শিশুস্বাস্থ্য নিয়ে ভাবনা

বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস

রতন কুমার দাস: নিজ দেহকে কে না ভালোবাসে। সেই ভালোবাসা একটু দেরিতে শুরু হয় এই আরকি। আবার অনেকে কৈশোর পেরিয়ে যুবাবয়সেও বোঝে না এর গুরুত্ব। ফলে ভঙ্গুর হয়ে পড়ে স্বাস্থ্য। অথচ দেহযত্নের চর্চা শিশুকালে শুরু হলে সুন্দর জীবনযাপন করা যায়। তাই শরীরের প্রতি শিশুরা যেন এ বয়সে যত্নশীল হয়ে ওঠে সেজন্য বাবা-মায়ের ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। শিশুরা মা-বাবা ও বড়দের কাছ থেকে শেখে। আর শিশুর ভালো-মন্দের ওপর নির্ভর করে মা-বাবার পৃথিবী।

প্রতিবারের মতো এ বছরও আজ (৭ এপ্রিল) বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস উদ্যাপিত হবে। শৈশব থেকেই দেহকে পবিত্র ও উপাসনালয় হিসেবে গণ্য করা উচিত অভিভাবকরা সন্তানকে এমন শিক্ষা দিতে পারেন। শরীরের প্রতি এ দৃষ্টিভঙ্গি শিশুদের দীর্ঘ সুন্দর ও কর্মক্ষম জীবন উপহার দেবে। এবারের স্বাস্থ্য দিবস হতে পারে তাদের সচেতন করে তোলার উপযুক্ত সময়। ধূমপানের মতো ক্ষতিকর পথ এড়িয়ে চলার মন্ত্রণা দেওয়া যেতে পারে তাদের।

হাত ধোয়ার মতো ছোট অথচ গুরুত্বপূর্ণ কাজটি শেখান আপনার শিশুকে। সুস্থ থাকার অন্যতম মৌলিক ও কার্যকর পদ্ধতি এটি। কোনো কিছু খাওয়ার আগে ও পরে, শৌচাগার ব্যবহারের পরে, ময়লা কিছু ধরার পরে ও পশুপাখিকে আদর করার পরে হাত ধুতে উৎসাহ দিন তাকে। ইংল্যান্ডের মতো উন্নত দেশে অভিভাবকদের পাশাপাশি ওই দিন প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি স্কুলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হাত ধোয়ার ওপর বিভিন্ন প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করা হয়। সেখানে হাত ধোয়ার কলাকৌশল উপস্থাপনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। আমাদের দেশের বিদ্যালয়গুলোয় প্রজেক্টরের মাধ্যমে এমন পদ্ধতি শিশুদের সামনে তুলে ধরা যেতে পারে। আয়োজন করা যেতে পারে স্বাস্থ্যবিষয়ক কর্মশালাও। উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্য দিয়ে শিশুরা স্বাস্থ্যকর জীবনধারা সম্পর্কে ধারণা পাবে নিশ্চিত। যথানিয়মে গোসল করা, শ্যাম্পু দেওয়া প্রভৃতিতে অভ্যস্ত করে তুলুন শিশুকে।

শিশু যেন প্রতিদিন দাঁত ব্রাশ করে সেদিকে নজর দিন। মুখের স্বাস্থ্যের ওপরও দেহের সুস্থতা নির্ভর করে। শিশুরা ব্রাশ করতে আগ্রহ দেখায় না খুব একটা। তাই প্রতিমাসে একবার ব্রাশ ও পেস্ট পরিবর্তন করতে পারেন। অভিনয় করুন দাঁত মাজার।

স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলার কারণে উন্নত দেশগুলো অতীতে অনেক দুর্ভোগ পোহায়। বেশ কয়েকটি মহামারী দেখা দেয় ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলোয়। এসব বিষয়ে শিশুদের সঙ্গে আলাপ করতে পারেন। দু-একটি উদাহরণ দিতে পারেন তাদের। অপরিষ্কার পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা ও অসচেতনতার কারণে উনিশ শতকের প্রথমার্ধেও এই দুই মহাদেশের অনেক দেশের মানুষের গড় আয়ু কম ছিল। উন্নত দেশগুলোয় এমন অবস্থা হলে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশেও এমনটি হতে পারে, এটি শিশুদের বোঝানো যেতে পারে।

একসঙ্গে অনেক মানুষ বসবাস করলে দ্রুত রোগজীবাণু ছড়িয়ে পড়ে। তাই যতটা সম্ভব প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকা উচিত সব বয়সী মানুষের। অন্তত খোলা আকাশের নিচে নিয়ে আসুন শিশুটিকে। আধুনিক শিশুরা বাইরে যায় কম। টিভি দেখে বেশি। ভিডিও গেমস খেলে সময় কাটায়। প্রযুক্তির এই মাত্রাতিরিক্তি আসক্তির অনেক কুফল রয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা টেলিভিশনের সামনে না কাটিয়ে খেলাধুলা করতে উৎসাহিত করুন সবাইকে। কম্পিউটার কিংবা মোবাইল ফোনের পর্দায় বেশিক্ষণ বসে থাকা কিংবা চোখ রাখা উচিত নয়। অন্যথায় এসব অভ্যাসের বশে শিশুরা পরিণত বয়সে অনেক সামাজিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়।

সুষম খাবারের প্রতি আগ্রহী করে তুলুন শিশুকে। সব ধরনের প্রক্রিয়াজাত, প্যাকেটজাত ও ফাস্ট ফুড এড়িয়ে চলুন পরিবারের সবাই। মাংসজাত খাবার কমিয়ে নানা ধরনের ফলমূল ও শাকসবজির প্রতি আগ্রহী করে তুলুন শিশুকে। মিষ্টির পরিমাণ কমান। কুকিজ, ক্যান্ডি, কেক, সস, ড্রিংকস প্রভৃতি বাদ দিন খাবার তালিকা থেকে। স্থূলতা এড়াতে এসব খাবার তাকে খেতে দেওয়া উচিত নয়। অনেক অভিভাবক সন্তান মোটা হলে তাকে কম খাওয়ার অভ্যাস করান। এ ধরনের অভ্যাস বাদ দিতে হবে, কেননা এতে ক্ষতির আশঙ্কা বাড়তে পারে।

শিশুর প্রয়োজন মানসিক সুস্থতা। এজন্য তাকে সময় দিন এবং তা হতে হবে গুণগত। শিশু যেন নিঃসঙ্গ না হয়ে পড়ে। তাহলে তার বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় অনেক সমস্যা দেখা দেবে। শিশুর বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে। সুযোগ পেলেই তাই বেরিয়ে পড়–ন তাকে নিয়ে। কড়া নিয়মে না বেঁধে রুটিনমাফিক চলতে-ফিরতে সহায়তা করুন। সহজে যেন অন্যের সঙ্গে নিজের আবেগ-অনুভূতি ভাগ করে নিতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখুন। যেমন ধরুন, আজ স্কুলে আনা টিফিন অন্য কারও সঙ্গে ভাগ করে খেতে বলুন তাকে। আপনার শিশুসন্তান সহপাঠীদের সঙ্গে মিশতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে কি না, তা খেয়াল করুন। শিশুটি অস্তস্তিবোধ করে কি না, তার কথা ও আচরণে অন্যরা অসন্তুষ্ট কি না, জানার চেষ্টা করুন। এসব সমস্যার সমাধান করুন, এটা শুরু করতে হবে বাসগৃহ থেকে। প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। শিশুটি যেন তাদের সাহচর্য পায়। তাকে সময় দেওয়ার সময় পূর্ণ মনোযোগ দিতে হবে তার প্রতি। তাকে সৌজন্যবোধের শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন। পরিমিতিবোধের চর্চা শুরু করতে হবে মা-বাবাকেই। শিশু যেন সবসময় তাদের অস্তিত্ব অনুভব করে, যেন মনে করে মা-বাবা সবসময় তার পাশেই আছেন।

কেমন হয় ব্যায়ামের দিকে ঝুঁকলে? আজই আপনার সন্তান ব্যায়াম শুরু করুক, এজন্য তাকে উৎসাহ দিন। নাড়ি ধরে শিশুর পালস রেট সম্পর্কে শিক্ষা দিন। ব্যায়ামের পরে এই রেটে কেমন পরিবর্তন আসতে পারে সে বিষয়ে ধারণা দিন। শ্বাস-প্রশ্বাস ও হƒৎস্পন্দনের পরিবর্তন কেমন হয়, তা জানিয়ে দিন। এলিভেটরের পরিবর্তে সিঁড়ি ভেঙে চলতে উৎসাহ দিন। কাছাকাছি কোথাও যাওয়ার জন্য রিকশা কিংবা গাড়ির পরিবর্তে হাঁটতে বলুন। সাঁতার কাটা শেখান। সাইকেল চালাতে দিন। দেহ ও মনের সুস্থতায় ব্যায়ামের উপকারিতা তার মনে গেঁথে দিন এবারের স্বাস্থ্য দিবসে।

পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুম যেন হয় সেদিকে অবশ্যই খেয়াল রাখবেন। শিশুর বিকাশ ও উন্নতিতে ঘুম অপরিহার্য। শিশুর বিশ্রামও হোক পর্যাপ্ত।

রোগবালাই থেকে দূরে থাকা শিশু সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে বেড়ে উঠবে এবং অগ্রসরমাণ ও উৎপাদনক্ষম সমাজের উন্নয়নে শরিক হতে পারবে। তাই শিশুদের প্রতি তুলনামূলকভাবে বেশি মনোযোগী হওয়া উচিত যেন তারা দেহ-মন নিয়ে দুশ্চিন্তায় না পড়ে। এর মধ্য দিয়ে শৈশব ও কৈশোরের সঠিক উন্নয়ন হবে। শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নের সব পর্যায়ে শিশুদের নির্দিষ্ট প্রয়োজন পূরণ করতে হবে। এবারের স্বাস্থ্য দিবস থেকে শুরু হোক শিশুর জন্য বাড়তি যত্ন।

 

গণমাধ্যমকর্মী

[email protected]