শ্রম পরিস্থিতির উন্নতি ছাড়া মিলবে না জিএসপি প্লাস সুবিধা

এসডিজি বিষয়ে সিপিডির সংলাপে বক্তারা

নিজস্ব প্রতিবেদক: সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৪ সালে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা (এলডিসি) থেকে বের হবে বাংলাদেশ। এর ফলে ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে পণ্য রফতানিতে যে শুল্কমুক্ত (জিএসপি) সুবিধা পায় বাংলাদেশ, তা থাকবে না। এর পরবর্তী ধাপ উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় থাকা দেশগুলো জিএসপি প্লাস সুবিধা পায়। কিন্তু সে সুবিধা পেতে হলে বাংলাদেশকে বেশ কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে। এর মধ্যে প্রধানতম শর্ত হিসেবে আবির্ভূত হবে শ্রম পরিস্থিতির উন্নয়ন।
রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত সংলাপে এমন মত দেন বক্তারা। সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু। বিশেষ অতিথি ছিলেন তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক ওয়াজেদুল ইসলাম খান ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) উপপরিচালক গগন রাজভাণ্ডারী। এছাড়া বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউশন অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, বাংলাদেশে শিল্পায়নের ইতিহাস বেশি পুরোনো নয়। যে কারণে এখানে শিল্প-কারখানা প্রস্তুতের ক্ষেত্রে আমরা জার্মানি বা অন্য পশ্চিমা দেশের মতো দক্ষতা দেখাতে পারিনি। তবে গত কয়েক বছরে খুব কম সময়ের মধ্যে এ দেশে শ্রম পরিস্থিতির যে উন্নতি হয়েছে, তা অভাবনীয়। এ অগ্রগতি অব্যাহত থাকলে জিএসপি প্লাস সুবিধাপ্রাপ্তি কষ্টকর হবে না।
ট্রেড ইউনিয়নের বিষয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে সাড়ে আট হাজার ট্রেড ইউনিয়ন রয়েছে। কিন্তু শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও রক্ষায় সব ইউনিয়ন যথাযথ ভূমিকা পালন করছে না। এসব সংগঠন অডিট করলে ৭০ শতাংশেরই নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাবে। তাই কেবল ট্রেড ইউনিয়ন করলেই হবে না, সংগঠন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যও ভালোভাবে পরিপালন করতে হবে।
মূল প্রবন্ধে খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর দেশের রফতানি চাপের মুখে পড়বে। উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার পর ইউরোপের বাজারে জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়ার সুযোগ আছে। কিন্তু সেটা পেতে হলে বাংলাদেশকে আইএলওর অনেকগুলো কনভেনশন পূরণ করতে হবে। এসবের মধ্যে রয়েছে কর্মপরিবেশের উন্নয়ন, আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, অবসর-উত্তর সুবিধা প্রভৃতি। আর টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টগুলো অর্জন করে ধীরে ধীরে উন্নত দেশের কাতারে উন্নীত হতে হলে শ্রম পরিস্থিতির উন্নতি ঘটিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। যেখানে সবাই অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে।
সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে গৃহকর্মীদের জন্য আইনি কোনো সুরক্ষা নেই। এমনকি সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কোনো সুবিধাও তারা পান না। নিয়োগকর্তার কথা অনুযায়ীই তাদের নিয়োগ হয়। তাদের সামাজিক সুরক্ষার মধ্যে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। এর পাশাপাশি সার্বিক শ্রম পরিবেশের উন্নতি ঘটাতে হবে।
ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ডেলিগেশনের প্রতিনিধি আবু সাইদ বলেন, উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার পর জিএসপি প্লাস সুবিধা পেতে হলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ফোরামে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেগুলো সম্পন্ন করতে হবে। তবে সম্পন্ন করলেই যে সেসব সুবিধা মিলবে তেমনটি নয়। এক্ষেত্রে একটি রাজনৈতিক বিষয়ও রয়েছে। তা হলো ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের অনুমোদন। বাংলাদেশের সার্বিক শ্রম পরিস্থিতিসহ অন্যান্য বিষয় পর্যবেক্ষণ করে ইইউ পার্লামেন্ট যদি সম্মতি দেয়, তবেই জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়া যাবে।
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বর্তমান বিশ্বে প্রধান অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে বাণিজ্য দ্বন্দ্ব চরমে। অনেক দেশ উদারীকরণের পরিবর্তে সংরক্ষণবাদের দিকে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে আইএলওর যেসব বিবাদ রয়েছে, সেগুলো অনেক ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারছে না। এমন অবস্থায় বাংলাদেশের মতো দেশগুলো নতুন বাস্তবতার সম্মুখীন হচ্ছে। কারণ বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন এজেন্ডা এসডিজি বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে। এ অর্জনের জন্য দ্বিপক্ষীয় ও সম্মিলিত প্রয়াস দরকার হবে।
তিনি বলেন, বিবিএসের হিসাব থেকে দেখা যাচ্ছে ম্যানুফ্যাকচারিংসহ বিভিন্ন খাতে কর্মীদের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে। তার মানে অর্থনীতিতে যেসব কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, তা শোভন কর্মসংস্থান নয়। এলডিসি-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও এসডিজির অভীষ্টগুলো অর্জন করতে হলে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার কাজে সমন্বয় আনতে হবে।
সিদ্দিকুর রহমান বলেন, রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর আমাদের শ্রম পরিবেশের ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। ব্যবসায়ীরা প্রতিনিয়ত কর্মপরিবেশের উন্নতিতে কাজ করছেন। আগামী দিনে সুশাসন ও পরিবেশগত বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনানুষ্ঠানিক খাতকে ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক খাতে রূপান্তরের বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হবে।
ওয়াজেদুল ইসলাম বলেন, নি¤œতম মজুরির বিষয়টি অত্যন্ত জটিল। একেক ক্ষেত্রে একেক ধরনের নি¤œতম মজুরি রয়েছে। তবে সার্বিক শ্রম পরিস্থিতির উন্নতি করতে হলে শোভন কর্মপরিবেশ আমাদের এগিয়ে যেতে সহায়তা করবে।
গগন রাজভাণ্ডারী বলেন, শ্রম পরিস্থিতির উন্নয়নে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। তবে কর্মে প্রবেশের বয়সসীমার বিষয়ে আইএলওর কনভেনশন বাংলাদেশ রেটিফাই করেনি। এটি করলে দেশটির ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হবে।