সতর্ক ও সমন্বিত মুদ্রানীতিই এ সময়ে প্রয়োজন

পরবর্তী ছয় মাসে বাজারে অর্থের প্রবাহ কেমন থাকবে, তার একটি প্রাক্কলন থাকে মুদ্রানীতিতে। চলতি মাসের শেষদিকে নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এটি নিয়ে ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারীসহ সচেতন নাগরিকের একধরনের প্রত্যাশা থাকে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সর্বশেষ মুদ্রানীতি হওয়ায় এটি নিয়ে জল্পনাও ডালপালা মেলছে। গণমাধ্যমে খবর এসেছে, এবারের মুদ্রানীতি হবে সম্প্রসারণমূলক। যদি এমনটি হয়, তাহলে সেটি মূল্যস্ফীতির কারণ হতে পারে বলে ধারণা। বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে অর্থের সংস্থান বাড়াতে এ ধরনের মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হবে বলে শোনা যাচ্ছে। গতকাল শেয়ার বিজে ‘সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতির পথে বাংলাদেশ ব্যাংক’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে মাত্র চার দিনে চার হাজার ৮০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। নির্বাচনি বছর হওয়ায় এ প্রবণতা অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর এ প্রবণতাটি বছর শেষে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির শঙ্কা তৈরি করছে। বিষয়টি নিয়ে আগে থেকে সতর্ক হওয়ার বিকল্প নেই।
যে কয়টি লক্ষ্য সামনে রেখে মুদ্রানীতি ঘোষিত হয়, সেগুলোর অগ্রভাগে থাকে ব্যাংক খাত। কারণ সঞ্চয়পত্র ব্যতীত সরকারি ও বেসরকারি ঋণের প্রধান উৎস এখনও ব্যাংক। ফলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির বিষয় অনেকটাই নির্ভর করে এর ওপর। এখন আগামী মুদ্রানীতিতে যদি সরকারের ঋণ নেওয়ার বিষয়টিতে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, সেক্ষেত্রে বেসরকারি বিনিয়োগ হুমকিতে পড়তে পারে বলে অনেকে মনে করেন। ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের তুলনায় সরকারকেই বেশি নিরাপদ মনে করে ব্যাংকগুলো। বেসরকারি খাতে দেওয়া ঋণের একটা বড় অংশ খেলাপি হয়ে যাওয়াতেও ব্যাংকগুলোর তাতে আগ্রহ কমছে। অন্যদিকে সরকারকে ঋণ দিলে ঝুঁকি নেই বললেই চলে। যদিও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংকঋণের সদ্ব্যবহার করলে তার সুফল অনেক। এক্ষেত্রে ভালো উদ্যোক্তাকে ঋণ জোগানো গেলে কর্মসংস্থান বাড়বে। কিন্তু সরকারের ঋণের চাহিদা বেশি থাকলে বেসরকারি খাত প্রয়োজনীয় ঋণ না পাওয়ায় সেখানে বিনিয়োগে স্থবিরতা আসতে পারে। কর্মসংস্থানেও এর প্রভাব পড়বে। তবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারবাজার থেকেও তহবিল সংগ্রহের কথা। নানা কারণে বড় কোম্পানিগুলোর অধিকাংশকে আবার শেয়ারবাজারে আনতে পারেনি সরকার। ফলে তারা ব্যাংকঋণের ওপর বেশি নির্ভরশীল। এ অবস্থায় বিতরণযোগ্য ঋণ কমে গেলে বেসরকারি খাত সমস্যায় পড়বে বৈকি।
সরকারের নেওয়া ঋণ প্রশাসনিক কাজেই বেশি ব্যবহার হয়ে থাকে, যা অনুৎপাদনশীল। তবে নির্বাচনি বছরে বড় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে এটা বেশি ব্যবহার হতে পারে বলে ধারণা। এতেও কিন্তু কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সুযোগ থাকে। সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের অর্থ বেশি অপচয় হয় বলে যে ধারণা রয়েছে, সে কারণে বেশি আশাবাদীও হওয়া যায় না। এছাড়া পরবর্তী মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির যে শঙ্কা রয়েছে, তা সাধারণের ভোগান্তি বাড়িয়ে দেবে বৈকি। এমনিতেই ব্যাংক খাত নিয়ে একধরনের ভীতি তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে ব্যাংক আমানতে সর্বোচ্চ ছয় শতাংশ সুদ থাকায় মানুষ অপেক্ষাকৃত বেশি সুদের সঞ্চয়পত্রে ঝুঁকছে। সেক্ষেত্রে ব্যাংকঋণে নয় শতাংশ সুদের যে কথা বলা হয়েছে, তা ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ব্যাংক খাতে সরকারের ঋণের স্থিতি বর্তমানে ৯৪ হাজার কোটি টাকার বেশি। চলতি অর্থবছরে এর লক্ষ্যমাত্রা ৪২ হাজার কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের থেকে ২২ হাজার ৮৩ কোটি টাকা বেশি। গত অর্থবছরের শেষ দুই মাস থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার এ প্রবণতা বাড়ছে। এরই মধ্যে সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতি মূল্যস্ফীতির শঙ্কা বাড়াচ্ছে বলে অনেকের মত। নির্বাচনের বছরে সরকারকে ঋণ দেওয়ার উদ্দেশ্যে মুদ্রানীতিকে সম্প্রসারণমূলক করা হলে তা সুফল বয়ে আনবে না। এজন্য সতর্ক থেকে ও বেসরকারি খাতকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে সমন্বিত মুদ্রানীতি ঘোষণাই কাম্য।