সন্তানের কোলই হোক মা-বাবার শেষ আশ্রয়

ডা. জাকিউল হাসান: সময় ও স্রোত কারও জন্য অপেক্ষা করে না। আঁতুড়ঘর থেকে বার্ধক্য জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে মানুষের খাওয়া-দাওয়া, চাওয়া-পাওয়া, রোগবালাই ভিন্ন হয়ে থাকে। বিশেষ করে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষ আবার শিশুর মতো হয়ে যায়। এ বয়সে তাদের প্রয়োজন বাড়তি সেবাযত্ন, ভালোবাসা ও সঙ্গ। এ সময় তাদের অনেকে একাকিত্বে ভোগেন। খেলার সাথী, বন্ধুবান্ধব কিংবা কর্মস্থলের কেউই তার পাশে থাকেন না। স্মৃতিচারণ করেই অনেকটা সময় চলে যায়। এর সঙ্গে যোগ হয় শারীরিক দুর্বলতা। ফলে তাদের প্রয়োজন অতিরিক্ত সেবাশুশ্রুষা। হয়তো তাই নিকটজনরা অনেক সময় বিরক্ত হন তার প্রতি। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে উল্লেখ আছে ‘তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং মা-বাবার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদের ‘উহ্’ শব্দটিও বলো না; তাদের ধমক দিও না এবং তাদের সঙ্গে বলো শিষ্টাচারপূর্ণ কথা।’ (সুরা বনি ইসরাইল ২৩)

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একজন মানুষের প্রয়োজন শারীরিক ও মানসিক যতœ। অথচ এর পরিবর্তে কাছের মানুষের কাছ থেকেই অবহেলার পাত্র হয়ে যান। সন্তানরা বৃদ্ধ মা-বাবাকে পাঠিয়ে দেন ‘ওল্ড হোম’ বা বৃদ্ধনিবাসে। কেউ হয়তো স্বাধীনভাবে থাকার জন্য স্বেচ্ছায় চলে যান বৃদ্ধাশ্রমে, কেউবা নিতান্ত বাধ্য হয়েই এ করুণ পরিস্থিতিকে মেনে নেন।

ওল্ড হোম ধারণাটি পশ্চিমা বিশ্বের। গত শতকের শুরু থেকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক পরিবারের উত্তরণ ও একান্নবর্তী পরিবারভিত্তিক সমাজব্যবস্থার ক্রমাগত ক্ষয়প্রাপ্তির প্রত্যক্ষ ফল এসব বৃদ্ধাশ্রম। পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোয় একদিকে ব্যাপক মুনাফাপ্রত্যাশী পুঁজিবাদী ব্যবস্থা অনুৎপাদনশীল জনসংখ্যাকে রাখতে চায় মূল কাঠামোর বাইরে, অন্যদিকে ন্যায়ভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা দায় সারতে চায় সহজে। এর সঙ্গে আছে তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রবল আকাক্সক্ষা। তাই শেষ জীবনের আনন্দাশ্রম হিসেবে বৃদ্ধাশ্রমই হলো তাদের কাছে সুন্দর ও স্বাভাবিক ব্যবস্থা। সন্তানের বয়স ১৮ পার হলে সেখানে স্বাধীন ও স্বতন্ত্র জীবনের শুরু হয়। মা-বাবাকে ছেড়ে জীবন গড়ে তোলার সংগ্রাম শুরু করে তারা। সুদীর্ঘ কর্মজীবন শেষে বৃদ্ধ বয়সে সবাই নিজের মতো করেই স্বাধীনভাবে শেষ দিনগুলো কাটাতে চায়। সন্তানের গলগ্রহ হয়ে থাকতে চায় না। তাই কেউ কেউ নিজের মতো একাই থাকেন; কেউবা ওল্ড হোমে সমবয়সী অন্যদের সঙ্গে সময় কাটান। জীবনের শুরুতে স্কুলে যাওয়ার মতোই শেষ জীবনে বৃদ্ধাশ্রমে থাকা তাদের অনেকের কাছে খুব স্বাভাবিক পরিণতি। তারা এর জন্য তৈরিই থাকেন।

আধুনিক বা পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের দেশেও বৃদ্ধদের জন্য এমন নিবাস গড়ে তোলা হচ্ছে। কিন্তু পশ্চিমে যা স্বাভাবিক জীবনযাত্রার উপকরণ, আমাদের দেশে তার বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে এখনও ব্যক্তি থেকে পরিবারের গুরুত্বই বেশি। আগের একান্নবর্তী ব্যবস্থা এখন খুব একটা না দেখা গেলেও অন্তত মা-বাবাকে পরিবারের সদস্য হিসেবেই গণ্য করা হয়। ব্যক্তিস্বাধীনতার স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়ে পারস্পরিক সান্নিধ্যের শান্তিটুকুর মূল্য এখানে অনেক বেশি। তাই ছেলে বা মেয়ে স্বাবলম্বী হলেই মা-বাবাকে ত্যাগ করে নিজে একা একা চলবে বা মা-বাবাকে আলাদা রেখে নিজে আলাদা থাকবেÑএটা প্রত্যাশিত নয়। এখানে সন্তান সাবালক হলেই

মা-বাবার দায়িত্ব শেষ হয় না। তেমনি মা-বাবা বৃদ্ধ হলে ও কর্মক্ষম না থাকলে তার দেখাশোনার দায়ভার সন্তানের ওপরই বর্তায়। তাই পশ্চিমের ওল্ড হোম আমাদের জীবনধারায় অনুপস্থিত থাকাটাই কাম্য ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এর বিপরীতটাই দেখা যাচ্ছে। পশ্চিমের ন্যায় আমাদেরও জীবনযাত্রায় ব্যস্ততা যেমন বেড়ে যাচ্ছে, তেমনি ধীরে ধীরে এক-দুটি করে বেশ কিছু বৃদ্ধাশ্রমও গড়ে উঠছে। উন্নত বিশ্বের তুলনায় অনেক বেশি পারিবারিক বন্ধনসমৃদ্ধ সমাজব্যবস্থা থাকা সত্তে¡ও এভাবে বৃদ্ধাশ্রম তৈরি হওয়া চিন্তার কারণ অবশ্য।

বৃদ্ধাশ্রম আমাদের দেশে সংস্কৃতির অংশ নয়; বরং অনেকটাই মূল্যবোধের অবক্ষয়। আমাদের এখানে যারা বৃদ্ধাশ্রমে থাকেন, তাদের বেশিরভাগই যে স্বেচ্ছায় থাকেন, তা নয়। অনেকেই সন্তানের অবহেলা বা অযতেœর কারণে, কখনও কখনও দুর্ব্যবহারের শিকার হয়ে আশ্রয় নেন এসব নিবাসে। আজ যারা বৃদ্ধ, তারা জীবনের সব সময় ধন-সম্পদ বিনিয়োগ করেছিলেন সন্তানের জন্য; নিজের জন্য রাখেননি কিছুই। কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে সন্তানের কাছ থেকে এর একটি ক্ষুদ্র অংশও তারা পাচ্ছেন না। কখনও দেখা যায়, সন্তান তার নিজের পরিবারের খরচ জোগাতে হিমশিম খাচ্ছে, তাই মা-বাবাকে মনে করছে বোঝা। নিজে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে একটু ভালো থাকার জন্য মা-বাবার ঠাঁই করে দিয়েছে বৃদ্ধাশ্রমে। আবার এমনও দেখা যায়, সন্তানের টাকা-পয়সার অভাব নেই; কিন্তু মা-বাবাকে নিজের কাছে রাখার প্রয়োজন বোধ করছে না বা বোঝা মনে করছে। হয় নিজেই পাঠিয়ে দিচ্ছে বৃদ্ধাশ্রমে, নয়তো অবহেলা-দুর্ব্যবহার করে এমন অবস্থার সৃষ্টি করছেÑযেন তার মা-বাবা নিজেরাই সরে যান পরিবার থেকে। কেউ কেউ আবার এমনও বলেন, টাকার অভাব না থাকলেও সময়ের অভাব আছে, মা-বাবাকে দেখভাল করা বা তাদের সঙ্গে কথা বলার মতো পর্যাপ্ত সময় তার নেই। তাই বাবা বা মা নির্জন থাকার চেয়ে বৃদ্ধনিবাসে অন্যদের সঙ্গে একত্রে সময় কাটানোই ভালো। এভাবে নানা অজুহাতে তাদের দূরে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অনেক বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিক্ষক, চাকরিজীবী যারা এক সময় খুব বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী ছিলেন, বৃদ্ধ বয়সে সন্তানের কাছেই অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হয়ে বৃদ্ধাশ্রমের স্থায়ী বাসিন্দা হচ্ছেন। অনেক সন্তান বা আত্মীয়-স্বজন তাদের কোনো খবর নেন না। তাদের দেখতে আসেন না, এমনকি প্রয়োজনীয় টাকা-পয়সা বা জিনিসপত্রও পাঠান না। বাড়িতে কোনো অনুষ্ঠান বা ঈদের সময়ও বাড়িতে নেন না মা-বাবাকে। এমনও শোনা যায়, অনেকের মৃত্যুর পরও দেখতে যান না অনেক সন্তান। বৃদ্ধনিবাস কর্তৃপক্ষই কবর দেওয়া বা শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করে থাকে।

দায়িত্বে অবহেলা বা এড়িয়ে যাওয়াই নয়, অনেকের জন্য বৃদ্ধনিবাস আসলেই অতিপ্রয়োজনীয় বিকল্প। অনেক বৃদ্ধ আছেন যার সন্তান নেই, নেই কোনো নিকটাত্মীয়। অনেকের সন্তান থাকলেও দেখা যায় তার আর্থিক সঙ্গতি নেই মা-বাবাকে ভরণ-পোষণের। বৃদ্ধাশ্রমে তাদের জীবন আরেকটু আনন্দময় হবে চিন্তা করেই হয়তো তারা বুকে পাথর বেঁধেই সেখানে পাঠিয়ে দেন। অনেকের সন্তান কাজ করেন দেশের বাইরে। তারা টাকা পাঠাতে পারলেও মা-বাবাকে সময় দেওয়া সম্ভব হয় না। সে সঙ্গে অনেকে জীবন সায়াহ্নে এসেও স্বাধীনচেতা, সন্তানের ওপর নির্ভরশীল থাকাকে এক ধরনের বোঝা মনে করেন; তারা স্বেচ্ছায় বৃদ্ধনিবাসে চলে যান। তাদের জন্য বৃদ্ধনিবাস এক চমৎকার জায়গা। থাকা-খাওয়ার চিন্তা বাদ দিয়ে শেষ জীবনে অবসর সময়টাকে উপভোগের সুযোগ করে দেয় বৃদ্ধাশ্রম। এখানে একটা নতুন পরিবার তৈরি করে নেন তারা। সমবয়সীদের সঙ্গে  হেসেখেলে, স্মৃতিচারণা করে তাদের সময়টা ভালোই কেটে যায়। আবার প্রয়োজনমতো নিজের পরিবারের সঙ্গেও দেখা-সাক্ষাৎ করেন, নানা পালা-পার্বণে সন্তান, নাতি-নাতনিদের সঙ্গে আনন্দমুখর সময় কাটান।

বৃদ্ধাশ্রমে অনেকে নির্ভাবনায়, সম্মান ও আনন্দের সঙ্গে জীবনের বাকি দিনগুলো কাটাতে পারেন। অনেক বৃদ্ধাশ্রমে চিকিৎসারও ব্যবস্থা আছে। কিন্তু সব প্রাপ্তির মাঝেও এখানে যা পাওয়া যায় না, তা হলো পরিবারের সান্নিধ্য। বৃদ্ধ বয়সে সন্তান ও নাতি-নাতনিদের সঙ্গে একত্রে থাকতে চায় মানুষ। তাদের সঙ্গে জীবনের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে চায়। সারা জীবনের কর্মব্যস্ত সময়ের পর অবসরে তাদের একমাত্র অবলম্বন এ আনন্দটুকুই। বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয়, সঙ্গী-সাথী ও বিনোদন পাওয়া যায়; কিন্তু শেষ জীবনের পরম আরাধ্য আনন্দটুকু পাওয়া যায় না। তাই তারা এ সময়টায় প্রবল মানসিক যন্ত্রণা আর ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আবেগাপ্লুুত হয়ে ওঠেন। নেহায়েতই অনন্যোপায় হয়ে ইচ্ছার বাইরে যারা মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠান, তাদের কথা ভিন্ন। যারা পর্যাপ্ত সম্পদ ও সময়-সুযোগ থাকার পরও শুধু অবহেলা করে মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দিয়ে ভুলে যান, তাদের স্মরণ রাখা দরকার এমন সময় তাদের জীবনেও আসতে পারে। তার সন্তানও হয়তো একদিন তার সঙ্গে এমনই আচরণ করবে।