সঞ্চয়পত্রে সুদহার বহাল রাখার ঝুঁকি বিবেচনায় নিন

নির্বাচনের আগে সঞ্চয়পত্রে সুদের হার কমছে না বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এ বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করে প্রতিবেদন দাখিলে দু’মাস সময় বেঁধে দেওয়া হবে বলে তিনি জানান। বাজেট পেশের পর থেকেই শোনা যাচ্ছিল, সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংকে স্থায়ী আমানতের ওপর সুদের হার কমানো হবে। একইসঙ্গে ব্যাংকঋণে সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী।
অর্থমন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, সঞ্চয়পত্র কেনা ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু নতুন নিয়ম-কানুন চালু করা হবে। এজন্য ব্যাংক হিসাব খোলা বাধ্যতামূলক করা হবে। একইসঙ্গে ৫০ হাজার টাকার সঞ্চয়পত্র কিনতে হলে চেকের মাধ্যমে লেনদেন করতে হবে।
সঞ্চয়পত্রে সুদের হার বেশি থাকায় মানুষ ব্যাংকে অর্থ রাখার পরিবর্তে সঞ্চয়পত্র কেনার দিকে ঝুঁকেছে। এতে ব্যাংকে তারল্য সংকট দেখা দেয়। ব্যাংকগুলোতে ঋণের বিপরীতে আমানত কমে আসে। বিশেষত বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে এ পরিস্থিতি দেখা দেয় এবং কোনো কোনো ব্যাংক বড় সংকটে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বিএবি’র সঙ্গে বৈঠক করে সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে রাখার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে বিএবিও এটাকে ৯ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এ বিষয়ে ঢিলেঢালা অবস্থা চলার পর তা কঠোরভাবে কার্যকরের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
সঞ্চয়পত্রে সুদের হার না কমিয়ে ব্যাংকে আমানত ও ঋণের ওপর এক অঙ্কের সুদ চালু হলে ব্যাংকগুলোকে আবারও সংকটে পড়তে হবে। ব্যাংকগুলো আমানত সংগ্রহে আশানুরূপ সাফল্য অর্জন করতে পারবে না। এতে ব্যাংক খাত সংকটে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাতে অর্থনীতিতেও ঝুঁকি বাড়বে। পাঁচ বছর মেয়াদি পরিবার সঞ্চয়পত্রে সুদের হার ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ, পাঁচ বছর মেয়াদি পেনশনার সঞ্চয়পত্রে ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ, পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রে সুদের হার ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ, তিন বছর মেয়াদি মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে এ হার ১১ দশমিক ০৪ শতাংশ এবং তিন বছর মেয়াদি ডাকঘর সঞ্চয়পত্রে সুদের হার ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ। সঞ্চয়পত্রে সুদের এ উচ্চ হারের বিপরীতে ব্যাংকে এক অঙ্কের সুদহার চালু হলে তারল্য সংকট সৃষ্টি হওয়ার শঙ্কাই স্বাভাবিক।
ব্যাংকগুলোতে তিন মাস মেয়াদি আমানতে সর্বোচ্চ সুদের হার ছয় শতাংশ নির্ধারণের পর অনেকেই তা ভাঙিয়ে সঞ্চয়পত্র কিনেছে। ব্যাংক সুদের হার এক অঙ্কে রাখার বিষয়টি কঠোরভাবে কার্যকর করা হলে এ প্রবণতা আরও বাড়বে। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোর সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলার জন্যই হয়তো সঞ্চয়পত্রে অর্থের লেনদেন চেকের মাধ্যমে করার চিন্তা করছে সরকার। কিন্তু প্রধান প্রশ্ন হলো, ব্যাংকগুলো ব্যবসা চালানোর মতো প্রয়োজনীয় আমানত সংগ্রহ করতে পারবে কি না এ পরিস্থিতিতে। এদিকে সার্বিকভাবে ব্যাংকগুলোর মুনাফা অর্জন আশাব্যঞ্জক নয়। এ কারণে চলতি বছরে তারা লভ্যাংশ নগদে পরিশোধের পরিবর্তে শেয়ারের মাধ্যমে সম্পাদন করেছে। এমন পরিস্থিতিতে সঞ্চয়পত্রে সুদের হার অপরিবর্তিত রেখে ব্যাংকে আমানত ও ঋণের সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনলে অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়বে কি না ভেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।