শ্রম আইনের বাইরে থাকবেন ব্যাংকাররা?

‘শ্রম আইনের আওতার বাইরে থাকতে চান ব্যাংকাররা’ শিরোনামে যে খবর ছাপা হয়েছে গতকালের শেয়ার বিজে, তা এরই মধ্যে অনেক পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকবে। বিস্তারিত খবরে আমাদের প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ব্যাংকারদের বেলায় প্রচলিত শ্রম আইন কার্যকর হওয়া উচিত নয় বলে ব্যাংকারদের এই আইনের আওতার বাইরে রাখার জন্য কয়েক মাস আগে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সচিব বরাবর চিঠি দেয় অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি)।

উল্লেখ্য, ২০০৬ সালে প্রণীত শ্রম আইন ২০১৩ সালে সংশোধিত হলেও আইনটিকে বর্তমানে কার্যকর বলা চলে। আর সেখানে ব্যাংকার, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের যে শ্রমিক হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে, সেখানেই বোধকরি এবিবি’র আপত্তি। এর পরিপ্রেক্ষিতে নিজেদের অবস্থানের পেছনে এবিবি যেসব যুক্তি তুলে ধরেছে তার ফিরিস্তি বিরাট। তাদের যুক্তি হলো, ব্যাংক খাতে খুবই যোগ্য ও প্রশিক্ষিতদের নিয়োগ দেওয়া হয় এবং তাদের কাজের ধরন কল-কারখানায় কাজ করা শ্রমিকদের কাজ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ফলে তাদের শ্রমিক হিসেবে বিবেচনা করা যুক্তিসঙ্গত হবে না। দ্বিতীয়ত. দেশের সব তফসিলি বাণিজ্যিক ব্যাংক কার্যক্রম পরিচালনা করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধানে। এ খাতে নিয়ম-শৃঙ্খলা রক্ষায় বিশেষ একটা আইনই রয়েছে ‘ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১’ নামে। এটি সম্প্রতি জাতীয় সংসদের সংশোধনী বিল পাস হয়েছে, ‘ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) আইন, ২০১৮’ হিসেবে গেজেট প্রকাশ হয়েছে। তৃতীয়ত. শ্রম আইনে ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ড নামে একটি ফান্ড গঠনের কথা রয়েছে; যা আবার ব্যাংক কোম্পানি আইনের সেকশন ১১’র একটি উপধারার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এবিবি’র কথা হলো, শ্রম আইনে শ্রমিকদের যেসব সুবিধা নিশ্চিতকরণের কথা বলা হয়েছে, সেগুলো ওটির সঙ্গে মিলবে না। আবার ব্যাংকে কর্মীর পারফরম্যান্সভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থার সংস্কৃতি বিদ্যমান, যার ভিত্তিতে সবাই সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন প্রতিষ্ঠানে ব্যক্তিগত অবদানের ভিত্তিতে। কথা হলো, এবিবি যেসব যুক্তি তুলে ধরেছে, তার কোনোটিই হেসে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। প্রশ্ন হচ্ছে, এসবের ভিত্তিতেই ব্যাংকাররা শ্রম আইনের বাইরে থাকতে পারেন কি না এবং ব্যাংকারদের জন্য পৃথক শ্রম আইন প্রণয়নের আবশ্যকতা রয়েছে কি না।

সে ক্ষেত্রে আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, বিদ্যমান শ্রম আইনে শ্রমিক হিসেবে যাদের উল্লেখ করা হয়েছে, সেই সংজ্ঞার ভিত্তি হলো অর্থশাস্ত্র। এখন জিজ্ঞাসা হলো, এবিবি যেভাবে সেই সংজ্ঞা পরিবর্তন করতে চাইছে, সেটা শাস্ত্রসম্মত কি না। আর যদি শাস্ত্রসম্মত হয়ে থাকে সে ক্ষেত্রে ব্যাংকার, সাংবাদিকদের শ্রমিকের কাতারে না ফেলে আমরা কোন ক্যাটেগরিতে তাদের অন্তর্ভুক্ত করব? খেয়াল করার মতো বিষয়, ব্যাংকাররা শ্রমিক নয় বলে এবিবি রব তুললেও এটা সর্বসম্মতিক্রমে প্রতিষ্ঠিত কোনো মত নয়। বরং শোনা যায়, বিপুলসংখ্যক ব্যাংক কর্মী রয়েছেন এর বিরুদ্ধ পক্ষে। কেননা তাদের যুক্তি হলো, পৃথক শ্রম আইন হলে হয়তো একশ্রেণির ব্যাংক কর্মী উপকৃত হবেন কিন্তু তাতে ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। অবশ্য এদের যুক্তি এখানেই শেষ নয়। তাদের আরও কথা হলো, ব্যাংকগুলো হয়তো কর্মীদের কমপেনসেশন প্যাকেজসহ নানা ধরনের সুবিধা দেয়, কিন্তু তার বদলে শ্রম অধিকারের লঙ্ঘন যে ঘটে না, এমনও তো নয়। অর্থাৎ এখানে মূল প্রশ্নটা এসে দাঁড়াচ্ছে, শ্রম অধিকারের বাস্তবায়ন ঘিরে। আর শ্রম আইন প্রণয়নের লক্ষ্যও তো তা-ই। সুতরাং দেখার বিষয় হচ্ছে, এবিবি যে ধরনের পৃথক আইন চাইছে এবং তার দ্বারা যেভাবে তারা শ্রম অধিকার বাস্তবায়ন করতে চাইছে সেটি সাধারণ শ্রম আইন দ্বারা বাস্তবায়ন অসম্ভব কি না। নাকি ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানে এমন কোনো অসাধারণ শ্রম অধিকার রয়েছে, যার বাস্তবায়ন বিশেষ আইন ছাড়া সম্ভবই হবে না।