শীতলক্ষ্যা তীরে জাহাজ নির্মাণশিল্পের ভিত

সময়ের সঙ্গে বিস্তৃত হচ্ছে নতুন নতুন শিল্প। রাজধানীর চারপাশে বিভিন্ন এলাকার নামের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ‘শিল্পাঞ্চল’ শব্দটি। পুরোনো-নতুন খাতে বিনিয়োগকে ঘিরে রাজধানীর পার্শ্ববর্তী এলাকায় কর্মচাঞ্চল্য বাড়ছে। এতে উম্মুক্ত হচ্ছে নতুন সম্ভাবনার দ্বার, তৈরি হচ্ছে লাখো মানুষের কর্মসংস্থান। রাজধানীর আশেপাশের এসব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে ধারাবাহিক আয়োজনের ছাপা হচ্ছে আজ প্রথম পর্ব

মোহাম্মদ ওয়ালীউল্লাহ ও রাসেল আহমেদ: ‘প্রাচ্যের ড্যান্ডি’-খ্যাত নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে শিল্পকারখানার গোড়াপত্তন আশির দশকে। বিশ্বমাতানো জামদানি শাড়ির সূতিকাগার এখন ‘রূপগঞ্জ শিল্পাঞ্চল’ হিসেবে ব্যাপক পরিচিত। দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে রূপগঞ্জ শিল্পাঞ্চলে। রাজধানীলাগোয়া ওই অঞ্চলে শিল্পায়নের অন্যতম অনুঘটক শীতলক্ষ্যা নদী। এ কারণে এক যুগ আগে নতুন নতুন শিল্পের পথচলা শুরু হয়েছে। শীতলক্ষ্যাকে ঘিরে গড়ে ওঠা তেমনি একটি সম্ভাবনাময় খাত হয়ে উঠছে জাহাজ নির্মাণশিল্প।
গ্রামের পথ চলতেই টুকটাক শব্দে কান ঝালাপালা হওয়ার উপক্রম। ডেমরা থেকে শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম তীরঘেঁষে উত্তরে কালো অজগরের মতো এঁকেবেঁকে গেছে পিচঢালা সড়ক। সেই রাস্তা ধরে মাত্র তিন কিলোমিটার এগোলেই জাহাজ তৈরির অসংখ্য কারখানার দেখা মিলবে। কোনোটি সবে তৈরি হচ্ছে, কোনোটির নির্মাণকাজ সমাপ্তির পথে। বড় বড় জাহাজ দেখে যে কারও চোখ ধাঁধিয়ে যাবে। শীতলক্ষ্যাপাড়ের ওই চরটি এখন এলাকাবাসীর কাছে ‘জাহাজের চর’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ওই গ্রামের পোশাকি নাম ‘কায়েতপাড়া’, অবস্থান রাজধানীর অদূরে রূপগঞ্জ উপজেলায়।
পাঁচ বছর আগেও বন্যাকবলিত ওই এলাকায় একটি পাখি ডেকে উঠলে তার শব্দ বাতাসে ভেসে দূর-দূরান্তে চলে যেত। বর্ষায় এলাকাবাসীকে নৌকা চড়ে এখানে-ওখানে যেতে হতো। ‘অজপাড়াগাঁও’ বলতে যা বোঝায় তেমনই একটি গ্রাম ছিল এই কায়েতপাড়া। সময়ের ব্যবধানে এখন সেখানেই গড়ে উঠছে জাহাজ নির্মাণ শিল্প। কয়েক হাজার মানুষের পদচারণায় কায়েতপাড়া এখন এক কর্মমুখর জনপদ। কায়েতপাড়া এলাকার পূর্বগ্রাম, ভাওয়ালীয়াপাড়া, ডাক্তারখালী, বড়ালু, মাঝিনা, হড়িনা ও ইছাখালীর চরে প্রায় অর্ধশতাধিক জাহাজ তৈরির কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। এছাড়া উপজেলার মুড়াপাড়া ইউনিয়নের গঙ্গানগর ও দড়িকান্দির চরেও আরও আট-দশটি কারখানা রয়েছে। কায়েতপাড়ার জাহাজ কারখানাগুলোতে আড়াইশ ফুট থেকে শুরু করে শত ফুটের কোস্টার বা মালবাহী জাহাজ, সরোঙ্গা, ফেরি, জেটি, পন্টুন, বালুবাহী ট্রলার, বলগেট আর ড্রেজার তৈরি হয়। দিনভর টানা খুট-খাট আর টং-ঢং শব্দে মুখরিত এলাকায় জাহাজ নির্মাণের মহোৎসব চলছে।
রাজধানীর কোলঘেঁষা এই জনপদ একসময় অবহেলিত ছিল। বছরের অর্ধেক সময়ই নিচু এলাকাটি জলমগ্ন থাকত। কৃষিনির্ভর এলাকায় বছরে মাত্র একটি ফসল উৎপাদন হওয়ায় মানুষ খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাত। এমন এক সময়ে ওই এলাকার বাসিন্দা আবদুল মালেক ও ফটিক খান নারায়ণগঞ্জের বন্দর এলাকার সোনাকান্দায় ট্রলার তৈরির কথা জানতে পারেন। সেখানে গিয়ে শীতলক্ষ্যার বুকে জেগে ওঠা সামান্য চরে ট্রলার তৈরি করতে দেখেন তারা। এরপর নিজ গ্রামের চরাঞ্চলে ওই শিল্প চালুর উদ্যোগ নেন। কায়েতপাড়ার প্রায় পতিত চরের জমিকে কাজে লাগাতে তারা একাধিকবার দোহারে যান। জাহাজ মালিকদের সঙ্গেও কথা বলেন। তাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ২০০৫ সালে পূর্বগ্রাম এলাকায় দুটি জাহাজ নির্মাণ কারখানা চালু হয়। ওই কারখানা দুটি লাভের মুখ দেখার পর একে একে গড়ে উঠেছে অর্ধশত কারখানা।
জাহাজ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মহব্বত হোসেন খান নয়ন শেয়ার বিজকে বলেন, জাহাজ নির্মাণ শিল্প এ অঞ্চলে শিল্পায়নের নতুন দ্বার উšে§াচন করেছে। বহু মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। এলাকার মানুষ। এখানকার কারখানাগুলোয় আড়াইশ ফুটের জাহাজ থেকে শুরু করে ১০০ ফুটের কোস্টার বা মালবাহী জাহাজ, সরোঙ্গা, ফেরি, জেটি, পন্টুন, বালুবাহী ট্রলার, বলগেট ও ড্রেজার তৈরি করা হচ্ছে। কিছু প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠলে ও শিল্পের উদ্যোক্তাদের পুঁজিসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হলে ওই শিল্পটি রূপগঞ্জসহ দেশের উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।’
‘দেশভরা যার গোলা, ভাতে মরে তার পোলা’ লোহার মতোই কঠিন কাজ করা মানুষগুলোর দুরবস্থার কথা জানানোর জন্য এমন প্রবাদ এখানেও কানে বাজে। হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পরও ভালো নেই তারা। ‘কাজের তুলনায় বেতন অনেক কম’ হলেও নিজ এলাকায় কাজের সুযোগ পেয়ে খুশি অনেকেই। অন্যদিকে শিল্পের উদ্যোক্তারাও বলছেন, ‘শ্রমিকদের দৈনিক হাজিরা, প্রয়োজনীয় মালামাল কেনা, বিদ্যুৎ বিল আর জমির ভাড়া গুনতে একটু হেরফের হলেই লোকসানের মুখে পড়তে হয়। তারপরও সম্ভাবনাময় হওয়ায় এ শিল্প দিন দিন বাড়ছে।
কায়েতপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম রফিক শেয়ার বিজকে বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে ধীরে ধীরে জাহাজ শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে। এ শিল্পের কারণে এলাকার শত শত বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। এ শিল্প কায়েতপাড়া ছাড়িয়ে রূপগঞ্জের অনেক এলাকায় গড়ে উঠেছে।’