মত-বিশ্লেষণ

সঠিক খাদ্যাভ্যাসে থাইরয়েড নিয়ন্ত্রণ সম্ভব

শাহ্ মোস্তফা আনোয়ার: ফরিদ সাহেবের একমাত্র ছেলে শাহরিয়ার হোসেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র। পড়াশোনায় অনেক ভালো; কিন্তু হঠাৎ সে অমনোযোগী হয়ে ওঠে। অলসতা, খাওয়ায় অরুচি, নানান সমস্যা, এমনকি ঘুম থেকেও উঠতে চায় না সে। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কারও সঙ্গেই ঠিকমতো কথা বলে না; এমনকি জিনিসপত্র ভাঙচুর করছে। এ অবস্থা দেখে ফরিদ সাহেব ছেলেকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তার হাইপোথাইরয়েডিজম ধরা পড়ে। যার জন্য হাইপ্রেশার, কোলেস্টেরল, ক্রিয়েটিনিন বেড়ে আছে। ডাক্তার অভয় দিয়ে বললেন, নিয়মিত ওষুধ খেলে এবং খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করলে থাইরয়েড নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। শুধু ফরিদ সাহেবের ছেলেরই এ সমস্যা নয়, বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি ঘরেই থাইরয়েড এখন একটি সাধারণ রোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই থাইরয়েড নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে আমাদের সবারই সহায়ক খাদ্য সম্পর্কে জানা জরুরি।
মানবদেহের যেসব অঙ্গ থেকে হরমোন উৎপন্ন হয়ে সরাসরি রক্তে নিঃসৃত হয়, তাদের অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি বলে। থাইরয়েড গ্রন্থি একটি অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি। এর অবস্থান কণ্ঠনালির গোড়ার দিকে গলার হাড়ের ওপর। আকৃতি অনেকটা প্রজাপতির মতো। থাইরয়েড গ্রন্থি হতে নিঃসৃত হয় থাইরক্সিন ও এন্টিথাইরক্সিন নামে দুটি হরমোন। জরুরি অবস্থায় দেহে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে থাইরক্সিন হরমোন। যেমন, ভয় পেলে গায়ের লোম খাড়া হয়ে যাওয়া, চোখ বিস্ফোরিত হওয়া প্রভৃতি আকস্মিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে থাইরক্সিন হরমোন। এন্টিথাইরক্সিন-এর কাজ সম্পূর্ণ বিপরীত।
থাইরক্সিনের পরিমিত নিঃসরণ যেমন জরুরি, ঘাটতি কিংবা আধিক্য শরীরের জন্য তেমনি ক্ষতিকর। থাইরয়েড গ্রন্থির জটিলতা বা এর অস্বাভাবিকতাকে সাধারণভাবে থাইরয়েডিজম বলা হয়। থাইরয়েডিজম দুই ধরনের হতে পারে। যথা, হাইপারথাইরয়েডিজম ও হাইপোথাইরয়েডিজম। প্রয়োজনের তুলনায় থাইরক্সিন হরমোন অধিক পরিমাণে নিঃসৃত হলে তাকে হাইপারথাইরয়েডিজম ও কম নিঃসৃত হলে তাকে হাইপোথাইরয়েডিজম বলে। দুটি সমস্যাই মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। হাইপারথাইরয়েডিজমে উপসর্গগুলো দেখা দিতে পারে, যেমন: অতিরিক্ত অস্থিরতা, কোনো কাজে মনোযোগ দিতে না পারা, চক্ষু কোটরের বাইরের দিকে চলে আসা, অনিদ্রা, অতিরিক্ত ঘাম, সূক্ষ্ম কাঁপুনি, ওজন কমে যাওয়া, পাতলা পায়খানা প্রভৃতি। হাইপোথাইরয়েডিজমে উপসর্গগুলো সম্পূর্ণ এর বিপরীত।
উল্লেখ্য, ব্যক্তিবিশেষে উপসর্গগুলোর ভিন্নতা দেখা যেতে পারে। এছাড়া দেহে চাহিদার তুলনায় আয়োডিনের ঘাটতি থাকলে থাইরয়েড গ্রন্থি ফুলে যেতে পারে, যে অবস্থাকে সাধারণত গলগণ্ড বা ঘ্যাগ রোগ বলা হয়। পরিমিত আয়োডিন সরবরাহে এ রোগ নিরাময়যোগ্য।
থাইরয়েডের সমস্যা দেখা দিলে কিছু কিছু খাবার পরিহার করা জরুরি। তাই ডায়েটে ডাল, বিনস, সবজি সবই রাখতে হবে; তবে পরিমিত। অতিরিক্ত ফাইবার আমাদের থাইরয়েডের সমস্যাকে আরও কমপ্লিকেটেড করে দিতে পারে। ‘ডায়েটারি গাইডলাইন্স ফর অ্যামেরিকানস-এর হিসাব অনুযায়ী পূর্ণবয়স্ক মানুষের দিনে ২০-৩৫ গ্রাম ফাইবারযুক্ত খাবার খাওয়া উচিত। মিষ্টি, কেক বা মিষ্টি স্বাদযুক্ত যে কোনো খাবারকে ডায়েট থেকে বাদ দেওয়াই ভালো। আমাদের কারও যদি থাইরয়েডের জটিলতা থাকে, তাহলে মিষ্টি খাওয়া অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। কারণ, থাইরয়েড জটিলতা আমাদের শরীরের মেটাবলিজমকে শ্লথ করে দেয়। ফলে মোটা হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। তাছাড়া মিষ্টি খাবারের বাড়তি ক্যালোরি ওজন বাড়াতে সাহায্য করে।
থাইরয়েড থাকলে মিষ্টি বা চিনি একদম খাওয়া ঠিক নয়। আর কোল্ড ড্রিংকসে অধিক পরিমাণ চিনি থাকে, তা আমরা সবাই জানি। এমনিতেই এই সফট ড্রিংকসগুলো খাওয়া একদম ভালো নয়। তাই থাইরয়েড থাকুক বা না থাকুক, কোল্ড ড্রিংকস খাওয়ার প্রবণতা দূর করা উচিত; কফিতে থাকা ক্যাফেইন থাইরয়েড হরমোন রিপ্লেসমেন্ট মেডিসিনের কাজে বাধা দেয়। তাই যাদের থাইরয়েডের সমস্যা আছে, তাদের কফি এড়িয়ে চলা ভালো। কারণ, কফি অনেক সময় থাইরয়েডকে কন্ট্রোলের বাইরে নিয়ে গিয়ে বিপদ ডেকে আনতে পারে।
সয়াবিন যতই প্রিয় হোক না কেন, থাইরয়েড জটিলতা থাকলে এটি খাওয়া বন্ধ করতে হবে। সয়াবিনে থাকা আইসোফ্ল্যাভিন থাইরয়েডের ক্ষেত্রে সমস্যার কারণ হতে পারে। আর যদি রোজ ডায়েটে সয়াবিন রাখা হয়, তাহলে থাইরয়েড জটিলতার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে। থাইরয়েড জটিলতা ধরা পড়লে পাউরুটি, পাস্তা, ভাত বা গ্রেন-জাতীয় খাবার পরিহার করাই ভালো। কারণ, এতে থাকা গ্লুটেন নামের প্রোটিন ক্ষুদ্রান্তে সমস্যার কারণ হতে পারে, যা থাইরয়েড হরমোন রিপ্লেসমেন্ট মেডিসিনের অ্যাবজর্ভে বাধা দেয়। তাছাড়া গ্লুটেন ফ্রি ডায়েট থাইরয়েডকে খানিক নিয়ন্ত্রণে রাখতেও সাহায্য করে। আর আপনার ডায়েটে যদি গ্লুটেন রাখতেই হয়, তাহলে চেষ্টা করবেন যেন হোল গ্রেন থাকে।
থাইরয়েড জটিলতা ধরা পড়লে ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রুকলি, শালগম ইত্যাদি খাওয়া পরিহার করতে হবে; কারণ এগুলো থাইরয়েড নিঃসৃত হরমোনের আয়োডিনকে ব্যবহার করার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে শরীরে নানারকম সমস্যা হতে পারে। খাবার ঘরেই তৈরি করা উচিত। প্রসেস করা খাবারে প্রচুর পরিমাণে প্রিজারভেটিভ দেওয়া থাকে; প্রিজারভেটিভ মানেই সোডিয়ামের আধিক্য। থাইরয়েড জটিলতার ক্ষেত্রে সোডিয়াম-সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ একদম অনুচিত। বেশি সোডিয়াম খাওয়া মানেই হাই ব্লাডপ্রেসার, যা আমাদের থাইরয়েড সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে; অতিরিক্ত মাত্রায় ফাস্টফুড, ফ্যাট বা ভাজা জিনিস খেলে থাইরয়েড গ্ল্যান্ডে হরমোন উৎপাদনের সমস্যা হয়। তাই প্রতিদিনের ডায়েট থেকে মাখন, মেয়োনিজ, তেলেভাজা বার্গার বাদ দিয়ে দেওয়া ভালো। ফ্যাট-জাতীয় খাবার শরীরে থাইরয়েড হরমোন রিপ্লেসমেন্ট মেডিসিনের অ্যাবজর্ভে বাধা সৃষ্টি করে; তাই সাবধান!
অ্যালকোহল আমাদের শরীরে থাইরয়েড নিঃসৃত হরমোনের সামঞ্জস্যকে একদম নষ্ট করে দিতে পারে। শরীরে স্বাভাবিক থাইরয়েড হরমোনের উৎপাদনকেও ব্যাহত করে অ্যালকোহল। তাই অ্যালকোহলের নেশা প্রত্যেকের ত্যাগ করা দরকার।
থাইরয়েড জটিলতা একটি সাধারণ বিষয় এবং সঠিক চিকিৎসায় নিরাময়যোগ্য। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সচেতনতার অভাবে বেশিরভাগ রোগী থাইরয়েড জটিলতায় ভুগছেন। আরও একটি জরুরি বিষয় হলো, গ্রামবাংলার, এমনকি শহরের অনেক থাইরয়েড আক্রান্ত রোগীর পরিবার সনাতনধর্মী চিকিৎসার দ্বারস্থ হয়। ঝাড়-ফুঁক, কবিরাজি, ভেষজ নানাবিধ পরামর্শ আর চিকিৎসা নিয়ে রোগের প্রকটতা বাড়িয়ে দেয়। যা কাম্য হতে পারে না। দেশের সব জায়গায়, এমনকি প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাসপাতালগুলোতেও থাইরয়েডের বিশেষায়িত চিকিৎসা আছে। বিশেষায়িত ডাক্তারের পরামর্শে রোগীর সুস্থতা সম্ভব। তাই সঠিক চিকিৎসা ও সর্বস্তরে সচেতনতা বৃদ্ধি পেলে থাইরয়েড জটিলতা অনেকাংশেই নির্মূল হবে। সুস্থ-সুন্দর জাতি গঠনে থাইরয়েড জটিলতা বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি সময়ের দাবি।

পিআইডি প্রবন্ধ

সর্বশেষ..