শেয়ারে বিনিয়োগে কোম্পানির মৌলভিত্তি বিবেচনায় নিন

আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হলেও দরবৃদ্ধিতে এগিয়ে থাকছে তালিকাভুক্ত বেশ কিছু কোম্পানি। এমন পরিস্থিতি শুধু বিনিয়োগকারী নয়, খোদ বাজারের জন্যও উদ্বেগের। গতকালের শেয়ার বিজে এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ঠিক কী কারণে এসব কোম্পানির শেয়ারদর বাড়ছে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ বা বাজারসংশ্লিষ্ট কেউই তা স্পষ্ট করতে পারেননি। নিয়ন্ত্রক সংস্থা এ ব্যাপারে কারণ দর্শাও নোটিস দিলেও সঠিকভাবে কিছু জানাতে পারেনি প্রতিষ্ঠানগুলো। এ থেকে বোঝা যায়, বিনিয়োগকারীরা বুঝেশুনে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না। তারা প্রভাবিত হচ্ছেন অন্যের কথায় বা হুজুগে। বস্তুত পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীর থাকা উচিত এসব থেকে যথাসম্ভব দূরে। আমরা মনে করি, এ অবস্থায় নিয়ন্ত্রক সংস্থাকেই থাকতে হবে সবচেয়ে বেশি সতর্ক। দুর্বল কোম্পানির শেয়ারদর অস্বাভাবিকভাবে বাড়ার পেছনে কোনো কারসাজি হচ্ছে কি না, সে ব্যাপারেও তাদের রাখতে হবে সতর্ক দৃষ্টি।

আমাদের পুঁজিবাজারের সিংহভাগ বিনিয়োগকারীরই এ-বিষয়ক প্রয়োজনীয় তাত্ত্বিক জ্ঞান কম। এটি তাদের অনুমাননির্ভরতার অন্যতম প্রধান কারণ। একে পুঁজি করে নানা ধরনের কারসাজিও বাজারটিতে লক্ষ করা যায়। বাস্তবতা হলো, বিনিয়োগকারীর মধ্যে ক্যাপিটাল গেইনের প্রবণতা প্রবল হয়ে উঠলে এ-সংক্রান্ত তাত্ত্বিক জ্ঞানও অনেক সময় কাজে আসে না। তবে মনে রাখা দরকার, এ ধরনের সিদ্ধান্তে বিনিয়োগের ঝুঁকিও বেড়ে ওঠে। ক্যাপিটাল গেইনের আশায় ডে ট্রেডিং করে অনেক বিনিয়োগকারীর পথে বসার নজির আমাদের সামনে রয়েছে। সে পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি কারও কাম্য হওয়ার কথা নয়। আমরা চাইব ট্রেডিং নয়, বরং বিনিয়োগের ক্ষেত্র হিসেবেই পুঁজিবাজারকে গ্রহণ করবেন বিনিয়োগকারী। সেক্ষেত্রে স্বল্প মেয়াদে ক্যাপিটাল গেইনে বদলে দীর্ঘ মেয়াদে ডিভিডেন্ড গেইনে তারা যদি মনোযোগী হন, তাহলে বাজারের বিদ্যমান স্থিতিশীলতাও বিনষ্ট হবে না।

বস্তুত এমন পরিস্থিতিতে মজবুত আর্থিক ভিত্তির কোম্পানির শেয়ারদর ও চাহিদা কিছুটা কমে যায় স্বভাবতই। বিচক্ষণ বিনিয়োগকারীর উচিত হবে সেগুলো কেনা। এমন পরিস্থিতিতে হতাশ না হয়ে তারা যদি এটিকে বরং সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন, তাহলে তাদের বিনিয়োগের ঝুঁকি যেমন কমবে; একইসঙ্গে বাড়বে মুনাফা বৃদ্ধির সম্ভাবনা। আমরা চাইব, এ পরিস্থিতিতে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের এই স্বাভাবিক সূত্র মনে রাখবেন বিনিয়োগকারীরা। এ ধরনের কোম্পানিতে বিনিয়োগে মানুষকে উৎসাহিত করতে এগিয়ে আসতে হবে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকেও। বিনিয়োগকারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রক সংস্থা অবশ্য সে ধরনের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। এ ধরনের উদ্যোগ আরও বাড়ানো গেলে পরিস্থিতি মোকাবিলায় তা হবে সহায়ক। স্বল্প মেয়াদে না হলেও এর সুফল পাওয়া যাবে দীর্ঘ মেয়াদে। এমন পরিস্থিতি সৃষ্টির পেছনে একশ্রেণির ব্রোকারেজ হাউজেরও দায় রয়েছে বলে মনে করেন অনেকে। তাদের যথাযথ তদারকিতে রাখা গেলে পরিস্থিতি কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে।

মনে রাখা চাই, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ অন্য যে কোনো ক্ষেত্রের তুলনায় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এজন্য এতে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিতে হয় যথেষ্ট জেনেবুঝে। অনেকে অবশ্য বলেনÑবিনিয়োগে ঝুঁকি যত বেশি হয়, মুনাফাও তত বাড়ে। তবে ঝুঁকি গ্রহণের ক্ষেত্রে থাকা উচিত বাস্তবতাবোধ। পুঁজি হারানোর অভিঘাত যে সর্বপ্রথম বিনিয়োগকারীর ওপরই এসে পড়ে, তা তাদের ভুলে গেলে চলবে না। সর্বোপরি ঝুঁকি কমাতে এবং একই সঙ্গে বেশি মুনাফা অর্জন করতে বিনিয়োগের আগে আর্থিক ভিত্তির পাশাপাশি কোম্পানির হালনাগাদ বিষয়ে ভালো করে খোঁজ নিতে হবে বিনিয়োগকারীদের। এ-সংক্রান্ত তথ্যও অনেকটা সহজলভ্য হয়ে উঠেছে এখন। বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সংশ্লিষ্টরা মৌলভিত্তি বিশ্লেষণ ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিলে পুঁজিবাজার উন্নয়নেও তা হবে সহায়ক। আমরা দেশের উভয় পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা আশা করি। জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এর বিকাশও দেখতে চাইব সঠিক ধারায়।