সত্তরের দশকে জহুরুল ইসলাম

ঢাকার পতিত নগর পরিসরে সহসা রাজধানী জেগে ওঠায় আবাসন ও নির্মাণ খাত হয়ে উঠেছিল অনিবার্য। সেই বাতাবরণে জহুরুল ইসলামের সৃজনী পদক্ষেপ ছিল তুরুপের তাস। ক্ষুদ্র ঠিকাদারি দিয়ে শুরু। দেশের সীমানা মাড়িয়ে বিদেশ-বিভুঁইয়ে তিনি গড়েছেন আকাশচুম্বী অট্টালিকা, সড়ক-মহাসড়ক, কল-কারখানা; এমনকি দেশের আঙিনায় বুলন্দ করেছেন বিদেশি বড়-প্রসিদ্ধ বাণিজ্যিক ও শৌখিন গাড়ির সমৃদ্ধি। রাজধানী ঢাকার নির্মাণ, আবাসন ও বিস্তৃতির বিবর্তনিক ইতিহাসের ধারাক্রমে জহুরুল ইসলাম তাই এক অবিচ্ছেদ্য প্রাসঙ্গিকতা। পর্ব-৪২

মিজানুর রহমান শেলী: স্বাধীনতা-যুদ্ধোত্তর এই দেশের বেশিরভাগ বাণিজ্য ব্যবস্থায় মন্দাভাব বিরাজ করছিল। তবে পাটজাত পণ্য, চামড়া, হিমায়িত চিংড়ি, চিনি ও চায়ের মতো কিছু পণ্যের বিষয়টি ভিন্ন। কেননা এই পণ্যগুলো নিজস্ব কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল ছিল। অবশ্য কাঁচামালের সহজলভ্যতা শিল্প-কারখানার কর্মক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না। বরং দেশীয় অবকাঠামো এবং বিশেষত বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগের সংকটে দেশে শিল্প-কারখানার উন্নয়ন ব্যাহত হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থার বিপন্ন অবস্থার কারণে তখন কাঁচামাল সরবরাহ ও পণ্য বাজারজাতে ব্যাপক সংকট সৃষ্টি হয়েছিল।
উল্লেখ্য, এই সময় পাবলিক সেক্টরগুলো নানারকম আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং যথাযথ দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার অভাবে সংকটে পড়েছিল। যদিও এই সেক্টরগুলোতে উৎপাদন ও আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর অনেক বেশি সুযোগ তখন ছিল। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং ত্রুটিপূর্ণ মূল্য নির্ধারণের কারণে বেশিরভাগ শিল্প-কারখানাগুলো তাদের লভ্যাংশের ব্যাপারে আগে থেকে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারত না। ফলে জুটের মতো বিভিন্ন বড় বড় খাতে দেশ আর্থিক ক্ষতির হিসাব গুনতে বাধ্য হয়েছে। তাছাড়া স্বাধীনতা-পরবর্তী বেতন-ভাতা ও শ্রমঘণ্টা-সংক্রান্ত শ্রমিক অস্থিরতাও দানা বেঁধে ওঠে।
তবে ১৯৭৪-৭৫ সালের দিকে শিল্প-বাণিজ্যে কিছুটা উন্নয়ন দেখা যায়। যেমনÑচিনি, চা, সুতি, বস্ত্র ইত্যাদি। সিমেন্ট, পেট্রোলিয়াম, স্টিল, নিউজপ্রিন্ট এই অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে কিছুটা উন্নয়ন দেখাতে সক্ষম হয়। কিন্তু অন্যন্য খাতের উন্নয়ন ব্যবস্থায় কোনো উৎসাহ প্রদান করা হতো না। বাকি সব খাতের আর্থিক ও সক্ষমতা উন্নয়নের মাত্রা লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেক নিচে অবস্থান করে। ভোজ্যতেল, স্টিল, দিয়াশলাই, জুতার মতো পাটশিল্প একটি বিশাল কাঠিন্যের মাঝে পড়ে যায়।
স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে পাটের ব্যবসার অপেক্ষাকৃত ভালো অবস্থায় বাজারে পাটের খুব চাহিদা ছিল। ১৯৭৪-৭৫ অর্থবছরটি ছিল বাংলাদেশের পাট উৎপাদনের জন্য এক ঝুঁকিপূর্ণ বছর। ১৫ বছরের মধ্যে এ বছরেই পাট উৎপাদনের হার সর্বনি¤েœ নেমে আসে। গত ১৫ বছরের স্বাভাবিক রফতানি হারের তুলনায় এ বছরের উৎপাদিত পাটের অর্ধেক পাট বিক্রি সম্ভব ছিল। বিশ্বসেরা পাটের সুনাম থাকার পরও, এ বছর পাটে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২০ শতাংশ কম লভ্যাংশ গুনতে হয়েছে। অন্যদিকে পাটজাত পণ্যে ১৮ শতাংশ কম লভ্যাংশ এসেছে। ১৯৭২-৭৩ সালে ৮৩ মিলিয়ন, ১৯৭৩-৭৪ সালে এক দশমিক ৪২ মিলিয়ন এবং ১৯৭৪-৭৫ সালে কেবল ৬৬ হাজার বেল পাট রফতানি হয়। এভাবেই দেশের দ্বিতীয় প্রধান উৎপাদিত ফসলের উৎপাদন দুঃখজনকভাবে কমে যায়। ১০ মিলিয়ন পরিবারের আয়ের উৎস ছিল এই পাট চাষ। এ সময় পাট অপেক্ষা চালের দাম বেড়ে যায়। কেননা চাষিরা পাট চাষে আশাবাদী হয়ে ওঠেন। ১৯৭৪-৭৫ সালে পাটের রফতানি লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১২৫ মিলিয়ন ডলারের, কিন্তু রফতানি হয়েছিল মাত্র ১০০ মিলিয়ন ডলার। কাঁচা পাটের রফতানি ১৯৭২-৭৩ এবং ১৯৭৩-৭৪-এর তুলনায় ১৯৭৪-৭৫ (জুলাই থেকে ১৯৭৫-এর ফেব্রুয়ারি অবধি আট মাস) সালে ৩১ ও ২৪ শতাংশ কমে যায়।
অর্থাৎ স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশে কেবল পাট চাষ ও ব্যবসায় একটি ভালো পরিবেশ বিরাজ করছিল। পাটের সুনাম ১৯৭২ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে কমতে থাকে এবং ১৯৭৫ সালে তা চরম পর্যায়ে পতিত হয়। কিন্তু তার বছর সৌভাগ্যক্রমে এক দশমিক সাত মিলিয়ন পাটের ঘাটতি মেটাতে নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করে। কেননা ১৯৭৫-৭৬ অর্থবছরে নতুন সরকারের নেওয়া ‘ইনটেন্সিভ জুট কাল্টিভেশন স্কিম’ (আইজেসিএস)-এর মাধ্যমে আউশ ধানের পরিবর্তে পাট চাষ করা হয়। এতে দুই লাখ ৭০ হাজার একর জমির পাট চাষ পাঁচ লাখ একর জমিতে উন্নীত হয়।
তবে এ সময় জিনিসপত্রের দাম ১৯৬৯-৭০ সালের তুলনায় ১৯৭২-৭৩ সালে ২০০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে দ্রব্যমূল্য বিগত বছরের তুলনায় ৪০০ শতাংশ বেড়ে যায়। জীবনযাত্রার ব্যয় ১৯৭১-৭৪ সালের মধ্যে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ২৭০ শতাংশ।
তবে আর্থিকভাবে দুর্বল এবং রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কারণে সৃষ্ট অস্থিরতার মাঝে জহুরুল ইসলামের কোনো রকম ব্যবসায়িক উদ্যোগ গড়ে তোলা সম্ভব না হলেও তিনি হাত গুটিয়ে বসেছিলেন না। জহুরুল ইসলাম এ সময় দেশের বাইরে তার সৃজনশীলতা, মেধা, সাহস আর পুঁজি বিনিয়োগের চেষ্টা করেন। স্বাধীনতার আগে পাকিস্তান আমলে তিনি করাচি থেকে পাঁচ হাজার নলকূপ স্থাপনের কাজ সফলতার সঙ্গে শেষ করেছিলেন। এটা ছিল তার বিরল সাফল্য। তবে স্বাধীনতার পরে তিনি এই কাজের সামান্য অংশমাত্র পেয়েছিলেন। তখন তিনি আবারও নিজের শ্রম আর সৃজনশীলতাকে কাজে লাগালেন। এই কাজে তিনি নিজস্ব প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করলেন। নতুন লোকবল গড়ে তুললেন। তাদের প্রশিক্ষণ দিলেন। এভাবে তিনি দেশেই সর্বপ্রথম গভীর নলকূপ বসানোর উপকাঠামো গড়ে তুলতে সক্ষম হলেন। এই কাজে বিদেশি সাহায্যদাতা প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা ছিল। কিন্তু প্রথমে বিদেশিরা ভেবেছিলেন না জহুরুল ইসলাম এই কাজ ভালোভাবে শেষ করতে পারবেন। কিন্তু তিনি নিজের কাজ যথাসময়ে সফলতার সঙ্গে শেষ করেন।
এ সময় ১৯৭৫ সাল। জহুরুল ইসলাম তখন মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান করছিলেন। তিনি আবুধাবিতে তার আবাসন ব্যবসা নতুন উদ্যোমে শুরু করলেন। এই দশকজুড়ে জহুরুল ইসলাম অনেকগুলো নামকরা প্রকল্পের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেছেন। এগুলোর বেশিরভাগই বিডিসির আওতাধীন। তবে আবাসন ব্যবসা ছিল একেবারেই হুমকির মধ্যে। এ সময়ে তার উল্লেখযোগ্য কাজ হলোÑ১. আশুগঞ্জ থারমাল পাওয়ার স্টেশন, ২. ঘোরাশাল থারমাল পাওয়ার স্টেশনের প্রধান বিল্ডিং, ৩. জেনেরাল ইলেকট্রিক ম্যানুফ্যাকচার প্লান্ট চিটাগং। ট্রান্সফরমার তৈরি, বাজারজাতকরণ ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। এখানে ট্রান্সফরমার, সুইচ গিয়ারস, ড্রপ আউট ফিউজেস, ডিসকানেক্টরস, লাইটনিং এরেস্টরস নিয়ে কাজ হয়। বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদির মেরামত ও ব্যবস্থাপনা পরিষেবাও দিয়ে থাকে। বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড, ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই অথরিটি, ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানিসহ বিভিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ প্রতিষ্ঠান এ প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক। প্রতিষ্ঠানটি ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠা পায় চিটাগং থেকে। এই প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ স্টিল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের সহায়ক প্রতিষ্ঠান। ৪. শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল বিল্ডিং ও ৫. ২৭ কিলোমিটার ফেনী বাইপাস রোড।
এরপর ১৯৭৬ সাল। এ সময়ও জহুরুল ইসলাম দেশে নিয়মিত নন। তাছাড়া দীর্ঘদিন ছোট ভাই শফিউল ইসলাম কামাল দেশে থেকে ব্যবসার যাবতীয় বিষয় দক্ষতার সঙ্গে দেখভাল করেছে। তার ছিল সম্মহিত নেতৃত্ব আর অগাধ জ্ঞান, এটা পাবলিক রিলেশনের ওপর দারুণ প্রভাব ফেলতে পারে। এই যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারায় জহুরুল ইসলাম পরে ছোট ভাই শফিউল ইসলাম কামালকে কোম্পানির ডিরেক্টর হিসেবে নিয়োগ দেন। তখন ১৯৭৬ সাল। ইসলাম গ্রুপের ব্যবসায়িক উন্নয়নে তার ছিল অনবদ্য অবদান। তিনি এই গ্রুপকে দেশের অন্যতম প্রধান বৃহৎ গ্রুপে অধিষ্ঠিত হতে সাহায্য করেন।
স্বাধীনতার পরে সরকারের জাতীয়করণ নীতির কারণে ব্যবসা সংকটে পড়লে জহুরুল ইসলাম মেধাকে কাজে লাগাতে শুরু করেন দেশ ও দেশের বাইরে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে তিনি নির্মাণকাজে যোগ দেন। ১৯৭৭ সালে তিনি আবু ধাবিতে পাঁচ হাজার বাড়ি নির্মাণ করেন। এ সময়েই তিনি ইরাকে ডিজিটাল ইটের ভাটা, ইয়েমেনে একটি উপশহর, ইরাকে বিখ্যাত সিটি সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন। এসব কাজে তিনি সব সময় বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগ দিতেন। এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে বিদেশে বাংলাদেশের শ্রমবাজার প্রসারিত হয়।
তারপরের দুই দশকে তিনি দেশ ও দেশের বাইরে কয়েক হাজার বাড়ি বানিয়েছেন। জহুরুল ইসলাম বাংলাদেশের আর্থিক উন্নয়নের ব্যাপারে খুব আশাবাদী ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন গ্যাস, চামড়া, তেল ও সস্তা চামড়াও বাংলাদেশের মানুষের আয় ও জীবনযাত্রাকে বাড়িয়ে তুলবে।

গবেষক, শেয়ার বিজ