সক্ষমতার পরিচয় দিচ্ছে শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকগুলো

ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে মূলধন সংরক্ষণ

মেহেদী হাসান: ব্যাংকগুলোর ঝুঁকিসহন ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক রীতিনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২০১৫ সাল থেকে মূলধন পর্যাপ্ততা-সংক্রান্ত ব্যাসেল-৩ বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। এই ব্যাসেল-৩ বাস্তবায়নে সার্বিকভাবে বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকলেও সক্ষমতার পরিচয় দিচ্ছে দেশের শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকগুলো। ২০১৭ সাল শেষে দেশের শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকগুলো ব্যাসেল-৩ অনুযায়ী মূলধন সংরক্ষণে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্টে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
জানা গেছে, ব্যাসেল-৩ অনুযায়ী ব্যাংকগুলোকে মোট ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের ন্যূনতম ১০ শতাংশ হারে মূলধন সংরক্ষণ করতে হয়। এর পাশাপাশি অপ্রত্যাশিত ঝুঁকির ফলে উদ্ভূত ক্ষতি মোকাবিলার জন্য বাফার মূলধন হিসেবে ২০১৭ সালে ব্যাংকগুলোর ন্যূনতম প্রয়োজনীয় মূলধন ১০ শতাংশের অতিরিক্ত আরও এক দশমিক ২৫ শতাংশ অর্থাৎ মোট ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ মূলধন সংরক্ষণের আবশ্যকতা রয়েছে, যা ২০১৯ সালে সর্বমোট ১২ দশমিক ৫০ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। ২০১৭ সাল শেষে দেশের আটটি শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকের মধ্যে সাতটিই ১০ শতাংশ মূলধন সংরক্ষণে সক্ষম হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি ব্যাংক ১২ শতাংশ মূলধন সংরক্ষণে সক্ষম হয়েছে।
আর্থিক খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, মানুষের ধর্মীয় মূল্যবোধ কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলো। আমানত, ঋণ বিতরণ, ব্যবসা, মুনাফায় প্রবৃদ্ধিসহ ব্যাংক খাতের সব সূচকেই প্রচলিত ধারার ব্যাংকের চেয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলো। এসব ব্যাংক সুদকে ‘মুনাফা’ হিসেবে আখ্যায়িত করছে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাংকের শাখা বৃদ্ধি করা, গ্রাহককে বন্ধুসুলভ সেবা দেওয়া ও মুনাফা বা ক্ষতি ভাগ করে নেওয়ার কারণে মানুষের আস্থা বাড়ছে এসব ব্যাংকের প্রতি।
এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলো অপেক্ষাকৃত কম ঋণ প্রদান করে থাকে। ফলে এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণও কম। তাই এই ব্যাংকগুলোর মূলধন সংরক্ষণের হার ভালো।
ব্যাসেল-৩ বাস্তবায়নে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো পিছিয়ে রয়েছে। যার প্রভাব পড়েছে পুরো ব্যাংক খাতে। রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং ঊর্ধ্বমুখী শ্রেণিকৃত ঋণের কারণে বাড়তি প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। ফলে প্রয়োজনীয় মূলধনের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে মূলধনের ওপর চাপ পড়ছে। অন্যদিকে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোতে তুলনামূলক কম শ্রেণিকৃত ঋণ এবং মূলধন ঘাটতি না থাকার কারণেই এগিয়ে যাচ্ছে এ খাতের ব্যাংকগুলো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকে সম্পদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ দমমিক তিন শতাংশ; ২০১৬ সালে যেখানে সম্পদ ছিল ১৩ দশমিক দুই শতাংশ। আলোচ্য সময়ে বিনিয়োগ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ দশমিক তিন শতাংশ; ২০১৬ সালে বিনিয়োগ ছিল ১০ দশমিক ছয় শতাংশ। যেখানে সার্বিকভাবে ব্যাংক খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ।
বর্তমানে দেশে পূর্ণাঙ্গ ধারার আটটি ইসলামি ব্যাংক রয়েছে। এগুলো হলো: ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড, এক্সিম ব্যাংক লিমিটেড, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড, শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক লিমিটেড ও ইউনিয়ন ব্যাংক লিমিটেড। এছাড়া দেশি-বিদেশি মিলিয়ে প্রচলিত ধারার ৯টি ব্যাংকও ইসলামি ব্যাংকিং শাখা চালু করেছে আর আটটি চালু করেছে ইসলামি ব্যাংকিং উইন্ডো।
ইসলামি ধারার কয়েকটি ব্যাংকও সম্প্রতি আগ্রাসী বিনিয়োগ করছে। শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের আমানতের পরিমাণ ৭৬ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা। গত মে শেষে ব্যাংকটি ঋণ দিয়েছে ৭১ হাজার ৯১৭ কোটি টাকা। এক্সিম ব্যাংকের আমানতের পরিমাণ ২৫ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা; ব্যাংকটি ঋণ দিয়েছে ২৬ হাজার ৮০৯ কোটি টাকা। শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকের আমানতের পরিমাণ ১৬ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা। তারা ঋণ দিয়েছে ১৬ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা।
আলাপকালে সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকের (এসআইবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও কাজী ওসমান আলী শেয়ার বিজকে বলেন, ‘ইসলামি ব্যাংকিংয়ের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ছে। অন্যদিকে যাচাই-বাছাই করে বিনিয়োগ করার কারণে খেলাপিও কম। তাই ইসলামি ব্যাংকগুলোর ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে মূলধন সংরক্ষণের সক্ষমতা বাড়ছে।’