মত-বিশ্লেষণ

সচেতনতাই ডেঙ্গু প্রতিরোধের প্রধান উপায়

ডা. রোকসানা হোসেন জেবা: ডেঙ্গুজ্বর সাধারণত একটি সংক্রামক রোগ, যা ডেঙ্গু ভাইরাসের (অ.অবমুঃর) কারণে হয়। এডিস নামক এক ধরনের মশার কামড়ে এ রোগ হয়। ডেঙ্গুজ্বর ব্রেকবোন ফিভার নামেও পরিচিত। ডেঙ্গুজ্বরের জীবাণুবাহী মশা কেন ব্যক্তিকে কামড়ালে সেই ব্যক্তি চার থেকে ছয়দিনের মধ্যে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়। আবার আক্রান্ত ব্যক্তিকে কোনো জীবাণুবিহীন এডিস মশা কামড়ালে সেই মশাটিও ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী মশায় পরিণত হয়। এভাবেই এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির মধ্যে ডেঙ্গুজ্বরের জীবাণুবাহী এডিস মশার মাধ্যমে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ে। মে থেকে সেপ্টেম্বর মাস, বিশেষ করে গরম ও বর্ষার (বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী) সময় ডেঙ্গুজ্বরের প্রকোপ অনেক বেশি থাকে।
ডেঙ্গু প্রধানত দুই ধরনের হয়। ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু ফিভার ও হেমোরেজিক ফিভার। ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গুজ্বরে সাধারণত তীব্রজ্বর এবং সেই সঙ্গে শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা হয়ে থাকে; জ্বর ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত উঠতে পারে; শরীরের বিভিন্ন অংশে বিশেষ করে মাথায়, চোখের পেছনে, হাড়, কোমর, পিঠসহ অস্থিসন্ধি ও মাংসপেশিতে তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়; জ্বর হওয়ার চার থেকে পাঁচ দিন পর সারা শরীরে লালচে দানা দেখা যায়, এটা অনেকটা অ্যালার্জি বা ঘামাচির মতো; সঙ্গে বমি বমি ভাব বা বমি, রোগী অতিরিক্ত ক্লান্তিবোধ করে, খাবারে রুচি কমে যাওয়া প্রভৃতি লক্ষণ দেখা যেতে পারে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দুই বা তিনদিন পর আবার জ্বর আসে।
হেমোরেজিক ডেঙ্গুজ্বর ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গুজ্বরের লক্ষণ ও উপসর্গের পাশাপাশি আরও কিছু উপসর্গ দেখা যায়। শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে রক্ত পড়া যেমন মাড়ি ও দাঁত থেকে, কফের সঙ্গে, রক্ত বমি, চামড়ার নিচে, নাক ও মুখ দিয়ে রক্ত পড়া, চোখের মধ্যে ও চোখের বাইরে রক্ত ক্ষরণ; পায়খানার সঙ্গে রক্ত বা কালো পায়খানা; মেয়েদের বেলায় অসময়ে ঋতুস্রাব বা রক্তক্ষরণ, বুকে বা পেটে পানি আসা প্রভৃতি; লিভার আক্রান্ত হয়ে রোগীর জন্ডিস, কিডনিতে আক্রান্ত হয়ে রেনাল ফেইলিউর প্রভৃতি জটিলতা দেখা দিতে পারে।
ডেঙ্গুজ্বরের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই, উপসর্গ অনুযায়ী সাধারণ চিকিৎসাই যথেষ্ট। তবে কিছু জটিলতার ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট হলে, পেট ফুলে গেলে, শরীরের কোনো অংশে রক্তপাত হলে, রক্তের অনুচক্রিকার (প্লাটিলেট) মাত্রা কমে গেলে, অতিরিক্ত ক্লান্তি বা দুর্বলতা দেখা দিলে, প্রচুর পেটে ব্যথা, বমি বমি ভাব বা বমি হলে, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে গেলে, জন্ডিস দেখা দিলে প্রভৃতি ক্ষেত্রে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে।
অনেক ক্ষেত্রেই ডেঙ্গুজ্বরে খুব বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হয় না। পরিস্থিতি বুঝে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে হবে। জ্বরের চার থেকে পাঁচদিন পর সিবিসি এবং রক্তের প্লাটিলেট টেস্ট করতে হবে। তবে এবার ডেঙ্গুজ্বরের ধরন বদলে যাওয়ার ফলে জ্বরের প্রথম দিনই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ডেঙ্গু-সংক্রান্ত টেস্ট করাতে হবে। সাধারণত প্লাটিলেট এক লাখের কম হলে ডেঙ্গুর জীবাণু রয়েছে ধরে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। প্রয়োজনে ব্লাড সুগার, লিভারের পরীক্ষা যেমন এসজিওটি, এসজিপিটি, এলকালাইন প্রভৃতি টেস্ট করাতে হতে পারে।
ডেঙ্গুজ্বরের চিকিৎসা সাধারণ জ্বরের মতোই। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত বেশিরভাগ রোগীই সাধারণত সাত থেকে দশ দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। তবে রোগীকে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে চলতে হবে, যাতে ডেঙ্গুজনিত কোনো মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি না হয়। ডেঙ্গুজ্বরের চিকিৎসায় করণীয় কিছু বিষয় হলো জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল সেবন করতে হবে, দিনে সর্বোচ্চ চারবার পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে; জ্বর কমানোর জন্য বারবার শরীর মুছে দিতে হবে; জ্বরে পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে, তাই প্রচুর পানি ও তরল জাতীয় খাবার, ওরাল স্যালাইন, ফলের জুস, শরবত প্রভৃতি পান করতে হবে; বমির কারণে যদি কোনো রোগী পানি পান করতে না পারে সেক্ষেত্রে স্যালাইন দিতে হবে; অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যাসপিরিন বা অন্য কোনো ব্যথানাশক ওষুধ একেবারেই নয়; হেমোরেজিক ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে অবশ্যই হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে।
এবারের ডেঙ্গু একটু ভিন্ন ধরনের। আক্রান্ত বেশিরভাগ রোগীর বিভিন্ন অঙ্গ অকার্যকর হয়ে পড়ছে, যা আগের বছরগুলোয় দেখা যায়নি। পাশাপাশি হচ্ছে এনক্যাফালাইটিস (মস্তিষ্কে প্রদাহ) রোগও হচ্ছে। আগে ডেঙ্গুর দুটি ধরন দিয়ে আমাদের দেশের মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল। যেখানে মূলত হেমোরেজিক ফিভারে (রক্তক্ষরণজনিত জ্বর) মানুষের মৃত্যু ঘটত। কিন্তু এবার নতুন সেরোটাইপ-৩ আরও ভয়াবহ রূপে দেখা দিয়েছে। দেখা যাচ্ছে আক্রান্তদের হার্ট, কিডনি, লিভার ডেঙ্গুর কারণে স্বল্পসময়ে অকার্যকর হয়ে পড়ছে; যা আক্রান্ত রোগীকে মৃত্যুর দিকে ধাবিত করছে। ডেঙ্গুবাহিত এডিস মশা কামড়ের পর রক্তের মনোসাইটে অনিয়ন্ত্রিতভাবে জীবাণু বংশবিস্তার করে। প্রবহমান রক্তের মাধ্যমে এসব জীবাণু শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হার্ট, কিডনি, লিভারে প্রবেশ করে। সেখানে আরও অধিক হারে বংশবিস্তার করে এসব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কোষের কার্যকারিতা নষ্ট করে দেয়। এছাড়া এসব অঙ্গের কোষঝিল্লিতে আক্রমণ করে প্রদাহের সৃষ্টি করে। এতে কিডনির মূত্র উৎপাদনের কার্যকারিতা হ্রাস পায়, যা রেনাল ফেইলিওর হিসেবে পরিচিত। একইভাবে লিভার ফেইলিওর সৃষ্টি করে ডেঙ্গুর জীবাণু।
বিদ্যমান ডেঙ্গু পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে একে উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এ প্রসঙ্গে আইইডিসিআরের (রোগতত্ত্ব রোগ নিয়ন্ত্রণ গবেষণা প্রতিষ্ঠান) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, ডেঙ্গুর এই নতুন সেরোটাইপ-৩ এবং মাল্টি অর্গানে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি গত বছরও সামান্য লক্ষ করা গেছে। তবে এবার সেটি ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। কিন্তু যেহেতু বিষয়টি নতুন তাই এ প্রসঙ্গে পরিষ্কার ধারণা পেতে হলে অবশ্যই অধিকতর গবেষণা প্রয়োজন। পাশাপাশি এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হলে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫০ শতাংশ সাধারণ ও মারাত্মক ধরনের ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে বেশিরভাগ শিশু। বিশ্বে বছরে ২২ হাজার ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়। এদিকে স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমারজেন্সি অপারেশন সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। রাজধানী ছাড়িয়ে দেশের সব জেলার ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গু। সরকারি হিসাবে এ রোগে মৃত্যু ঘটেছে ১৮ জন, বেসরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ৪৬ জন। তবে সারা দেশে প্রকৃত মৃতের সংখ্যা কত এবং কত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, তা নিশ্চিতভাবে বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা।
ডেঙ্গুজ্বর প্রতিরোধে এডিস মশা রোধ করা এবং এই মশা যেন কামড়াতে না পারে তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সাধারণত স্বচ্ছ ও পরিষ্কার পানিতে এরা ডিম পাড়ে। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার ডিম পাড়ার উপযোগী স্থানগুলোকে পরিষ্কার করতে হবে, পাশাপাশি মশা নিধনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বাড়ির আশেপাশের জলাশয়, ঝোপঝাড়, জঙ্গল প্রভৃতি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে; ঘরের বাথরুমে বা অন্য কোথাও জমানো পানি ফ্রিজ, এয়ারকন্ডিশনারের নিচেও, ফুলদানি, অব্যবহৃত কৌটা, ডাবের খোলা, পরিত্যক্ত টায়ার, পলিথিন, পানি কিংবা কোমল পানীয় খোলা বোতল বা ক্যান প্রভৃতিতে যেন পাঁচ দিনের বেশি পানি জমে না থাকে। দিনের বেলায় অবশ্যই মশারি টানিয়ে অথবা কয়েল জ্বালিয়ে ঘুমাতে হবে; এডিস মশা সাধারণত দিনে কামড়ায়, বিশেষ করে সকালে বা সন্ধ্যায়। তাই দিনের বেলা শরীর ভালোভাবে কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে, প্রয়োজনে ঘরের জানালায় নেট লাগাতে হবে।
থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে পানি জমে ডেঙ্গু মশার প্রজনন বিস্তারের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হওয়ায় ডেঙ্গু মশার বিস্তার লাভ সহজ হয়। এ সময়ে জ্বর হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে এবং আক্রান্ত রোগীর বিশেষ যত্নের ব্যবস্থা করতে হবে। সাধারণত ডেঙ্গু সংক্রমণের নব্বই শতাংশ সংক্রমণই ঘটে বর্ষাকালে আর বর্ষা-পরবর্তী সময়ে যখন পানি জমা অবস্থায় থাকে। সরকার ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। সরকারি হাসপাতালে বিনা মূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হচ্ছে। বেসরকারি হাসপাতালও যাতে বেশি ফি নিতে না পারে, সেটি নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।
আতঙ্কিত না হয়ে ডাক্তারের পরামর্শ মেনে সঠিকভাবে চললে কয়েক দিনেই ডেঙ্গু রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যায়। এখন মোবাইল ফোনের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায়। সরকারি উদ্যোগে মুহূর্তেই স্বাস্থ্যসেবা দেশের বিভিন্ন স্থানের মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে ‘জাতীয় স্বাস্থ্য বাতায়ন’। ১৬২৬৩ হেল্পলাইনে জানা যাবে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য ও চিকিৎসা পরামর্শ। এটি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্বাস্থ্য অধিদফতরের এমআইএস বিভাগ কর্তৃক পরিচালিত একটি সরকারি জাতীয় হেলথ কল সেন্টার, যা দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা চালু থাকে। ১৬২৬৩ নম্বরে করে সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্যবিষয়ক যে কোনো সমস্যার পরামর্শ নিতে পারেন অভিজ্ঞ ডাক্তারদের কাছ থেকে। মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোও এ সেবা দিচ্ছে, তাদের কল সেন্টারের নম্বর ৭৮৯।
ডেঙ্গু রোগের বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এই, এখন পর্যন্ত এ রোগের প্রতিষেধক কোনো ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হয়নি। প্রতিরোধের বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি। মশার বংশবৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ নষ্ট করা, মশার কামড় থেকে বাঁচতে সচেতন থাকার মাধ্যমে ডেঙ্গুজ্বরের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলাই একমাত্র উপায়।

পিআইডি প্রবন্ধ

সর্বশেষ..



/* ]]> */