সঠিক তথ্য ছাড়া উপযুক্ত নীতি নির্ধারণ দুঃসাধ্য

বৃহস্পতিবার রাজধানীতে পরিকল্পনা কমিশনে আয়োজিত ‘মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) নতুন ভিত্তি ও সংশোধন : প্রসঙ্গ বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান ঘিরে গতকালের শেয়ার বিজে ছাপা ‘বিবিএসের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে’ শিরোনামের খবরটি সচেতন পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকবে। অন্যান্য সংবাদপত্রেও এ খবর রয়েছে। শিরোনাম দেখে বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, এটি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) সংক্রান্ত। আর ওই প্রতিবেদনে উল্লিখিত আলোচকদের তালিকা পড়লে খোঁজখবর রাখেন এমন যে কেউ অনুভব করবেন, ব্যাপারটি সিরিয়াস। ইস্যুটির গুরুত্ব নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই বললে চলে। ভালো তথা সঠিক তথ্য ছাড়া যে কোনো ক্ষেত্রে উপযুক্ত নীতি নির্ধারণ প্রায় অসম্ভব এ কথা মানতে রাজি নন, তেমন মানুষের সংখ্যা কমই। আবার এই সঠিক তথ্য পরিবেশনে বিবিএসের দুর্বলতা সর্বজনবিদিত। কৌতূহলোদ্দীপক, উক্ত সভায়ই বিবিএসের উপাত্তের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম। তার মতে, বিবিএস পরিবেশিত শ্রমশক্তি জরিপে যেখানে দাবি করা হচ্ছে প্রতিবছর আনুমানিক ২০ লাখ নতুন মুখ কর্মবাজারে প্রবেশ করছে, সেখানে প্রকৃতপক্ষে সংখ্যাটি পাঁচ লাখের বেশি হওয়ার কথা নয়। কয়েক দিন আগে গত বছরের মূল্যস্ফীতি বিষয়ে বিবিএসের বরাত দিয়ে যে তথ্য উপস্থাপন করেছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, সে বিষয়েও সংশয় প্রকাশ করেন বিশেষজ্ঞরা। কোনোক্রমেই বলা যাবে না, আন্দাজে ওসব তথ্য-উপাত্ত হাজির করে বিবিএস। বরং আমরা বলতে পারি, যেসব প্যারামিটার সম্বল করে সংস্থাটি জরিপ চালায়Ñসেগুলোর কোথাও দুর্বলতা রয়ে গেছে। এর দুর্বলতার আরেক নজির হলো, কোন পথ ধরে কী উদ্দেশ্যে কোন ইস্যু নিয়ে জরিপ চালাতে হবে, সেসব অনুধাবনে অপারগতা। আবার অনেক সময় দেখা যায়, কৃষি জরিপে চিহ্নিত শ্রমবাজার চিত্রের তথ্যের সঙ্গে মেলাতে কষ্ট হচ্ছে শ্রম জরিপে উল্লিখিত কৃষিশ্রমিকের উপাত্ত। অবশ্যই আমরা মানছি, দুটি গবেষণার ধরন পৃথক। তাই দুইয়ের মধ্যে ব্যবধান থাকতেই পারে। কিন্তু সেটি এত বেশি হওয়া নিশ্চয়ই উচিত নয়, যাতে করে মনে হয় দুটো অসংগতিপূর্ণ।

মোটা দাগে বিবিএসের চারটি প্রধান ‘সমস্যা’ আমরা নির্ধারণ করতে পারিÑএক. জরিপ মডেলের কারিগরি ত্রুটি ও দুর্বলতা; দুই. সাংগঠনিক আমলাতান্ত্রিক জটিলতা; তিন. গবেষণার বিষয়বস্তু নির্ধারণে গতিশীল চিন্তার ঘাটতি এবং চার. সার্বিক সমন্বয়হীনতা। কেউ কেউ এর সঙ্গে আরেকটি বিষয় যুক্ত করতে চাইবেন। সেটি হলো, বিবিএসকে মাঝেমধ্যে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা। অথচ এটি রাষ্ট্রীয় মর্যাদাসম্পন্ন জরিপ সংস্থা। যত বিতর্কই থাকুক, সংস্থাটির তথ্য-উপাত্ত কিন্তু অফিসিয়ালি গ্রহণযোগ্য। অথচ সংগতিহীন ও কিছু ক্ষেত্রে অসম্পূর্ণ বা সন্দেহজনক তথ্য পরিবেশনের কারণে এর মান-মর্যাদা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে মাঝে মাঝে হলেও। বিবিএস নিয়ে যেসব বিতর্ক চালু রয়েছে তার সবগুলোই ভিত্তিহীন, এটা বলা সমীচীন হবে না। অতীতে দেখা গেছে, যে বিরোধী দল ক্ষমতাহীন অবস্থায় বিবিএসের জরিপ হেসে উড়িয়ে দিয়েছে, সেই দলই সরকারে গিয়ে রেফারেন্স টানছে বিবিএস থেকে! সেটি নিয়ে কারও আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক, সংস্থাটির সার্বিক উন্নয়নে নীতিনির্ধারকরা খানিকটা কম গুরুত্ব দেন বলেই প্রতীয়মান। জাতীয় স্বার্থে এমন পরিস্থিতি থেকে দ্রুত উত্তরণ কাম্য। একে তো বিষয়টি বিবিএসের মান-মর্যাদা তথা তাদের পরিবেশিত তথ্য-উপাত্তের গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন। দ্বিতীয় ইস্যু হলো, তথ্যেই যদি সঠিকতা না থাকেÑউপযুক্ত নীতিগত সিদ্ধান্ত আসবে কোত্থেকে?