শুল্ক ফাঁকি রোধে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ববোধ জরুরি

দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে পণ্য আমদানির ঘটনা বেড়েই চলেছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা দুর্নীতিবাজ কাস্টম কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়ে এসব পণ্য নিয়ে আসছে দেশে। আর শুল্ক ফাঁকিতে প্রতিবছর রাষ্ট্র বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে। এ নিয়ে সৃষ্ট মামলায়ও রাষ্ট্রের অর্থ কম ব্যয় হচ্ছে না।
চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টম হাউসের অসাধু কর্মকর্তাদের ঘুষ-বাণিজ্যে প্রতিবছরই আমদানিকারকরা সরকারের প্রাপ্য হাজার হাজার কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকি দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে। এসব দেখেও না দেখার ভান করছে কর্তৃপক্ষ। সব ঘটনা চেপে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না অবশ্য। এ নিয়ে মামলাও হচ্ছে। গতকাল শেয়ার বিজে প্রকাশিত ‘চট্টগ্রাম কাস্টমসে ২০ বছরে ১৪ হাজার মামলা’ শীর্ষক প্রতিবেদন শুল্ক ফাঁকির ব্যাপকতাই তুলে ধরে।
আমাদের প্রতিবেদক জানান, ঘোষণা-বহির্ভূত ও অতিরিক্ত পণ্য আমদানি এবং অধিক শুল্কযুক্ত পণ্য মিথ্যা ঘোষণায় কম শুল্কে আমদানির পাশাপাশি ব্যাংক ও আমদানি নথি জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া গেলে আমদানিকারকের বিরুদ্ধে মামলা করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। ভুল অ্যাসেসমেন্টের ফলে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়কে চ্যালেঞ্জ করে কাস্টমসের বিরুদ্ধেও মামলা করে আমদানিকারক। এভাবে গত ২০ বছরে চট্টগ্রাম কাস্টমসে মামলা হয়েছে ১৪ হাজারের বেশি।
সাধারণত পণ্যমূল্যে ফাঁকি (মূল্য কম-বেশি দেখানো), পণ্যের মান নিয়ে জালিয়াতি, পরিমাণ ও ওজনে কম এবং পণ্যের এইচএস কোড জালিয়াতির মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকি চলছে। আমদানি করা চালান সাধারণত চট্টগ্রাম কাস্টমসের নির্ধারিত শাখায় শুল্কায়ন হয়। এসব শাখায় দায়িত্বরত কর্মকর্তারা পণ্যের নথি বিশ্লেষণ করে শুল্কায়ন করেন। মিথ্যা ঘোষণা ও ভুল এইচএস কোড ব্যবহারপূর্বক রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগেও মামলা করে কাস্টমস। এরপর সঠিক এইচএস কোডে শুল্ক-কর আদায় করে কাস্টমস। আবার আমদানিকারক যদি মনে করেন, তার ঘোষিত কোড সঠিক এবং কাস্টমস অতিরিক্ত শুল্ক আদায় করেছে, তখন তিনি ব্যাংক গ্যারান্টি দিয়ে পণ্য ছাড়করণের পর কাস্টমসকে চ্যালেঞ্জ করে মামলা করেন।
বিশ্বের সব বন্দরেই চালানে অনিয়ম ও বিভিন্ন জালিয়াতির মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি, ঘোষণা-বহির্ভূত ও অতিরিক্ত পণ্য আমদানি ঘটে। সেগুলো মোকাবিলা করে বন্দর কর্তৃপক্ষই যথানিয়মে রাজস্ব আহরণ কিংবা দণ্ডের অর্থ আদায় করে। মামলা পর্যন্ত কমই গড়ায়। এর আগে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির (এডিআর) মাধ্যমে যথানিয়মে রাজস্ব আদায় করতে পারেনি চট্টগ্রাম কাস্টমস। মামলার দ্রুত নিষ্পত্তিতে ২০১২ সালের ১ জুলাই দেশের সব কাস্টমস হাউজে একযোগে এডিআর চালু হয়। তবে শুরু থেকেই ব্যবসায়ীদের আগ্রহ না থাকায় এর মাধ্যমে মামলার খালাস নিষ্পত্তির হার কম ছিল।
আমদানি-পণ্য ছাড়ে বন্দরের সংশ্লিষ্ট ডেস্ক এবং কাস্টম হাউসের সব শাখা, ভ্যাট, শুল্ক গোয়েন্দা ও বন্ড শাখা সমন্বিতভাবে তৎপরতা চালালে শুল্ক ফাঁকি কিংবা এইচএস কোড জালিয়াতি এমনিতেই কমে আসবে। আমদানিকৃত সব ধরনের চালানে রাজস্ব ফাঁকি রোধে গোয়েন্দা তদারকির দায়িত্ব পালনকারী অডিট ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড রিসার্চে (এআইআর) পর্যাপ্ত লোকবল ও লজিস্টিক সাপোর্ট নিশ্চিত করতে হবে।
২০১৩ সালের ১ জুলাই পাইলট প্রকল্প হিসেবে চট্টগ্রাম কাস্টমসে শুল্ক প্রশাসনের পূর্ণাঙ্গ অটোমেশনে স্থাপিত হয় ‘অটোমেটেড সিস্টেম ফর কাস্টমস ডেটা ডেভেলপমেন্ট (অ্যাসাইকুডা) ওয়ার্ল্ড সফটওয়্যার। সে সময় বলা হয়েছিল, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির পাশাপাশি কম সময়ে পণ্য খালাস সম্পন্ন করবে অ্যাসাইকুডা। এর মাধ্যমে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, সব শুল্ক স্টেশন, শুল্ক কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত হবে। এছাড়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে শুল্কায়ন সম্পন্ন, আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে বিল অব এন্ট্রি, সত্য ঘোষণা, শুল্কায়ন ও নির্ধারিত শুল্ক পরিশোধসহ সবই অনলাইনে করা যাবে। অ্যাসাইকুডা সফওয়্যারের মাধ্যমে বাংলাদেশ কাস্টমস সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন যুগে পদার্পণ করবে। দ্রুত পণ্য খালাস, স্বচ্ছতা ও রাজস্ব আহরণ নিশ্চিত করবে। এর মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি ও হয়রানি বন্ধ হবে, এমনটাও বলেছিল এনবিআর। কিন্তু কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত সেই অ্যাসাইকুডা কোন পর্যায়ে আছে, আদৌ কর্মক্ষম আছে কি না, সে প্রশ্নও উঠতে পারে। তবে আধুনিক যন্ত্র নয়; বন্দর ও কাস্টমসের সংশ্লিষ্ট কর্মীদের দায়িত্ববোধই শুল্ক ফাঁকি রোধে অধিক কার্যকর বলে আমরা বিশ্বাস করি।