শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করা উচিত

পাঠকের চিঠি

আবহমান কাল থেকেই শ্রমিক শ্রেণি কোনো না কোনো দিক থেকে শোষিত হয়ে আসছে। সভ্যতার আজকের যে নিদর্শন তা শ্রমিক শ্রেণির হাতেই গড়া। তবুও যারা গড়ছেন তারাই নিপাত যাচ্ছেন সভ্যতার আড়ালে। শ্রমিকদের শ্রম অধিকার নিয়ে কথা বলার মতো গুটিকয়েক গোষ্ঠী থাকলেও তাদের কার্যগত দিক নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
শ্রমিক নিয়োগ, শ্রমিকের মজুরি ও কাজের পরিবেশ ট্রেড ইউনিয়ন শ্রম ব্যবস্থাপনা-সম্পর্কিত আইনের আওতায় পড়ে। শ্রমিকের দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ, মাতৃত্ব সুবিধা, কোম্পানির মুনাফাতে শ্রমিকের অংশীদারিত্ব এবং এ ধরনের অন্যান্য বিষয় সামাজিক আইন ও শ্রম আইনের অন্তর্ভুক্ত। এখন দেখার বিষয় ঠিক কতটুকু কার্যকর শ্রম-সম্পর্কিত শ্রমিকবান্ধব আইন।
দেশের শ্রম আইনের মূল ভিত্তি হলো ১৮৮১ সালের ফ্যাক্টরি আইন। সময়ের পরিক্রমায় ১৯৬৫ সালে কিছু বিধান সংযোজন এবং পরিমার্জন করে আইনটির প্রয়োগ করা হয়।
এ আইনটিতে আমরা দেখতে পাই শ্রমঘণ্টার বাইরে অতিরিক্ত কাজের জন্য সাধারণ মজুরির দ্বিগুণ মজুরি প্রদানের ব্যবস্থার কথা বলা হয়। কিন্তু বর্তমানে দেশের শিল্পকারখানাগুলোয় দ্বিগুণ কেন, শ্রমঘণ্টার সমপরিমাণ মজুরিও দেওয়া হয় না।
সস্তা শ্রমিকমূল্য নির্ধারণ করে মালিক শ্রেণি শোষণ করছে শ্রমিক শ্রেণিকে। কখনও কখনও আন্দোলন দানা বাঁধতে গেলেও বিভিন্ন রাজনৈতিক কারণ ও চাকরিচ্যুতির ভয়ে তা আর সফল হয়ে উঠে না। নিভৃতে শোষিত হয় শ্রমিক শ্রেণি, যার প্রভাব অনেক সময় উৎপাদনের গুণগত মানের ওপর পড়ে।
শ্রম বিরতির ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই শ্রমিক অন্যূন এক ঘণ্টা বিশ্রামের বিরতি ছাড়া এক নাগাড়ে ছয় ঘণ্টার অধিক সময় কাজ করবে না। এই আইনের ধারাটি হয়তো শ্রমিকরাও জানে না। পোশাক শ্রমিকদের ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই, তাদের খাওয়ার সময় পর্যন্ত না দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা খাটানো হয়। সূর্যের আলোও তাদের চোখে পড়ে না, নামমাত্র চা পানের সময়ে একনাগাড়ে কাজ করতে হয়! মালিক শ্রেণির ইচ্ছা যত বেশি সম্ভব কাজ করানো! কিন্তু এতে ব্যাহত হচ্ছে শ্রমিক সুবিধা।
এ আইন অনুসারে যে কোনো ব্যবসায়িক কিংবা শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা বিনোদনমূলক প্রতিষ্ঠানের শ্রমঘণ্টা দৈনিক ৯ ঘণ্টা পর্যন্ত সীমিত রাখা হয়েছে। কিন্তু আমরা দেখতে পাই শ্রমঘণ্টার অধিক কাজ করানো হয়। শ্রমিকরা আসলে এক ধরনের জিম্মি। ন্যায্যতার হিসেবে যতটুকু তার পাওয়া এতটুকু তার না মিললেও জীবনের তাগিদে শ্রম দিয়ে যেতে হয়। স্বল্পশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত মানুষগুলো তাদের অধিকার আদায়ে খুব একটা সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে না।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে এ আইন অনুসারে ১২ বছরের কম বয়সী কোনো শিশুকে নিয়োগ করা যাবে না। কিন্তু শিল্পপ্রতিষ্ঠান কিংবা যে কোনো কিছুতে ১২ বছরেরও কম শ্রমিক বর্তমানে রয়েছে। অল্প টাকায় অধিক শ্রম সুবিধা পেতেই মালিক শ্রেণির একধরনের লোভ থাকে এ শিশু শ্রমিকদের প্রতি, কেননা শিশু শ্রমিককে অল্প বেতন-ভাতা দিয়ে সন্তুষ্ট রাখা যায়। শিশুশ্রমের ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করে মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে অভিযান তৎপরতা চালাতে হবে!
১৯৪২ সালের সাপ্তাহিক ছুটি আইনে যে কোনো দোকান, রেস্টুরেন্ট বা থিয়েটারে নিয়োজিত ব্যক্তির বেতনসহ সাপ্তাহিক এক দিন ছুটির কথা উল্লেখ আছে। কিন্তু আমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখতে পাই সাপ্তাহিক এক দিন ছুটির ক্ষেত্রে পূর্ণ বেতন না ধরে অর্ধদিবস বেতন ধরা হয়।
১৯৬৫ সালের ফ্যাক্টরি আইন মোতাবেক ফ্যাক্টরিতে নিয়োজিত কর্মচারীরা এক বছর কাজ করার পর পূর্ণবয়স্ক বেতনসহ একনাগাড়ে ১০ দিন এবং শিশুরা ১৪ দিন ছুটি পাবে, কিন্তু এই ছুটির ক্ষেত্রেও শোষিত হতে দেখা যায় শ্রমিকদের।
শ্রমিকদের চাওয়াকে পাওয়াতে রূপান্তর করতে হবে। শ্রমিকরা যা চায় সে অনুযায়ী তাদের প্রয়োজন মেটাতে হবে। মালিক পক্ষের কাজ আদায় করে নিতে হলে শ্রমিকদেরও সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে, না হয় কাজের প্রতি অনীহা সৃষ্টি হয়ে উৎপাদন কিংবা কল্যাণমূলক কাজের তৎপরতা ব্যাহত হবে। যেমন ইনপুট তেমন আউট পুট।
১৯৬৫ সালের শ্রমিক নিয়োগের স্থায়ী আদেশ আইনের এক বিধান অনুসারে শ্রমিকদের অভিযোগ করার সুযোগ রয়েছে। এই বিধানমতে, কোনো নিয়োগ বা কাজের শর্ত ও পরিবেশ বিষয়ে বা যেসব ক্ষেত্রে নিয়ম ভাঙার অভিযোগ আছে, তা উত্থাপন করার সুযোগ শ্রমিকের রয়েছে। এ আইনের আওতায় পড়ে বেআইনি বরখাস্তকরণ, অব্যাহতি দান, ছাঁটাই, চাকরিচ্যুত করা, অপসারণ ও উপযুক্ত আইনের আওতাভুক্ত যে কোনো অধিকার লঙ্ঘন। এ আইনটির উপযুক্ত প্রয়োগ ঘটলে দুঃখ ঘুচবে শ্রমিক শ্রেণির।
কারখানা কিংবা যেকোনো শ্রমমূলক স্থানে শ্রমিকদের এ আইন সম্পর্কে জানাতে হবে। নোটিস বোর্ড দিয়ে তাদের সুযোগ ও সমস্যামূলক আইনগুলো অথবা তারা কোন কারণে কোথায় অভিযোগ করতে পারবে, এ ব্যাপারে জানাতে পারলে তারা নিজেদের আদায় বুঝে নিতে পারবে এবং আইনের সঠিক ব্যবহার হবে।
উন্নয়নের ধারা বজায় রাখতে হলে সবার আগে এই শ্রম অধিকার আইন নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্র যদি এই দিকটিতে নজর দেয়, তাহলে সমৃদ্ধিশালী হবে দেশ।

সোহাগ মণি
শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়