মত-বিশ্লেষণ

সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব

মো. নূরুল ইসলাম: সঞ্চয়পত্রের সুদ পরিশোধের জন্য এবার বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। সরকার এ কাজটি সম্পন্ন করে থাকে সঞ্চয়পত্র বিক্রির মাধ্যমে। সমাজে এমন একটা ধারণা রয়েছে যে, যারা সীমিত আয়ের লোকজন তাদের জন্য সঞ্চয়পত্র প্রকল্প চালু আছে। তবে বাস্তবে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। সঞ্চয়পত্র ক্রয়ে যে তথ্য পাওয়া যায়, তাতে দেখা যায় সুবিধাবাদী ও বিত্তশালীরাই সঞ্চয়পত্র ক্রয়ে এগিয়ে আছে। প্রতি বছর যে আয়কর রিটার্ন জমা হয়, সেখানে এ তথ্যই মেলে। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচনের হলফনামায় অনেক ধনী প্রার্থীর সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ রয়েছে বলে দেখা গেছে। এমনকি প্রাতিষ্ঠানিক তহবিলের অর্থও এ খাতে বিনিয়োগ হয়ে আসছে। বাস্তবতা হলো সঞ্চয়পত্রের বিক্রিতে কোনো স্বচ্ছ নীতিমালা নেই। তাই যাদের হাতে প্রচুর টাকা আছে, তারাই এখানে নিরাপদ মনে করে টাকা বিনিয়োগ করে থাকে। উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ আর হয়ে ওঠে না। এতে সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। আয়ের বৈষম্য বাড়ছে। সমাজের ধনী মানুষ অতি সহজে আরও ধনী যাতে হতে না পারে, তা দেখার দায়িত্ব সরকারের। সীমিত আয়ের মানুষ সহজে যারা ব্যবসায় যেতে পারে না, তাদের মধ্যে সঞ্চয়পত্র বিক্রি সীমাবদ্ধ থাকা বাঞ্ছনীয়।
বাংলাদেশ এখন অর্থনীতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। জীবনযাত্রার মান বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গড় আয়ু ও মাথাপিছু আয়ও বাড়ছে। বর্তমানে দেশে যে উন্নয়ন হচ্ছে, তাতে চাকরিজীবী, সুবিধাবাদী ও বিত্তশালীদের মধ্যে এর সুফল সীমাবদ্ধ রয়েছে। মোটেই ভালো নেই গ্রামবাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষক। চলতি সালে হাওর অঞ্চলের কৃষক ও গৃহস্থরা তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছে। শত চেষ্টা করেও সরকার তার নির্ধারিত ধানের ক্রয়মূল্য প্রদান করে ধান কিনতে পারেনি। বাস্তবতা হলো ওই সময় হাওরাঞ্চলে নানা কারণে সরকারনির্ধারিত ক্রয়মূল্যে ধান কেনার মতো কোনো পরিবেশ (ঋবধংরনরষরঃু) সেখানে বিরাজ করে না। কৃষিমন্ত্রী তো বলেই ফেলেছেন, কৃষককে তার ধানের ন্যায্যমূল্য দেওয়া গেল না। হাওরাঞ্চলে তখন ওই বৈরী পরিবেশে কীভাবে কৃষককে আর্থিক সহায়তা দেওয়া যায়, সে উপায় যেন কারও জানা নেই। তাই যুগ যুগ ধরে ফসলের ন্যায্যমূল্য পাওয়া থেকে হাওরাঞ্চলের মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে। আমি হাওরাঞ্চলের গৃহস্থ পরিবারের সন্তান। গত ৫০ বছরে এ ব্যাপারে আমার যে অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাতে এমনটিই মনে হয়। আমার মতে, বিকল্প কোনো উপায়ে ওই সময় কৃষককে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা এখন ভাবতে হবে। ওই সময় সরকার ইচ্ছা করলে যা করতে পারে তা হলো নির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় তাদের নগদ অর্থ দিয়ে সরাসরি সাহায্য করা, যাতে তাদের আর অল্প মূল্যে মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে ধান বিক্রি না করতে হয়। বর্ষা এলে সময় করে সরকার নিজস্ব পদ্ধতিতে ধান কিনবে।
বাংলাদেশ জাতীয় সঞ্চয়পত্রের কাঠামোগত পরিবর্তন এনে একটি প্যাকেজ প্রোগ্রামের মাধ্যমে গ্রামবাংলার কৃষককে কীভাবে আর্থিক সহায়তা দেওয়া যায়, এ নিয়ে আমার একাধিক লেখা শেয়ার বিজে প্রকাশিত হয়েছে। আজ আবার তা নতুনভাবে উপস্থাপন করছি। প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে গ্রামবাংলার, বিশেষ করে হাওরাঞ্চলের কৃষকরা খুবই উপকৃত হবে। তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য অনেকটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডিজিটাল পদ্ধতিতে পেয়ে যাবে। যেহেতু ওই সময় তাদের অল্প মূল্যে ধান আর ফড়িয়াদের কাছে বিক্রি করতে হবে না, তাই বিদ্যমান সঞ্চয়পত্রের কাঠামোগত কিছু পরিবর্তন এনে আলাদাভাবে গ্রামবাংলার কৃষকের জন্য একটি নতুন ধরনের সঞ্চয়পত্র চালু করা হোক, যার নাম হবে ‘মাসিক মুনাফাভিত্তিক গ্রামবাংলা সঞ্চয়পত্র’, যাতে কৃষকরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতি মাসে কিছু নগদ অর্থ হাতে পেয়ে যায়। একই সঙ্গে ফসল কাটার মৌসুমে বাড়তি কিছু সুবিধা দেওয়া হবে, যাতে আর্থিক কারণে তাদের ফসল ওঠাতে কোনো ধরনের বেগ পেতে হয় না। প্রকল্পটি পরিচালিত হবে সুনির্দিষ্ট একটি প্যাকেজ প্রোগ্রামের মাধ্যমে, যা সংযুক্ত চিত্রের মাধ্যমে বোঝানো হল।
বাংলাদেশে যে কয়টি সিটি করপোরেশন ও বড় জেলা শহর আছে, সেখানে ফসল কাটার সময় বা মৌসুম নেই বলে বিবেচিত হবে। হাতে টাকা না থাকায় যেসব কৃষক ওইসব হিসাব খুলতে পারবে না, ফসল কাটার সময় তাদের জন্য থাকা চাই ভালো রেশনিংয়ের ব্যবস্থা।
হিসাব খোলার শর্তাবলি: হিসাব হবে পরিবারভিত্তিক। একই পরিবারের একাধিক হিসাব খোলা যাবে না। নিজ এলাকায় হিসাব খোলা চাই প্রতিবছর জানুয়ারি, এপ্রিল, জুলাই ও অক্টোবরের ৫ তারিখ থেকে ২০ তারিখ পর্যন্ত যে কদিন অফিস খোলা থাকে।
হিসাব পরিচালনা: বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দিষ্ট কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংককে এসব হিসাব পরিচালনার দায়িত্ব দিতে পারে, যাদের অন্তত একটি শাখা উপজেলায় আছে। বাণিজ্যিক ব্যাংক প্রতিমাসে গ্রাহকের হিসাবে প্যাকেজ অনুসারে মুনাফা দিয়ে যাবে। এখানে সুদের হার বা সুদ শব্দটি ব্যবহার করার কোনো প্রয়োজন নেই। প্রয়োজনে প্যাকেজে উল্লেখিত বিনিয়োগ করা টাকার পরিমাণ, ব্যাংকের মুনাফা ও ভর্তুকির পরিমাণ পুনঃস্থাপন (জবংবঃ) করতে হবে। ওই হিসাবের ওপর কোনো ধরনের করারোপ করা চলবে না। প্রতিবেদনে ভুলভ্রান্তি ও হিসাবের গড়মিল থাকতে পারে, পর্যালোচনা করে তা গ্রহণযোগ্য মাত্রায় নিয়ে আসতে হবে।
গ্রামবাংলার মধ্যবিত্তদের, বিশেষ করে হাওরাঞ্চলের মানুষকে আর্থিক সুরক্ষা দিতে হলে সরকারকে অবশ্যই দুটি সুনির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করতে হবে। তার একটি হলো এই প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত করা, আর অপরটি হলো হাওরাঞ্চলে ফসল রক্ষা বেড়িবাঁধ-কাম-ডুবন্ত সড়ক (আরসিসি ঢালাই করে যাতে ছোট যানবাহন চলাচল করতে পারে) নির্মাণ করা। এবারের বাজেটে সব দিক দিয়ে ইতিবাচক বার্তা রয়েছে, শুধু নেই গ্রামবাংলার জন্য কোনো সুসংবাদ। সময় এসেছে প্রাতিষ্ঠানিক তহবিলের টাকা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করার সুযোগ না দেওয়ার। যা অতি জরুরি তা হলো সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের পরিমাণ সীমিত করা এবং নিশ্চিত হওয়া, যাতে একই পরিবারে একের অধিক সঞ্চয়পত্র কেনা না হয়। এতে সঞ্চয়পত্রে সুদ পরিশোধের টাকার অঙ্ক কমে আসবে। সহজেই সম্ভব হবে এ প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত করা। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য থেকে গ্রামবাংলার কৃষকের আর্থিক সুরক্ষা দেওয়ার জন্য এটিই উত্তম ব্যবস্থা।

অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা
[email protected]

সর্বশেষ..