। ৩০৮ শিক্ষার্থীবিশিষ্ট বিদ্যালয়ে শিক্ষক তিনজন। সেখান থেকে একজনকে বদলি করলে শিক্ষক হয় দুজন। দুই শিক্ষক দিয়ে বিদ্যালয়টি পরিচালিত হলে এটির পড়ালেখা কেমন হবে, তা বিবেচনায় নেননি শিক্ষা অফিসার। আবার বলছেন, শিক্ষকস্বল্পতার কথা তার জানা নেই। অথচ প্রতি মাসে অনুষ্ঠিত সমন্বয় সভায় শিক্ষকস্বল্পতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। বুঝতে পারি, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার দ্বারা প্রতারিত হয়েছি। পরে শিক্ষা কর্মকর্তার কর্মকাণ্ড সম্পর্কে ব্যক্তিগতভাবে অনুসন্ধান করি। এতে উঠে আসে অনেক কিছু।
বছরের প্রথম দিকে বদলি-বাণিজ্যে লিপ্ত হন শিক্ষা কর্মকর্তারা। নীতিমালা অনুসারে ৩১ মার্চের মধ্যেই বদলি ও সমন্বয় বদলির কাজ সম্পন্ন করতে হয়। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাতে কোন বিদ্যালয়ে কতজন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া দরকারÑএ বিষয়ে স্পষ্ট নীতিমালা আছে। কিন্তু লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা শিক্ষা অফিস নীতিমালা লঙ্ঘন করেই যাচ্ছে। প্রতি মাসে প্রধান শিক্ষকদের নিয়ে সমন্বয় সভা করে সংশ্লিষ্ট ক্লাস্টার অফিসার এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দেন ইউইওর কাছে। ২০১৯ সালেও একই কাণ্ড করলেন ইউইও। একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক দুজন, শিক্ষার্থী ৩৫১ জন। বিস্ময়কর হলো, এমন কর্মকর্তাই জেলার শ্রেষ্ঠ কর্মকর্তা নির্বাচিত হন! আবার প্রধান শিক্ষকদের দিয়ে ক্রেস্ট-সংবর্ধনাও নেন। প্রধান শিক্ষকদের টাইম স্কেলের বকেয়া ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা পরিশোধে বাণিজ্য হয়েছে বলে অভিযোগ আছে।
অবশ্য শিক্ষা কর্মকর্তাদের উদাসীনতার দৃষ্টান্ত নতুন নয়। সাধারণ মানুষের কোনো অভিযোগই কানে নেন না শিক্ষা কর্মকর্তারা। ২০১২ সালের জুলাইয়ে মদনা কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয় (বর্তমানে জাতীয়করণ করা) দুই শিক্ষক প্রশিক্ষণে পিটিআইতে যান। অক্টোবরে প্রধান শিক্ষক মাতৃত্বকালীন ছুটিতে যান সন্তান জন্মের পর। এটি পরিণত হয় এক শিক্ষকের বিদ্যালয়ে। তিন শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে নিজের বিদ্যালয়টি কীভাবে চলবে, সে বিষয়ে আগে কোনো ব্যবস্থা নেননি প্রধান শিক্ষক। ইউইও জগদীশ চন্দ্র দেবনাথকে জানানো হলে এটিকে ‘সব মিথ্যা, ষড়যন্ত্র’ মন্তব্য করে উড়িয়ে দেন। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে (ডিইও) জানানো হলে বিস্মিত হন তিনি। বললেন, পাঁচ মিনিট পর বলছি। তিন মিনিট পর ফোন করে বললেন, ‘আপনার কথা সত্য। আগামী সপ্তাহে একজন শিক্ষক দিচ্ছি। আপনি আর কাউকে বলবেন না।’
এখন প্রশ্ন হলো প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে শিক্ষা কর্মকর্তারা কার স্বার্থ রক্ষা করবেন। শিক্ষকেরা স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে দায়িত্ব পালন করবেন না, প্রশাসন নজরদারি করবে না, শিক্ষকের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ খতিয়ে দেখবেন না শিক্ষা কর্মকর্তারা। বিদ্যালয়গুলোর অভাব-অভিযোগ-অনিয়ম দেখার কেউ নেই।
সচেতন নাগারিকরা এগিয়ে আসতে পারেন বিদ্যালয়ের সমস্যার সমাধানে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর প্রকাশিত বিদ্যালয়ভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা (এসএলআইপি) বা স্লিপ গাইডলাইনে বিদ্যালয়ের স্টেকহোল্ডার নিয়ে স্পষ্ট বলা আছে। এতে বলা হয়েছে, বিদ্যালয়ের স্টেকহোল্ডার বলতে বিদ্যালয়ের অংশীজনকে বোঝায়। বিদ্যালয় থেকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যেসব ব্যক্তি সুবিধা বা উপকার ভোগ করে থাকেন, সেসব সুবিধা বা উপকারভোগীই বিদ্যালয়ের স্টেকহোল্ডার। বিদ্যালয়ের স্টেকহোল্ডাররা নিন্মরূপ:
এক. প্রধান শিক্ষক, দুই. সহকারী শিক্ষকবৃন্দ, তিন. শিক্ষার্থীবৃন্দ, চার. বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা পরিষদ (এসএমসি), পাঁচ. শিক্ষক-অভিভাবক সমিতি পিটিএ, ছয়. অভিভাবকবৃন্দ, সাত. সাবেক শিক্ষার্থীবৃন্দ, আট. বিদ্যালয় এলাকার জনসাধারণ বা বিদ্যালয় কমিউনিটি, নয়. বিদ্যালয়ের শুভানুধ্যায়ী, দশ. প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তা/কর্মচারীবৃন্দ, এগারো. সমাজ ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ।
স্লিপ গাইডলাইনে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব সম্পর্কে বলা হয়েছে। এগুলো হলো বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের স্লিপ প্রণয়নের ক্ষেত্রে টিম লিডার বা প্রধান সংগঠক; প্রধান শিক্ষক স্লিপ প্রণয়নের জন্য মুখ্য ভূমিকা পালন করবেন; প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে স্লিপ প্রণয়নের জন্য প্রাথমিক দায়িত্ব তার ওপর অর্পিত; তিনি বিদ্যালয়ের সব স্টেকহোল্ডারকে স্লিপ প্রণয়ন কার্যে সম্পৃক্ত করে এ কার্যটিকে অংশগ্রহণমূলক করা নিশ্চিত করবেন। তিনি দানের কল্যাণমূলক গুরুত্ব ও তাৎপর্য উল্লেখ করে স্থানীয় জনগণকে অনুদান প্রদানে উদ্বুদ্ধ করবেন; তিনি সিøপ কার্যক্রমবিষয়ক একটি নথি খুলবেন এবং স্লিপবিষয়ক যাবতীয় কাগজপত্র এ নথিতে সংরক্ষণ করবেন। তিনি নিজস্ব আয়মূলক কার্যক্রমের যথাযথ হিসাব সংরক্ষণ করবেন, আয় বৃদ্ধিতে তৎপর হবেন এবং আয়ের যাবতীয় অর্থ স্লিপতহবিলে জমা দেবেন। বিদ্যালয়ের সব স্টেকহোল্ডারের বিদ্যালয়ের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন ও সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করে বিদ্যালয়ের প্রতি তাদের মালিকানাবোধ সৃষ্টি করবেন। এসএমসি, পিটিএ ও স্লিপ প্রণয়ন টিম গঠনের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবেন। স্থানীয় সম্পদ সংগ্রহে তিনি উদ্যোগী হবেন এবং সম্পদ সংগ্রহের সর্বাত্মক চেষ্টা করবেন; প্রধান শিক্ষক স্লিপ প্রণয়ন এবং স্লিপ নিরীক্ষা ও মূল্যায়ন টিম গঠনে নেতৃত্ব দেবেন। তার নেতৃত্বে খসড়া স্লিপ প্রণীত হবে। তিনি প্রাথমিকভাবে খসড়া স্লিপ অনুমোদনের জন্য এমএমসির সভায় পেশ করবেন। এমএমসির সভায় অনুমোদিত স্লিপসংশ্লিষ্ট সহকারী উপজেলা/থানা শিক্ষা অফিসারের কাছে পেশ করবেন; তিনি অনুমোদিত স্লিপবাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবেন; প্রধান শিক্ষক স্লিপ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে মুখ্য ভূমিকা পালন করবেন; প্রধান শিক্ষকের যাবতীয় দায়িত্বপালন করে স্লিপ কার্যক্রমকে সামাজিক আন্দোলন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন। তিনি বাস্তবায়ন অগ্রগতি পরিবীক্ষণ করে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবেন। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, পিটিএর সদস্যবৃন্দ এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে স্লিপ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন-সম্পর্কিত তথ্যাদি প্রদর্শনের ব্যবস্থা করবেন; স্থানীয় জনগণকে স্লিপ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেবেন। প্রধান শিক্ষক এসএমসি অনুমোদিত স্লিপ পরিকল্পনা ইউইও/টিইও বরাবরে পাঠাবেন। স্লিপ গ্র্যান্ট এবং স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত সম্পদের সমন্বয়ে বিদ্যালয়কে কাক্সিক্ষত মানের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের লক্ষ্যে স্থানীয় সম্পদ সংগ্রহের জন্য জনগণকে উদ্বুদ্ধ করবেন। স্লিপ গ্র্যান্টের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে ভ্যাটের চার্ট অনুসরণ করে প্রযোজ্য ক্ষেত্রের ভ্যাট কর্তনপূর্বক সোনালী ব্যাংক বা বাংলাদেশ ব্যাংকে তা জমা দিয়ে চালানের কপিসহ গ্র্যান্টের অর্থ ব্যয়ের সমুদয় ভাউচার ৩১ মে’র মধ্যে উপজেলা বা থানা শিক্ষা অফিসে দাখিল করবেন। বিদ্যালয়ের অফিসকক্ষের নোটিসবোর্ডে অনুমোদিত স্লিপ পরিকল্পনার পরিশিষ্ট-১-এর ১৫ ক্রমিকের ছকের ০১টি কপি সাঁটিয়ে রাখবেন। স্লিপ বাজেটভুক্ত অর্থব্যয়ের জন্য ক্যাশ বই সংরক্ষণ করবেন। স্লিপপরিকল্পনাভুক্ত কোনো কার্যক্রমে মালপত্র ক্রয় নির্ধারিত থাকলে তা ক্রয়পূর্বক স্টক রেজিস্টারে এন্ট্রি করবেন এবং স্টক রেজিস্টার থেকে মালপত্র ইস্যু করে তা ব্যবহার করবেন। উল্লিখিত দায়িত্বগুলো সম্পাদনে অন্য শিক্ষকদের সহায়তা নেবেন এবং সব শিক্ষক একটি টিম হিসেবে কাজ করবেন। তিনি বিদ্যালয়ভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা কার্যক্রমকে সামাজিক আন্দোলন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন। স্লিপ
সিøপ অনুসারে দায়িত্ব পালন করতে গেলে একজন প্রধান শিক্ষককে সার্বক্ষণিক কর্মস্থলে উপস্থিত থাকতে হবে। স্লিপ অনুদানের অর্থ ব্যয়ের বিষয়ে স্বচ্ছ থাকবেন। বিদ্যালয়ের সব স্টেকহোল্ডারের বিদ্যালয়ের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন ও সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করে বিদ্যালয়ের প্রতি তাদের মালিকানাবোধ সৃষ্টি করবেন। কোনো কোনো প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ের সব অংশীজনের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপনের পরিবর্তে শিক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপনকে গুরুত্ব দেন। ফলে প্রধান শিক্ষক কর্মস্থলে প্রায়ই অনুপস্থিত থাকলেও শিক্ষা কর্মকর্তারা ব্যবস্থা নেন না। শিক্ষা কর্মকর্তাদের বলে বলীয়ান হয়ে কোনো কোনো প্রধান শিক্ষক অভিভাবকদের উদ্দেশে বলেন, ‘কেউ আমার কিচ্ছু করতে পারবে না।’
সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, তারাও মনে করেন শিক্ষকেরা পরম পূজনীয়, মানুষ গড়ার কারিগর। কেবল ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে প্রধান শিক্ষকসহ কোনো শিক্ষকের সমালোচনা করেন না তারা। শিক্ষার্থীদের পাঠদানে যে শিক্ষকের আগ্রহ নেই, নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসেন না; তাদের বিরুদ্ধেই তাদের অবস্থান। সম্প্রতি একটি বিদ্যালয়ের কয়েকজন অভিভাবকের স্বাক্ষরসংবলিত একটি আবেদনপত্রের অনুলিপি পেয়েছি। তাদের লেখা ও স্বাক্ষরের ধরন দেখে মনে হয়েছে, তারা একবারে নিরীহ, গোবেচারা। মিথ্যা অপবাদ দেওয়ার দুঃসাহস ও যোগ্যতা তাদের নেই। তাদের অভিযোগ, তাদের সব কথায় সায় দিলেও অফিসাররা প্রতিকারে কোনো ব্যবস্থা নেন না।
আমরা মনে করি, ফেনীতে শিক্ষার্থীর সম্ভ্রমহানি, বরগুনায় প্রাণহানি, শরিয়তপুরসহ বিভিন্ন স্থানে জীর্ণ ভবনে পাঠদান প্রভৃতির দায় এড়াতে পারবেন না প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারা। নতুন করে এ ধরনের ঘটনা যেন না ঘটে, সেজন্য দায়িত্বশীল হবেন। তাদের কাজে সাধারণ মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা প্রতিফলিত হবে, এটিই প্রত্যাশা।

গণমাধ্যমকর্মী

[email protected]

সর্বশেষ..