শীর্ষ খেলাপি ঢাকা ট্রেডিংয়ের পুনরায় ঋণ পেতে দৌড়ঝাঁপ

মেহেদী হাসান: ঢাকা ট্রেডিং হাউজ। জাতীয় সংসদে প্রকাশিত শীর্ষ ১০০ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির তালিকায় নাম রয়েছে এ প্রতিষ্ঠানের। ঢাকা ট্রেডিংয়ের কাছে জনতা, বিডিবিএল, সাউথইস্ট, এক্সিম ও শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪৫৮ কোটি টাকার ওপরে। ঋণের কোনো টাকাই পরিশোধ করেনি এ খেলাপি প্রতিষ্ঠান। তবে ঋণ পেতে আবারও ব্যাংকে ব্যাংকে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছে ঢাকা ট্রেডিং। সম্প্রতি রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকে ঢাকা ট্রেডিং হাউজের একটি ঋণ আবেদন নাকচ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
জানা গেছে, ঢাকা ট্রেডিং হাউজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বগুড়ার ব্যবসায়ী টিপু সুলতান। ২০০৯ সাল থেকে উত্থান টিপু সুলতানের। ব্যাংক থেকে হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে পরিবহন ব্যবসায় নামেন তিনি, গড়ে তোলেন টিআর ট্রাভেলস। প্রথমে ঢাকা ট্রেডিং হাউজের নামে ঋণ নিয়ে ভোগ্যপণ্যের ব্যবসা শুরু করলেও পরিবহন ব্যবসার মাধ্যমে নিজের বিস্তার ঘটান। খুলনায় পাট ব্যবসায়ও বিস্তার রয়েছে এ ব্যবসায়ীর।
সূত্র জানায়, পণ্য আমদানির নামে এলসি খুলে জনতা ব্যাংক থেকে প্রায় ২৫১ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলায় ২০১৬ সালের মার্চে খুলনা থেকে টিপু সুলতানকে গ্রেফতার করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। পরে জামিন পেয়ে উধাও হয়ে যান তিনি। ঋণের নামে হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া টিপু সুলতানকে খুঁজে পাচ্ছে না ব্যাংকগুলো। তবে ব্যাংক ঋণ পেতে আবারও দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছে এ খেলাপি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তরা।
রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকে সম্প্রতি ঋণ আবেদন করে ঢাকা ট্রেডিং। তা বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো হয় সিআইবি (ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো) রিপোর্ট যাচাইয়ের জন্য। বাংলাদেশ ব্যাংক যাচাই করে দেখে ঢাকা ট্রেডিং হাউজ একটি খেলাপি প্রতিষ্ঠান। তাই তাদের ঋণ আবেদন নাকচ করে দেওয়া হয়। ব্যাংক ঋণ পেতে আরও কয়েকটি ব্যাংকে ঘুরে বেড়াচ্ছেন টিপু সুলতান।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আতাউর রহমান প্রধান শেয়ার বিজকে বলেন, খুলনার এ পার্টির কাছে আমাদের অনেক আগের ঋণ রয়েছে। তবে এসব ঋণ নিয়মিত আছে।
সূত্রমতে, টিপু সুলতানের কাছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের। রূপালী ব্যাংকেরও রয়েছে ১১০ কোটি টাকার ঋণ। এর বাইরে টিপু সুলতানের কাছে ৯০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেডের (বিডিবিএল)। ‘টিআর স্পেশালাইজড কোল্ডস্টোরেজ (প্রা.) লিমিটেড’-এর কাছে বিডিবিএলের পাওনা প্রায় ১৪ কোটি টাকা। ব্যাংকটির একই শাখা থেকে অপর প্রতিষ্ঠান ‘ঢাকা ট্রেডিং’-এর নামে ৪২ কোটি টাকার পৃথক ঋণ সুবিধা ভোগ করেছেন টিপু সুলতান। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন তারিখে যা ‘ক্ষতিজনক’ মানে শ্রেণিকৃত ছিল। জালিয়াতি করে এ টাকা হাতিয়ে নেন তিনি।
এছাড়া এ ব্যবসায়ীর কাছে এবি ব্যাংকের ঋণের পরিমাণ ৭০ কোটি টাকা, এক্সিম ব্যাংকের প্রায় ১৫০ কোটি, সাউথইস্ট ব্যাংকের প্রায় ৫০ কোটি, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ৩০ কোটি, ইসলামী ব্যাংকের তিন কোটি, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের দুই কোটি, ইউসিবির তিন কোটি ও প্রাইম ব্যাংকের তিন কোটি টাকা। ঢাকা ট্রেডিং হাউজ লিমিটেড, টিআর স্পেশালাইজড কোল্ডস্টোরেজ এবং টিআর ট্রাভেলসের নামে ব্যাংকগুলো থেকে এ ঋণ নিয়েছিলেন টিপু সুলতান, যার প্রায় পুরোটাই এখন খেলাপি। এর মধ্যে অধিকাংশ ঋণই দেওয়া হয়েছে জামানত ছাড়া।
আর্থিক খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, এ শীর্ষ খেলাপিদের প্রকৃতপক্ষে ঋণ দেওয়া হয়নি। একটি প্রক্রিয়ায় অর্থ লুট করা হয়েছে। খেলাপি ঋণ সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ শেয়ার বিজকে বলেছিলেন, ২০১০ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণে ব্যাপকহারে অনিয়ম করে। অনিয়মে বিতরণ করা এসব ঋণ এখন খেলাপি হয়ে পড়েছে। এগুলো যতদিন থাকবে খেলাপি ঋণ ততদিন বাড়তেই থাকবে। তবে গত দুই বছর ধরে ব্যাংক খাতে যেসব নতুন এমডি নিযুক্ত হয়েছেন, তারা ভালোভাবেই ব্যাংক চালাচ্ছে। অর্থাৎ ঋণ অনিয়ম আগের তুলনায় কমেছে।
জানা গেছে, বগুড়া শহরের দক্ষিণ চেলোপাড়া-নারুলী এলাকার মৃত মালেক মণ্ডলের সন্তান টিপু সুলতান। মালেক মণ্ডল ক্ষুদ্র পরিসরে পাটের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে বৈবাহিক সূত্রে অনেক দিন আগে থেকেই বসবাস করতেন খুলনার রেলগেট এলাকায়।
রাজধানীর পুরানা পল্টনে বাইতুল আবেদ ভবনের ১১ তলায় অবস্থিত ঢাকা ট্রেডিং হাউজের কার্যালয়। জানা গেছে, এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই পাট ব্যবসা করেন তিনি। গতকাল ওই ভবনে গিয়ে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির গেটে তালা। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক টিপু সুলতানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মুঠোফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
পরে ঢাকা ট্রেডিংয়ের কর্মকর্তা (কমার্শিয়াল) জসিম উদ্দিন মুঠোফোনে শেয়ার বিজকে বলেন, ‘ব্যবস্থাপনা পরিচালক বেশিরভাগ সময়ই খুলনা থাকেন, ঢাকার এই অফিসে খুব কম আসেন।’ ঋণের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।