সদকায়ে ফিতরের পরিমাণ ও হুকুম

হাফেজ মাওলানা নাসির উদ্দিন: সদকায়ে ফিতর সম্পর্কিত হাদিসগুলো পর্যালোচনা করলে এ বিষয়ে মোট পাঁচ ধরনের খাদ্যের বর্ণনা পাওয়া যায়। যব, খেজুর, পনির, কিশমিশ ও গম। এ পাঁচ ধরনের মধ্যে যব, খেজুর, পনির ও কিশমিশ দ্বারা সদকায়ে ফিতর আদায় করতে চাইলে প্রত্যেকের জন্য এক ‘সা’ দিতে হবে। আর গম দ্বারা আদায় করতে চাইলে আধা ‘সা’ দিতে হবে। (‘সা’র পরিমাণÑএক ‘সা’ কেজির হিসাবে তিন কেজি ১৮৩ গ্রাম। আর আধা ‘সা’ কেজির হিসাবে এক কেজি ৫৯১.৫ গ্রাম হয়)। এ পাঁচটি দ্রব্যের যে কোনোটি দ্বারা ফিতরা আদায়ের সুযোগ দেওয়া হয়েছে যেন মুসলমানরা নিজ নিজ সাধ্য ও সুবিধা অনুযায়ী এর যে কোনো একটি দ্বারা তা আদায় করতে পারে।
হাদিস শরিফে আছেÑনবী করিম (সা.)কে সর্বোত্তম দান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, ‘দাতার নিকট যা সর্বোৎকৃষ্ট এবং যার মূল্যমান সবচেয়ে বেশি।’ (বুখারি শরিফ ৩/১৮৮; মুসলিম শরিফ ১/৬৯)। হযরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, আমরা সদকায়ে ফিতর আদায় করতাম এক ‘সা’ খাদ্য দ্বারা অথবা এক ‘সা’ যব, অথবা এক ‘সা’ খেজুর, কিংবা এক ‘সা’ পনির বা এক ‘সা’ কিশমিশ দ্বারা। অধিক মূল্যের দ্রব্য দ্বারা ফিতরা আদায় করা ভালো। কারণ যা দ্বারা আদায় করলে গরিবের বেশি উপকার হয়Ñসেটাই উত্তম সদকা।
শবেকদরের গুরুত্ব ও ফজিলত
আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই আমি কোরআন নাজিল করেছি শবেকদরে। শবেকদর সম্বন্ধে আপনি কি জানেন? শবেকদর হলো এক হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। এতে প্রত্যেক কাজের জন্য ফেরেশতারা ও রুহ অবতীর্ণ হয় তাদের পালনকর্তার নির্দেশক্রমে। এটা নিরাপত্তা, যা ফজরের উদয় পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।’ (সুরা কদর)। ইবনে আবি হাতেম (রহ.) থেকে বর্ণিত: নবী করিম (সা.) একদা বনি ইসরাইলের জনৈক মুজাহিদ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, সে এক হাজার মাস পর্যন্ত অবিরাম জিহাদে লিপ্ত ছিল। কখনও অস্ত্র সংবরণ করেনি। এতদশ্রবণে মুসলমানরা বিস্মিত হয়ে পড়লে উক্ত সুরা অবতীর্ণ হয়। এতে উম্মতের জন্য শুধু এক রাতের ইবাদতই সেই মুজাহিদের এক হাজার মাসের সশস্ত্র জিহাদ হতে উত্তম বলে বোঝানো হয়েছে। হজরত ইবনে জারির (রহ.) অন্য একটি ঘটনা এভাবে বর্ণনা করেন, বনি ইসরাইলের জনৈক আবেদ পূর্ণ রাত ইবাদতে কাটিয়ে সকাল হতেই জিহাদে শরিক হতেন এবং পুরো দিন জিহাদে মশগুল থাকতেন। তখন সাহাবায়ে কেরাম আনহুম আজমাইনরা০ আফসোস করলেন। তখন এই সুরা অবতীর্ণ হয়।
শবেকদরের ইবাদত ৮৩ বছর চার মাসের ইবাদতের সমতুল্য
মাত্র একটি রাত পরিপূর্ণ ভক্তিসহ ইবাদত করলে ৮৩ বছর চার মাসের ইবাদতের চেয়ে উত্তম। বছর ঘুরে এমন একটি মাস আসে, যাতে একটি নফল ফরজ সমতুল্য। একটি ফরজ ৭০টি ফরজের সমতুল্য। আর সে মাসেই পুণ্যময়ী রাত শবেকদরের ইবাদত ৮৩ বছর চার মাসের ইবাদতের সমতুল্য। এ কথা শুনে অনেকেই বিস্ময়াভিভূত হয়ে পড়েন যে, এরূপ কি করে হতে পারে? আসলে বিস্ময়ের কিছু নেই। কারণ পূর্বেকার লোকেরা অনেক বেশি হায়াত পেতেন। আর এই নবীর উম্মতরা মাত্র ৭০-৭৫ বছর হায়াত পান। তারা হায়াত বেশি পাওয়ার কারণে ইবাদতও করতেন বেশি; পক্ষান্তরে এই উম্মতরা হায়াত কম পাওয়ার কারণে ইবাদতও কম করতে পারে। তাই আল্লাহতায়ালা এই উম্মতকে ভালোবেসে বিশেষ পুরস্কার হিসেবে শবেকদরের রাতটি দান করেছেন।
শবেকদরে ফেরেশতারা রহমতের দোয়া করেন
হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত: নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যখন শবেকদর হয়, তখন জিবরিল (আ.) ফেরেশতাদের একটি দল নিয়ে অবতীর্ণ হন এবং ওইসব মানুষের জন্য (রহমতের) দোয়া করতে থাকেন, যারা দাঁড়ানো বা বসা অবস্থায় আল্লাহর জিকিরে লিপ্ত থাকেন।’ (বাইহাকি শরিফ)
বিজোড় রাতে শবেকদর
হজরত আয়েশা (রাযি.) বর্ণনা করেন, নবী করিম (সা.) বলেন, ‘তোমরা শবেকদরকে রমজানের শেষ ১০ দিনের বিজোড় রাতে তালাশ কর।’ এ হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, এই মহামূল্যবান রাতটি বেজোড় রাতে হবে। অর্থাৎ ২১, ২৩, ২৫, ২৭ বা ২৯তম রাতে হওয়ার সম্ভাবনা অধিক।
শবেকদর ২৭ তারিখ রাতে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি
বুখারি শরিফে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে: নবীজী বলেছেন, রমজানের শেষ দশকে শবেকদর অন্বেষণ কর। আর মুসলিম শরিফে আছে, শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে তালাশ কর। তাহলে ২৭ তারিখ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি কেন? এর উত্তর হলো এই যে, কেউ কেউ মনে করেন, আল্লাহতায়ালা সুরা কদরের মধ্যে ‘লাইলাতুল কদর’ শব্দটি তিনবার উল্লেখ করেছেন। এতে ৯টি করে মোট ২৭টি হরফ বা অক্ষর আছে। আর তিন দিয়ে ৯কে পূরণ করলে ২৭ হয়। সুতরাং এতেই ইঙ্গিত পাওয়া যায় শবেকদর ২৭তম রাতে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি (অবশ্য এ মতামতটি ব্যক্তিগত)। অতএব, এ দিকে না তাকিয়ে শেষ ১০ দিন শবেকদর খোঁজ করাটাই উত্তম।