হোম মতামত-বিশ্লেষণ শেয়ারবাজারে এই উল্লম্ফনের কারণ আসলে কী

শেয়ারবাজারে এই উল্লম্ফনের কারণ আসলে কী


Warning: date() expects parameter 2 to be long, string given in /home/sharebiz/public_html/wp-content/themes/Newsmag/includes/wp_booster/td_module_single_base.php on line 290

শেয়ারের দাম, আমানতের ওপর সুদ ও নতুন ব্যবসা (স্টার্টআপ) এ তিনটি খবর একসঙ্গে করে পড়লে কী দাঁড়ায়? ‘কী দাঁড়ায়’, তা বিবেচনা করার আগে জানা দরকার খবর তিনটি কী। সংক্ষেপে খবর তিনটির মধ্যে শেয়ারের দামের ওপর খবরটি দিয়েছে শেয়ার বিজ। শিরোনাম হচ্ছে: ‘শেয়ারের অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধির হিড়িক’। খবরে বলা হয়েছে, এক মাসে ২৪টি কোম্পানির শেয়ারের দর বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে। এসব অবস্থায় কোম্পানিগুলোকে কারণ দর্শাও নোটিশ দেয় নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ যথা ঢাকা স্টক একচেঞ্জ ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড একচেঞ্জ কমিশন। সংশ্লিষ্ট খবরটিতে বলা হয়েছে, শোকজ নোটিশের জবাব হচ্ছে গৎবাঁধা। যে ২৪টি কোম্পানির শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, তার একটি তালিকাও শেয়ার বিজ ছেপেছে। দেখা যাচ্ছে, এ তালিকায় অনেক ধরনের কোম্পানির সঙ্গে তিনটি ব্যাংক আছে। বলা বাহুল্য, অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির খবর শুধু শেয়ার বিজের নয়। প্রায়ই অনেক সংবাদপত্রে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির খবর থাকে। এসব কোম্পানির মধ্যে ‘বাজে’ কোম্পানিও থাকেÑযারা লভ্যাংশ দেয় না, বার্ষিক সাধারণ সভা করে না, যেখানে উদ্যোক্তা-মালিকদের শেয়ার প্রায় নেই, যাদের ব্যালান্স শিট এককথায় দুই নম্বরী। এমন সব কোম্পানির শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধির খবর বস্তুত প্রায়ই ছাপা হচ্ছে, অথচ কিছুদিন আগেও এ ঘটনা ছিল না। হঠাৎ এমন কী ঘটল যে, বাজারে এত গরম হয়ে গেল? এমন গরম হলো যে, একশ্রেণির শেয়ার ক্রেতা (বিনিয়োগকারী!) ও শেয়ার ব্যবসায়ী ভালো নেই, মন্দ নেই সব কোম্পানির শেয়ার ক্রয়ে উৎসাহী হয়ে উঠল আর বাজারের সূচক দমাদম বাড়ছে?

লেনদেনের পরিমাণ বাড়ছে।

বছর দেড়-দুই আগেও বাতি দিয়েও মার্চেন্ট ব্যাংক কোম্পানিগুলো কোনো শেয়ার ক্রেতা-বিক্রেতা পেত না। এই দেড়-দুই বছরে কী ঘটেছে? বাজারে নতুন ভালো ভালো শেয়ার এসেছে? লিক্যুইডিটি প্রচুর বেড়েছে? ব্যাংকগুলো শেয়ার কিনতে শুরু করেছে? বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শত শত ডলার নিয়ে নেমে পড়েছেন? প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা নেমে পড়েছে? নাকি ‘গ্যাম্বলাররা’ আবার মাঠে? কোন কারণটি বাজারের বর্তমান উত্থানের জন্য দায়ী? হয়তো অনেক কারণ দায়ী। কিন্তু একটি কারণ দৃশ্যত বেশ বড়। তা হচ্ছে আমানতের বাজারÑ‘ডিপোজিট মার্কেট’। আমাদের ব্যাংক খাত আমানতকারীদের ওপর রীতিমতো অত্যাচার শুরু করেছে। একটা দাবি ছিল ব্যবসায়ীদের, শিল্পপতিদের। ঋণের সুদের হার কমাতে হবে, সিঙ্গেল ডিজিট বা এক অঙ্কে নামাতে হবে। তাদের ব্যবসা করতে অসুবিধা হচ্ছে। প্রতিযোগিতায় তারা মার খাচ্ছে। কৃষকরা ১২-১৫-২০ শতাংশ হারে ঋণ নেয়। তারা মার খায় না। কিন্তু ব্যবসায়ীরা মার খাচ্ছে বলে চারদিকে হইচই। সরকারও তাদের দাবির সঙ্গে একমত। ব্যাংকাররা সুযোগ বুঝে কী করল? ঋণের ওপর সুদ কমাল এক শতাংশ। বিপরীতে আমানতকারীর আমানতের ওপর সুদ কমাল কতÑদুই শতাংশ, আড়াই শতাংশ। তারা শ্রেণিবিন্যাসিত ঋণ হ্রাস করতে পারল না, প্রশাসনিক ব্যয় কমাতে পারল না। পারল কী? পারল আমানতের ওপর সুদ কমাতে। আর মানুষের চাকরি খেতে। আমানতকারীরা হতবাক। উপায়? দেখা গেল মানুষ ব্যাংক থেকে মুখ ফেরাচ্ছে। ২০১৭ সালের মে মাসে আমানত বাড়ল ১১ দশমিক ২১ শতাংশ। অথচ ২০১৬ সালে বেড়েছিল ১৩ দশমিক ১২ শতাংশ। বিপরীতে ঋণের প্রবাহ বাড়ল বেশি করে। ব্যাংকের অতিরিক্ত তারল্য কিছুটা কমতে শুরু করল। এদিকে মানুষের সঞ্চয়ের মাধ্যম সঞ্চয়পত্রের ওপর ধমকÑমন্ত্রীর ধমক, কর্মচারীর ধমক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল কর্মচারীদের ধমক। সুদের হার কমাতে হবে। মূল্যস্ফীতি বেশি, আমানতের সুদের হার থেকেও বেশি। মানুষ যাবে কোথায়? সঞ্চয়কারীদের বাঁচতে হবে। সরকার তার আয় বাড়িয়ে দেবে না। কাঁচাবাজার তাকেই করতে হবে। চাল তাকেই কিনতে হবে। চিকিৎসার টাকা তাকেই জোগাতে হবে। চোখে-মুখে অন্ধকার। ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় কিছু লোক আবার শেয়ারবাজারে যেতে শুরু করেছে। এতে বাজারে লিক্যুইডিটি বেশ বেড়েছে। কপাল ভালো, ব্যাংক এখন আর বস্তা বস্তা টাকা নিয়ে শেয়ারবাজারে যেতে পারে না। ব্যাংকের জন্য শেয়ার ব্যবসা নিয়ন্ত্রিত। ব্যাংক শেয়ার ব্যবসা করে নিজস্ব মার্চেন্ট ব্যাংক দিয়ে, যা আলাদা কোম্পানি। এখন ব্যাংকের আমানত নয়, পুঁজির ১০ শতাংশের বেশি শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের সুযোগ নেই। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের বোকারা তখন নিয়ম করেছিলÑআমানতের ১০ শতাংশ। ফল যা হওয়ার তাই হয়। আমার ধারণা, সঞ্চয়পত্রের বাজারে কড়াকড়ি, আমানতের ওপর সুদ হ্রাস ইত্যাদি কারণে শেয়ারবাজারে একটা উল্লম্ফল দেখা দিয়েছে। মধ্যবিত্ত আবার শেয়ার সম্পর্কে কথা বলতে শুরু করেছে। এমন নয় যে, বাজারে নতুন নতুন কোম্পানির শেয়ার আসছে খুব। কই নতুন কোম্পানির শেয়ার? এ অবস্থাতেই শেয়ারের ওপর চাপ বেড়েছে। বিদেশি ‘পোর্টফোলিও ইনভেস্টমেন্ট’ কিছু আসছে, কিন্তু তা মারাত্মক কিছু নয়। আমার ধারণা, এসব কারণেই শেয়ারবাজার উঠছে। এছাড়া কী কারণ আছে ‘জাঙ্ক’ কোম্পানির শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধির? কী কারণ আছে দুই নম্বর পারফরম্যান্সকারী ব্যাংকের শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধির? মিডিয়ায় সারা বছর ব্যাংক খাতের ওপর নেতিবাচক খবর ছাপা হচ্ছে। মূলধন কম, বেসরকারি ব্যাংকেও খেলাপি ঋণ বাড়ছে, অদক্ষতা বাড়ছে, মালিকানায় দ্বন্দ্ব রয়েছে। নানা অন্যায়-অবিচারে ভরপুর বেসরকারি খাত। সবচেয়ে বড় বেসরকারি ব্যাংকের মালিকানা কীভাবে পরিবর্তন হলো, কেউ জানে না। শেয়ারহোল্ডারাও জানে না। এমন সব নেতিবাচক খবরের পরও কীভাবে মানুষ ব্যাংকের শেয়ার কেনে? কীভাবে ব্যাংকের শেয়ারের দামের ওপর একটা শেয়ারবাজার টিকে থাকে? বস্তুত এসব খুবই ভাবার বিষয়, ভাবার বিষয় ভবিষ্যতের জন্য। কারণ আমরা চাই ভালো একটি শেয়ারবাজার, যেখান থেকে শিল্পপতিরা সবটা না হোকÑকিছুটা পুঁজি সংগ্রহ করবেন। কিন্তু তা হচ্ছে কই? ব্যবসায়ীরা আগের মতোই ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল পুঁজির জন্য। ‘ব্যাংক লেড গ্রোথ’। ভারত-চীন ইত্যাদি দেশের মতো। জাপানও তাই করেছে। কোরিয়ানরাও তাই। শিল্পের টাকা জোগাবে ব্যাংক। এর জন্য লাগে সঞ্চয়। সঞ্চয় করবে দেশের মানুষ। সঞ্চয় যাবে ব্যাংকে, সঞ্চয় যাবে শেয়ারবাজারে। কিন্তু আমেরিকা ভিন্ন দেশ। যেখানে নাগরিকরা সঞ্চয় করে না। তারা করে ঋণ। ঋণের মধ্যে জš§, ঋণে সংসার চালনা, ঋণ নিয়ে মৃত্যু। কিন্তু বাংলাদেশ তা নয়। সঞ্চয় বাঙালির প্রাণ। নারীরা তা করে। বিপদে সরকার নয়, সঞ্চয় কাজে লাগে। সোনা-দানা, জমি, আমানত, সঞ্চয়পত্রে জমানো টাকা তার বিপদের সাথি। এ সঞ্চয় বৃদ্ধিতে সরকার উৎসাহ দিচ্ছে কম। উল্টোপথে যাত্রা। সঞ্চয় বৃদ্ধির অবস্থা খারাপ। এটা স্থবির। অথচ সঞ্চয় বৃদ্ধি পেলে আমানত বাড়ত, সঞ্চয়পত্র বিক্রি আরও বাড়ত। বাজারে টাকা থাকত। টাকার টানাটানিতে ভুগতে হতো না।

আমার মনে হয়, আরেকটা কারণ বর্তমান অবস্থার জন্য দায়ী। দেশে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। আমরা জানি, জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার নির্ণয়ে গত কয়েক বছরে কমপক্ষে দু-দুবার ‘মেথডোলজি’ পরিবর্তন করা হয়েছে। এত প্রবৃদ্ধির হার বেড়েছে নিঃসন্দেহে বেশ কিছুটা। তারপরও প্রবৃদ্ধির হার ভালো। কিন্তু প্রবৃদ্ধি দিয়ে কী করবÑযদি কর্মসংস্থানের সুযোগ না বাড়ে? কর্মসংস্থান বাড়াবে কৃষি খাত, ক্ষুদ্র শিল্প, কুটির ও মাঝারি শিল্প। বিশ-ত্রিশ হাজার কোটি টাকার ওভারব্রিজ, নদীসেতু ইত্যাদি কর্মসংস্থান বাড়াবে না। পোশাকশিল্পও এখন তা করে না। আবার আইটি, ওষুধ, সার-কারখান, বিদ্যুৎ কারখানা ইত্যাদি অনেক শিল্পই স্বয়ংক্রিয়। ব্যাংক-বিমায় মানুষের ঠাঁই হচ্ছে না। সেখানে নিচের স্তরে চলছে ‘আউটসোর্সিং’। চাকরি না দিয়ে বাইরে থেকে লোক কম দামে ভাড়া করা। চাকরি দিলে বেশি খরচ। বেশি ও কম খরচের চিন্তায় মালিক অর্থাৎ কার্ল মার্কসের ক্যাপিটালের মালিকরা যাচ্ছে যন্ত্রের দিকে। সারা বিশ্বেই তাই। শ্রমিক নয়, টেকনোলজিই বড় কথা। মানুষ (শ্রমিক) আর যন্ত্রের যুদ্ধ। নতুন পৃথিবী। কী করণীয়? বলা হচ্ছে, যুবকরা উদ্ভাবনী শক্তি দেখাবে, সৃজনশীলতা দেখাবে। তারা ব্যবসায়, নতুন নতুন উদ্যোগে জড়িয়ে পড়বে। হাজার রকমের ব্যবসা। ঘরে বসে ব্যবসা। অনলাইনে ব্যবসা। গরুর ব্যবসাও অনলাইনে। এ এক নতুন জগৎ। বলা হচ্ছে স্টার্টআপের কথা। প্রথম প্রথম আমি এ শব্দে আহম্মক হয়ে যাই। এজিএম নয়Ñএভিপি, ফ্লোর নয়Ñলেভেল, রিকশাওয়ালা চাচা নয় মামা, টয়লেট নয়Ñওয়াশরুম ইত্যাদি শব্দ পরিবর্তনে আমার গণ্ডগোল লেগে যায়। সাধের আমেরিকা! তারা সফল দেশ। অতএব তারা যে শব্দ ব্যবহার করে, সেটাই যোগ্য। আগে যেমন ছিল ব্রিটিশরা। অবিভক্ত ভারতকে শোষণ করে, সেই দেশে প্রায় বছর বছর দুর্ভিক্ষ ঘটিয়ে, সেই দেশের তাঁতিকে ‘জোলা’ বানিয়ে তারা হয় বিশ্বের এক নম্বর অর্থনীতি। সেই সময় আর নেই। এখন বলা হচ্ছে, নতুন ব্যবসা হচ্ছে স্টার্টআপ। কী সুন্দর শব্দ! কিন্তু কাজে? আগে রাজধানীর শান্তিনগর এলাকায় বিশ, ত্রিশ, চল্লিশ হাজার টাকায় দোকানদারি করা যেত। অল্প পুঁজিতে ব্যবসা করা যেত। অনেকে শুরুও করেছেন এভাবে। ধার নিয়েÑতাও অল্প টাকা। আজ কি তা সম্ভব? একটি সংবাদপত্রে দেখলাম, প্রতি বর্গফুট জায়গার দাম শান্তিনগরে ৫০ হাজার টাকা। জিগাতলা, খিলগাঁও, গুলশান, বনানী, বারিধারা (ডিওএইচএস) এবং চট্টগ্রামের বন্দরটিলায় প্রতি বর্গফুট জায়গার দাম ২৫ থেকে ৬০ হাজার টাকা। মাসিক ভাড়া অসম্ভব উঁচুতে। ছয় মাস, এক বছরের অগ্রিম দিতে হয়। এ টাকা দিয়ে কে স্টার্টআপ করবে? নতুন ব্যবসা করবে? শুরু যদি করতে হয় এক কোটি, দুই কোটি টাকা দিয়ে, তাহলে এই পুঁজি সরবরাহ করবে কে? ব্যাংক? প্রশ্নই উঠে না। নতুন ব্যবসায়ীর কোলেটারেল কোথায়? আরও অনেক কথা। কথা না বাড়িয়ে বলতে চাই, এ কারণেও অনেক তরুণ কিছু টাকা সংগ্রহ করেই শেয়ারবাজারে যাচ্ছে। তার উপায় কী? কী করবে সে? চাকরি নেই, ব্যবসার সুযোগ নেই। সে কী করবে? গরিবের ব্যবসা শেয়ারের ব্যবসা। তাই নয় কি?

 

অর্থনীতি বিষয়ের কলাম লেখক

সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়