প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

সংকট মেটাতে বাজারে ডলার ছাড়ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

চাপে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ

শেখ আবু তালেব: বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ, রমজান ও ঈদুল ফিতরকেন্দ্রিক পণ্য আমদানি এবং সরকারি পর্যায়ে এলএনজি ও জ্বালানিসহ কয়েকটি পণ্যের আমদানি ব্যয় মেটাতে ডলার সংকটে পড়ছে ব্যাংকগুলো। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত তিন ব্যাংক। বাধ্য হয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে দৌড়াচ্ছে ব্যাংকগুলো। সংকট মেটাতে চলতি অর্থবছর ১০ মাসে ২২০ কোটি ডলার বিক্রির জন্য খোলাবাজারে ছেড়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর বিপরীতে মুদ্রা বাজার থেকে সাড়ে ১৮ হাজার কোটি টাকা চলে গেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। ফলে ব্যাংকগুলোয় নগদ টাকার সংকট বৃদ্ধির শঙ্কা আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় এমনিতেই তারল্য সংকটে ভুগছে ব্যাংক খাত। পাশাপাশি আমদানি প্রবৃদ্ধির তুলনায় রেমিট্যান্স প্রবাহ কম হওয়ায় ব্যাংকগুলোর কাছে প্রয়োজনীয় পরিমাণ ডলার নেই। ফলে ডলার কিনতে গিয়ে সাড়ে ১৮ হাজার কোটির বেশি টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে চলে গেছে। এর প্রভাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও কমে আসছে। অন্যদিকে ডলার কেনায় ব্যাংকগুলোর তারল্য প্রবাহে আরও চাপ বাড়বে, যা সুদের হার বৃদ্ধিকে উসকে দিতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, বিপিসিসহ রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন করপোরেশনকে নিয়মিতভাবেই পণ্য আমদানি করতে হচ্ছে। এসব আমদানি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মাধ্যমেই হয়ে থাকে। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে এই সময়ে ডলারের সংকট চলছে। এজন্য প্রতিনিয়তই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে ডলার কেনার প্রস্তাব আসছে। এর সঙ্গে বেসরকারি খাতের কয়েকটি ব্যাংকেরও ডলার সংকট চলছে। তারাও আবেদন করছে।
সূত্র জানিয়েছে, গতকালও ১০০ মিলিয়ন বা ১০ কোটি ডলারের চাহিদা ছিল বিভিন্ন ব্যাংকের। শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত তিন ব্যাংকের কাছে ২৫ মিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
জানা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে প্রতিনিয়ত ডলার কেনার জন্য আবেদন করছে বিভিন্ন ব্যাংক। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হার, বাজারের তারল্য পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ডলার ছাড়ছে।
বাজারে ডলার সংকট হলে বা টাকার সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণ করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার বিক্রি করে থাকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে। আবার ডলারের আধিক্য হলে প্রয়োজনীয় পরিমাণ ডলার বাজার থেকে তুলে নেয় টাকার বিনিময়ে। ডলার বাজার নিয়ন্ত্রণ রাখতে এ পদ্ধতি অবলম্বন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
গতকাল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে ৮৪ দশমিক ৫০ টাকায় প্রতি ডলার কিনেছে ব্যাংকগুলো। এ হিসাবে আড়াই কোটি ডলারের বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে ২১১ কোটি ২৫ লাখ টাকা প্রবেশ করেছে। সূত্র অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে এ পর্যন্ত ২২০ কোটি ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। স্থানীয় মুদ্রায় যা ১৮ হাজার ৫৯০ কোটি টাকার ওপরে।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাষ্ট্রায়ত্ত এক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেয়ার বিজকে বলেন, জ্বালানি বিশেষ করে এলএনজি আমদানি ব্যয় মেটাতে নিয়মিত ডলার লাগছে। এটি সরকারের অগ্রাধিকার খাত। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকই এসব পণ্যের এলসি খোলে। এছাড়া সরকারের মেগা প্রকল্পের বিপরীতে নিয়মিত পণ্য আমদানি হচ্ছে। এসব পণ্যের আমদানি ব্যয় মেটাতে হচ্ছে নিয়মিত। এজন্য ডলারের কিছুটা সংকট চলছে। বাধ্য হয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে ডলার কিনতে হচ্ছে।

গত অর্থবছরে ডলারের জোগান দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক মোট ২৩১ কোটি ডলার বিক্রি করেছিল। গত জানুয়ারিতে প্রতি ডলার বিক্রি হয়েছিল ৮৩ টাকা ৯০ পয়সায়। সেই ডলার গতকাল বিক্রি হয়েছে ৮৪ টাকা ৫০ পয়সায়। সাড়ে চার মাসের ব্যবধানে প্রতি ডলারের দর বৃদ্ধি পেয়েছে ৬০ পয়সা বা শূন্য দশমিক ৭২ শতাংশ। ডলারের দর বৃদ্ধিতে পণ্য আমদানি ব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে ব্যবসায়ীদের। এর প্রভাব পড়বে মূল্যস্ফীতির ওপর।
বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মিত ডলার বিক্রি করায় প্রভাব পড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল তিন হাজার ১১২ কোটি ৭০ লাখ ডলার। এক বছর আগে এই দিনে যা ছিল তিন হাজার ২০২ কোটি ২৫ লাখ ডলার। এক বছরের ব্যবধানে রিজার্ভ কমেছে ৮৯ কোটি ৫৪ লাখ ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেক তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের গত দশ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) রফতানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১ দশমিক ৬১ শতাংশ। গত ৯ মাসে আমদানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে পাঁচ দশমিক ১৩ শতাংশ। অপরদিকে গত দশ মাসে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধি হয় দশ শতাংশ।
গত অর্থবছরে প্রবাসীরা দেশে রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন এক হাজার ৪৯৮ কোটি ১৬ লাখ ডলার। চলতি অর্থবছরের গত এপ্রিল পর্যন্ত প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন এক হাজার ৩৩০ কোটি ৩০ লাখ ডলার। চলতি অর্থবছরের গত ৯ মাসে চলতি হিসাবে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪২৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার।

সর্বশেষ..



/* ]]> */