‘শুধু রেমিট্যান্স আনাই নয়, প্রবাসীর জীবনের মানোন্নয়নেও কাজ করব’

প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক অতিশিগগিরই বিশেষায়িত তফসিলি ব্যাংক হিসেবে বাণিজ্যিক কার্যক্রম সম্প্রসারিত করতে যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে শেয়ার বিজের সঙ্গে কথা বলেছেন প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের চেয়ারম্যান বেগম শামসুন নাহার। তিনি ২০১৭ সালে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তানিয়া অফরোজ

শেয়ার বিজ: ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া বিশেষায়িত প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক সম্প্রতি  বাংলাদেশ ব্যাংকে তফসিলি হতে চলেছে রূপান্তরের মূল উদ্দেশ্য কী?

শামসুন নাহার: বিস্তীর্ণ ব্যাংকিং নেটওয়ার্কের আওতায় কাজ করার লক্ষ্যে এ তফসিলীকরণ। এতদিন শুধু বিদেশ যাওয়ার আগে এবং বিদেশ থেকে ফেরত আসার পর প্রবাসীদের আত্মকর্মসংস্থানের লক্ষ্যে স্বল্প সুদে (৯ শতাংশ) জামানতবিহীন ঋণ দেওয়া হতো। মাত্র ১০০ কোটি টাকা মূলধন নিয়ে বিশেষায়িত এ ব্যাংকের যাত্রা শুরু হয়। কিন্তু শুধু পরিশোধিত মূলধন দিয়ে ব্যাংক পরিচালনা করা কঠিন। আমরা দেখলাম, ব্যাংকটি  তফসিলীকৃত না হলে অর্থাৎ সার্বিক ব্যাংকিং করতে না পারলে, টিকে থাকতে পারবে না। প্রবাসী সেবাদানেও থাকবে পিছিয়ে। শুধু ৯ শতাংশে ঋণ দিয়ে তো টেকা যায় না, গড় খরচই যেখানে ১১ শতাংশ। বর্তমানে আমরা এ ব্যাংকের মাধ্যমে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স আনতে পারি না। এটা একটা বিশেষ সেবা যার জন্য ব্যাংকটিকে তফসিলীকৃত হতে হবে।

শেয়ার বিজ: ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে না আসায় প্রবাসী আয়ের বিরাট অংশ দেশের অর্থনীতির বাইরে থেকে যাচ্ছে অবস্থা থেকে উত্তরণে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের কি কোনো পরিকল্পনা রয়েছে?

শামসুন নাহার: প্রধানমন্ত্রীর লিখিত নির্দেশনা আছে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স এ ব্যাংকের মাধ্যমে আনতে হবে। সে কারণেই প্রধানত তফসিলীকরণের তাগিদ। একজন কর্মী বিদেশে যাওয়ার আগে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকে হিসাব খুলে যাবে এবং আমাদের পক্ষ থেকে তার সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রাখা হবে। এখন যেমন হিসাব খুললেও কোনো লাভ নেই, কারণ কোনো রকম ব্যাংকিং সেবা দিতে পারি না। কিন্তু তফসিলীকরণের পর গন্তব্য দেশের ‘ড্রয়িং অ্যারেঞ্জমেন্ট’-এর মাধ্যমে প্রবাসীরা এ দেশে টাকা পাঠাতে পারবে। তখন টাকাগুলো অর্থনীতিতে প্রদর্শিত হবে। আমাদের সবকটা শাখায় এখন অনলাইন সেবা চালু আছে। তফসিলীকরণের সঙ্গে সঙ্গে অনলাইন সেবাদানে বৈচিত্র্য আনা সম্ভব হবে। এছাড়া ডাকবিভাগের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। আমাদের অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠালে ডাকবিভাগের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রবাসীর পরিবারের কাছে তা চলে যাবে মুহূর্তেই।

শেয়ার বিজ: বিকাশ বা হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ার প্রধান কারণ হচ্ছে চ্যানেলগুলোর মাধ্যমে প্রবাসীরা সহজসাধ্য সেবা পায় বিনিময়হারও বেশি পায় তফসিলীকরণের পর চ্যালেঞ্জকে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক প্রতিরোধ করবে কীভাবে?

শামসুন নাহার: আমরা নিশ্চয়ই বিকাশের চেয়ে বেশি সুবিধা দেব। এটা তো প্রতিযোগিতামূলক। প্রবাসীরা যদি এ ব্যাংক থেকে বেশি সেবা ও সুবিধা পায়, তখন তো বিকাশে যাবে না। তারা যেন বিকাশের চেয়েও বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, সে ব্যবস্থা করব।

 শেয়ার বিজ: তফসিলীকরণের পর প্রবাসী সেবাদানে কতটা বৈচিত্র্য আসবে?

শামসুন নাহার: তফসিলীকরণের পর বিদ্যমান সরকারি ও বেসরকারিভাবে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে প্রবাসীর প্রয়োজন অনুসারে সেবা দেওয়া হবে। বর্র্তমানে সব ব্যাংকই রেমিট্যান্স আনতে চেষ্টা করে। কিন্তু আমরা শুধু রেমিট্যান্স আনাই নয়, প্রবাসীর জীবনের মান উন্নয়নেও কাজ করব । প্রবাসীরা দেশে ফেরার পর অনেক সময় নিরাপত্তাহীনতার শিকার হয়। ফিরে এসে সঞ্চিত টাকা কাজে লাগাতে  পারে না। আমাদের গুরুত্বপূর্ণ ভিশন হচ্ছে দেশে ফেরার পর প্রবাসীদের আর্থিক উন্নয়নের সুযোগ করে দেওয়া। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অনেক বছর ধরে প্রবাসীরা আত্মীয়স্বজনের নামে দেশে টাকা পাঠিয়েছে, কিন্তু ফেরার পর দেখে স্বজনরা বিভিন্নভাবে টাকা অপচয় করে ফেলেছে। তখন সে হতাশায় পড়ে যায়। এ পরিস্থিতিতে যাতে না পড়তে হয় সেজন্য আমরা তার হিসাবের মাধ্যমে রেমিট্যান্স আহরণ করব। এরপর তার নির্দেশনা মোতাবেক কেবল প্রয়োজনীয় অর্থ নির্দেশিত ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করার সুযোগ রাখব এবং অবশিষ্ট সঞ্চিত অর্থ ব্যাংকের মাধ্যমে লাভজনক খাতে বিনিয়োগের সুযোগ করে দেব। এতে ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে প্রবাসীর টাকা সুরক্ষিত থাকবে, আবার ব্যাংকের জন্যও তা আমানতের একটা উৎস হবে।

আমাদের ফোকাস থাকবে এসএমইতে। এখনই বড় ঋণে যাব না। বিদেশে কখনও না কখনও গেছে শুধু এমন প্রত্যাগত বাংলাদেশি নাগরিকই ঋণ সুবিধা পাবে। প্রত্যাগতদের এসএমইতে বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক পরিকল্পনায় সহায়তাদানের জন্য অভিজ্ঞ পরামর্শক নিয়োগ করা হবে। বর্তমানে আমাদের ৫৪টা শাখা আছে। তফসিলীকরণের পর পর্যায়ক্রমে শাখার সংখ্যা বাড়ানো হবে।

শেয়ার বিজ: ব্যাংকটি এখন দক্ষ জনবলে কতটা স্বয়ংসম্পূর্ণ?

শামসুন নাহার: প্রথমত, জনবলের বিরাট ঘাটতি রয়েছে। দ্বিতীয়ত, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ জনবলের সংকট আছে। তফসিলীকরণের পর সরকারের সহায়তায় বিভিন্ন ব্যাংক থেকে অভিজ্ঞ কর্মকর্তা প্রেষণে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে আমাদের নিজস্ব কর্মীরাও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ পাবেন। ফলে ব্যাংকের কার্যক্রমের প্রসার ঘটবে দ্রুত।

শেয়ার বিজ: দুর্নীতি ঋণ কেলেঙ্কারির কারণে সরকারি ব্যাংকগুলো চরম নিন্দার সম্মুখীন হচ্ছে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক ধরনের কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়বে না, ব্যাপারে কতটা আত্মবিশ্বাসী?

 

শামসুন নাহার: এ বিষয়ে আমরা খুবই সচেতন। যেহেতু ব্যাংক খাতের প্রশ্নবিদ্ধ এ সময়ে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক তফসিলি হতে চলেছে, তাই পুরো পর্ষদই সতর্ক। বর্তমানে বড় আকারের ঋণদানের পরিকল্পনা নেই। আমরা শতভাগ আত্মবিশ্বাসী যে নিয়মাচারের মধ্য দিয়েই ব্যাংকের কার্যকলাপ সম্পাদন করতে পারব। এজন্যই সীমিত আকারে কর্মকাণ্ড শুরু করে ধীরে ধীরে ভিত্তি তৈরির মাধ্যমে এগোচ্ছি।

 শেয়ার বিজ: আপনার পেশাজীবন সম্পর্কে বলবেন কি?

 শামসুন নাহার: ১৯৮৬ সালের জানুয়ারিতে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে যোগদান করি। মাঠ প্রশাসনে মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ ও গাজীপুরে কাজ করেছি। মহিলাবিষয়ক অধিদফতরে সহকারী পরিচালক হিসেবে, এরপর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে সহকারী সচিব হিসেবে কাজ করেছি। এখানে সিনিয়র সহকারী সচিব ও উপসচিব পদে তিন মেয়াদে ৯ বছর কাজ করেছি। ‘মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল’ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সূচকে মা ও শিশুমৃত্যুর হার বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় কমিয়ে আনার জন্য প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের পুরস্কার পেয়েছিলেন। সে সময় আমি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ছিলাম। এজন্য গর্ববোধ করি যে ওখানে আমার কিছু হলেও অবদান আছে। ২০০৮-০৯ সালে কাজ করি ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের পরিচালক (ডাক) হিসেবে। এখন ইউনিয়ন পর্যায়ে ডাক বিভাগের কেন্দ্রগুলোকে টাকা পাঠানোসহ বিভিন্ন আইটি সেবাদানে কাজে লাগানো হচ্ছে। এ কাজের পরিকল্পনা করা হয়েছিল আমি কর্মরত থাকা অবস্থায়, ‘এ টু আই’ প্রকল্পের আওতায়। ব্রিটিশ আমল থেকে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে ছড়ানো ডাকবিভাগের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। ডাকবিভাগের জায়গা, ভবন ও জনবল কাজে লাগিয়ে আমরা কীভাবে আইটি সেবা বা বিভিন্ন আধুনিক সেবা দিতে পারি, সে চিন্তাভাবনা তখনই হয়েছিল। এসব কার্যক্রমের মধ্যেও আমি ছিলাম বলে গর্ববোধ করি। এরপর ২০০৯ সালের শেষে এলাম প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে। এখানে ৯ বছর কাজ করে সবশেষে সচিব পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেছি।

শেয়ার বিজ: ধন্যবাদ আপনাকে

 শামসুন নাহার: ধন্যবাদ।