সঞ্চালন চার্জ ৬৮.৬৫ শতাংশ  বাড়ানোর প্রস্তাব জিটিসিএলের

গ্যাসের দাম বৃদ্ধির গণশুনানি শুরু

নিজস্ব প্রতিবেদক: ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রতি ইউনিট গ্যাসের সঞ্চালন চার্জ ৬৮ দশমকি ৬৫ শতাংশ বাড়ানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল)। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) গণশুনানিকালে সঞ্চালন চার্জ ইউনিটপ্রতি ২৬ দশমিক ৫৪ পয়সা থেকে ১৮ দশমিক ২২ পয়সা বৃদ্ধি করে ৪৪ দশমিক ৭৬ পয়সা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
নিট সঞ্চালন রাজস্ব ব্যয় বিবেচনায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে নিজেদের প্রস্তাবের পক্ষে যৌক্তিকতা তুলে ধরেছে প্রতিষ্ঠানটি, যদিও বিইআরসির কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি এই প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করে প্রতি ইউনিটের সঞ্চালন চার্জ ১০ দশমিক ২৭ পয়সা বাড়ানো যেতে পারে বলে মত দেয়। আর ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাব ও কয়েকজন ভোক্তা শুনানিতে অংশ নিয়ে মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাবের বিরোধিতা করে এই প্রক্রিয়া থেকে সরে আসতে বিইআরসির প্রতি আহ্বান জানান।
এর আগে চলতি বছরের ১৯ মার্চ গ্যাসের সঞ্চালন চার্জ পরিবর্তনের জন্য বিইআরসির কাছে আবেদন দাখিল করেছিল পেট্রোবাংলার কোম্পানিটি।
গতকাল রাজধানীর টিসিবি ভবনের মিলনায়তনে জিটিসিএলের পক্ষে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী আলী মো. আল-মামুন ও জেনারেল ম্যানেজার (অর্থ) মো. শেফায়েতুর রহমান নিজেদের প্রস্তাবের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন।
গণশুনানিতে উপস্থিত ছিলেন কমিশনের চেয়ারম্যান মনোয়ার ইসলাম, সদস্য আবদুল আজিজ খান, মিজানুর রহমান, রহমান মুর্শেদ ও মাহমুদ উল হক ভুঁইয়া।
এছাড়া কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম, জিটিসিএল, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, পেট্রোবাংলা ও বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন কোম্পানির কর্মকর্তারাও উপস্থিত আছেন।
জিটিসিএলের সঞ্চালন চার্জ বৃদ্ধির প্রস্তাবের পক্ষে যুক্তি হিসেবে বলা হয়, এলএনজি আমদানির মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাসের দেশীয় উৎপাদন হ্রাস ও ক্রমবর্ধমান চাহিদা বৃদ্ধি মোকাবিলার মাধ্যমে সমগ্র দেশের সুষম উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধি নিশ্চিতকল্পে জিটিসিএলকে ব্যয়বহুল দীর্ঘ সঞ্চালন পাইপলাইন, ট্রান্সমিশন প্লান্ট ও কম্প্রেসর স্টেশনসহ অবকাঠামো নির্মাণ কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হচ্ছে।
২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে জিটিসিএল কর্তৃক ৯ হাজার ৩৪৭ কোটি ব্যয়ে ১০টি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে যার মধ্যে নিজস্ব অর্থায়নের পরিমাণ এক হাজার ৩০৫ কোটি টাকা। তাছাড়া ভবিষ্যতে ১১ হাজর ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে আরও সাতটি অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়ে ইতোমধ্যে পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে, যার মধ্যে নিজস্ব অর্থায়নে পরিমাণ দুই হাজার ৮০০ কোটি টাকা।
বলা হয়, অগ্রাধিকারভিত্তিক বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে জিটিসিএল’কে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়। ফলে যেসব অর্থনৈতিক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে কোম্পানির গ্যাস সঞ্চালন ট্যারিফ নির্ধারিত রয়েছে, তা পরিবর্তিত হওয়ায় ট্যারিফ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা যৌক্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোম্পানির স্থায়ী সম্পদ ও সম্পদের অবচয় বৃদ্ধি, ঋণের পরিমাণ সুদ-ব্যয় বৃদ্ধি, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বৃদ্ধি, প্রকল্প বাস্তবায়নে নিজস্ব অর্থায়ন এবং অন্যান্য আর্থিক অবস্থার পরিবর্তনের জন্য কোম্পানির ট্যারিফ পুনর্নির্ধারণ আবশ্যক হয়ে পড়েছে।
বিইআরসি’র কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি (টেক) জিটিসিএলের এসব যুক্তি বিচার-বিশ্লেষণ করে তাদের মূল্যায়ন তুলে ধরে। কমিটির পক্ষে কমিটির সদস্য মো. কামরুজ্জামান তাদের সুপারিশ তুলে ধরেন। ২০১৬-১৭ অর্থবছরকে যাচাইবর্ষ বিবেচনায় ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬ এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরের নিরীক্ষিত এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরের রাজস্ব চাহিদা নিরূপণ করে মূল্যায়ন তুলে ধরে কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি।
সুপারিশে বলা হয়, কোম্পানির নতুন সম্পদ সংযোজন ও অবচয় বৃদ্ধির কারণে খরচ বাড়বে। জিটিসিএলের রেট বেজের ওপর রিটার্ন বিবেচনায় ২০১৮-১৯ অর্থবছরের নিট রাজস্ব চাহিদা ইউনিটপ্রতি ৩৬ দশমিক ৮১ টাকা, বিদ্যমান ট্রান্সমিশন চার্জ ২৬ দশমিক ৫৪ টাকা, সেই হিসেবে বিদ্যমান ট্যারিফ ঘাটতি ১০ দশমিক ২৭ টাকা। তাই বিদ্যমান ঘাটতি সংকুলানে ট্রান্সমিশন চার্জ সমন্বয় করা প্রয়োজন। বলা হয়, নতুন সম্পদ সংযোজনের কারণে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের তুলনায় ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রিটার্ন অন রেট বেজ এবং অবচয় ব্যয় বৃদ্ধি ইউনিট প্রতি মোট ১০ পয়সা।
তবে চার্জ বৃদ্ধির সুপারিশের বিরোধিতা করে ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, এখনও জাতীয় গ্রিডে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়নি। সেজন্য অবকাঠামোগত উন্নয়নও শতভাগ হয়নি। ভোক্তা যেহেতু এলএনজি পায়নি, তাই এলএনজি পাওয়ার আগে মূল্য বৃদ্ধির এই প্রক্রিয়া বেআইনি ও অযৌক্তিক।
তিনি বলেন, এলএনজি যুক্ত হওয়ার আগে গনশুনানি শুরু হতে পারে না। তাই আইনের স্বার্থেই এসব প্রস্তাব খারিজ করে দেওয়ার জন্য তিনি কমিশনের প্রতি আহ্বান জানান।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বদরুল আলম বলেন, এলএনজি’র ওপড় এতটা নির্ভর করা আমাদের উচিত হয়নি। এতে আমরা নিজেরাই নিজেদের বিপদ বাড়াচ্ছি।
তিনি বলেন, একটা সময় আমাদের এই ব্যয়বহুল জ্বলানির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে যেতে হবে। এটা কোনোভাবেই সুখকর হবে না। কিন্তু এলএনজি না এনে আমাদের দেশেই গ্যাসের আরো অনুসন্ধান করা যেত। আমি বুঝতে পারছি না গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি কীভাবে সামাল দেবে কমিশন।
আর বিইআরসি’র চেয়ারম্যান মনোয়ার ইসলাম বলেন, গণশুনানিকে প্রাধান্য দিয়েই গ্যাসের মূল্য পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত আসবে। সবার যুক্তিই আমরা বিবেচনায় নেব।
আজ তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির গ্রাহকপর্যায়ে দাম বাড়ানোর বিষয়ে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া আগামী ১৯ জুন মঙ্গলবার কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড, ২০ জুন বুধবার পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড ও বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি এবং সর্বশেষ ২১ জুন বৃহস্পতিবার জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেড ও সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি অনুষ্ঠিত হবে।