শ্রমিক সেজে মুনাফার অংশ নিচ্ছেন তিতাস কর্মকর্তারা

পলাশ শরিফ: বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের কোম্পানি তিতাস গ্যাস। কোম্পানিটিতে কর্মরত দুই হাজারের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী সরকারি জাতীয় বেতন কাঠামো অনুযায়ী বেতন-ভাতা পান। অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী কোম্পানিটিতে কোনো শ্রমিক নেই। বাস্তবে শ্রমিক না থাকলেও তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই ‘শ্রমিক’ সেজে প্রতি বছর মুনাফার অংশ নিচ্ছেন। আইনের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে আট বছরে ৪৫৫ কোটি টাকার বেশি নিয়েছেন তারা। এ বিষয়ে সরকারি নিরীক্ষা দফতরও আপত্তি জানিয়েছে। তারপরও শ্রমিক সেজে মুনাফার অংশ নেওয়া বন্ধ হচ্ছে না।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, পেট্রোবাংলার অধীন রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি তিতাস গ্যাস কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা দুই হাজার ২৫২ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে কর্মকর্তা ৯৮৭ ও কর্মচারী এক হাজার ২৬৫ জন। এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর সবাই জাতীয় বেতন কাঠামো অনুযায়ী বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। সেখানে মজুরি কমিশনের অধীনে মজুরির ভিত্তিতে কোনো শ্রমিক নেই। তাই বিদ্যমান আইন অনুযায়ী তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মুনাফার অংশ পাবেন না।
তবে আইনে না থাকলেও কোম্পানির মুনাফার অংশ দিতে শ্রমিক অংশগ্রহণমূলক তহবিল গঠন করেছে তিতাস গ্যাস। প্রতি বছর ওই তহবিলে মুনাফার পাঁচ শতাংশ হারে অর্থ জমা দেওয়া হচ্ছে। বাস্তবে শ্রমিক না থাকায় তিতাসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই শ্রমিক সেজে ওই তহবিলের অর্থ নিচ্ছেন। ২০১০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত আট বছরে প্রায় ৪৫৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৩-১৪ আর্থিক বছরে সবচেয়ে বেশি (প্রায় ৭২ কোটি ৬২ লাখ টাকা) দেওয়া হয়েছে।
চলতি দায়িত্বে থাকা তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মীর মসিউর রহমান শেয়ার বিজকে এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘সরকারি কিছু কোম্পানির ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ছাড়া সবাইকে শ্রমিক হিসেবে গণ্য করা হয়। তাই তারা কোম্পানির মুনাফার অংশও নিতে পারেন। অডিট দফতর আপত্তি দিয়েছে। আমরা তার জবাবও দিয়েছি। এখানে কোনো বিতর্ক নেই।’
যদিও বিদ্যমান কোম্পানি আইন অনুযায়ী কোনো কোম্পানির প্রশাসনিক বা ব্যবস্থাপনামূলক কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তিকে শ্রমিক হিসেবে গণ্য করার সুযোগ নেই। যে কারণে ২০১৩ সালে সরকারি হিসাব-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি ভবিষ্যতে কোম্পানির সব ব্যয় বাদ দিয়ে নিট মুনাফা হিসাব করে মুনাফায় শ্রমিকের অংশগ্রহণমূলক তহবিলে জমাকৃত অতিরিক্ত অর্থ অবলোপনের নির্দেশ দিয়েছে। তারপরও ওই তহবিল অবলুপ্ত করা হয়নি। মুনাফা কমলেও সর্বশেষ সমাপ্ত আর্থিক বছরে ৩৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকা মুনাফার অংশ হিসেবে ওই তহবিলে দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ২০১৩ সালে বাণিজ্যিক অডিট অধিদফতরের নিরীক্ষায় আইন ভেঙে তিতাস গ্যাসের মুনাফায় শ্রমিকের অংশগ্রহণমূলক তহবিল গঠন ও জাতীয় বেতন কাঠামোভুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেই মুনাফার অংশ বণ্টনের ঘটনা ধরা পড়ে। ২০১১-১২ সালের আর্থিক তথ্য নিরীক্ষা শেষে সরকারের অনুমতি ছাড়া এবং আইনের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে মুনাফার অংশ বণ্টন করায় ওই বছর প্রায় ৬০ কোটি টাকা রাষ্ট্রের ক্ষতি হয়েছে বলে সরকারি নিরীক্ষায় উঠে আসে।
বাণিজ্যিক অডিট দফতরের তথ্যমতে, গ্যাস উৎপাদন ও বিতরণ-সংক্রান্ত কোম্পানির কাজের প্রকৃতি অনুযায়ী শ্রম আইনে সংজ্ঞায়িত কোনো শ্রমিক নিয়োগের প্রয়োজন পড়ে না। তাই সেখানে জাতীয় মজুরি কমিশনের আওতায় মঞ্জুরিভুক্ত কোনো শ্রমিক কর্মরত নেই। বরং ওই কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সরকারি জাতীয় বেতন কাঠামো অনুযায়ী বেতন-ভাতা পান। তারপরও আইনের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে কোম্পানির নিজস্ব সিদ্ধান্তে নিয়মবহির্ভূতভাবে তহবিল গঠন করে জাতীয় বেতন কাঠামোভুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেই অনিয়মিতভাবে মুনাফার অংশ বণ্টন করা হয়েছে। এ বিষয়ে তিতাস গ্যাসের দেওয়া ব্যাখ্যাও আমলে নেয়নি নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠানটি। পরবর্তীকালে ওই তহবিল বিলুপ্ত ও বণ্টন করা অর্থ ফেরতের সুপারিশও করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০০৮ সালে তালিকাভুক্ত রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি তিতাসের পরিশোধিত মূলধন ৯৮৯ কোটি ২২ লাখ টাকা। কোম্পানিটির মোট ৯৮৯ কোটি ২২ লাখ ১৮ হাজার ৮৩১টি শেয়ারের মধ্যে সরকারের হাতেই ৭৫ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। বাকি ২৫ শতাংশের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর হাতে ১৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ, বিদেশি বিনিয়োগকারীর হাতে এক দশমিক ৭৮ শতাংশ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীর হাতে ৯ দশমিক ২৪ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।