প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

সফটওয়্যারের তথ্য মুছে পারসোনার ভ্যাট ফাঁকি!

রহমত রহমান: সৌন্দর্যসচেতন ফ্যাশনেবল নারী-পুরুষের রূপচর্চা ও মেকআপের জন্য আইকন ‘পারসোনা’। বেশ কিছুদিন ধরেই ‘পারসোনা’ একটি ব্র্যান্ড হয়ে উঠেছে। রূপসজ্জায় দক্ষতা ও সুনামের সঙ্গে গ্রাহকসেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে। শতভাগ স্বচ্ছতার সঙ্গে পস (পয়েন্ট অব সেল) সফটওয়্যারের মাধ্যমে গ্রাহকের কাছ থেকে ভ্যাট নেয় পারসোনা। কিন্তু সফটওয়্যারে ধারণ করা তথ্য বিকৃত করে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটি ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে আসছে। প্রতিষ্ঠানটির সূক্ষ্ম কৌশলের এ ফাঁকি উদ্ঘাটন করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও করা হয়েছে। এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
এ বিষয়ে পারসোনা হেয়ার অ্যান্ড বিউটি কেয়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কানিজ আলমাস খান শেয়ার বিজকে বলেন, ‘তথ্য মুছে ফেলা হতেই পারে না, পুরাটাই ভুল কথা। এমন অভিযোগ ঠিক নয়। আমরা সর্বোচ্চ ভ্যাটদাতা হিসেবে সনদ পেয়েছি। এরপর যদি এ ধরনের অভিযোগ করা হয়, তাহলে কোনটা সত্যি? সরকারের নির্দেশনার পর থেকে আমরা পস ব্যবহার করি। আমাদের পুরোটাই সফটওয়্যারের অধীন, লুকোচুরির কিছু নেই। স্লিপ ছাড়া আমাদের ফ্লোরে কেউ কোনো সার্ভিসও পায় না।’
সূত্র জানায়, ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় পারসোনা হেয়ার অ্যান্ড বিউটি কেয়ার লিমিটেড। ঢাকার গুলশান, বনানী, মিরপুর, উত্তরা, ধানমণ্ডি ও চট্টগ্রামে নারীদের জন্য সাতটি ও পুরুষের জন্য চারটি শাখা রয়েছে। এছাড়া পারসোনা স্প্রিং স্পা, পারসোনা হেলথ, পারসোনা স্টুডিও, ক্যানভাস ম্যাগাজিন, পারসোনা ইনস্টিটিউট ও পারসোনা মেনজ সেলুন রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিটি শাখায় পস সফটওয়্যার ব্যবহার করে গ্রাহকদের কাছ থেকে ভ্যাট নেওয়া হয়, কিন্তু সঠিকভাবে তা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয় না বলে অভিযোগ ওঠে।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে এনবিআরের নির্দেশে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় মূসক নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর। প্রথমে গোয়েন্দা তথ্য নেওয়ার পর সত্যতা পেয়ে চলতি বছরের ২০ মার্চ প্রতিষ্ঠানটির ঢাকার সব শাখায় একযোগে অভিযান চালানো হয়। ওই অভিযানে সফটওয়্যার থেকে তথ্য মুছে ফেলার সত্যতা পাওয়া যায়। স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে এমন ভয়াবহ জালিয়াতির বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে সম্প্রতি এনবিআরকে চিঠি দেয় মূসক গোয়েন্দা।
চিঠিতে বলা হয়, অভিযানে দেখা যায় ভ্যাট কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে গ্রাহকরা সেবা নিচ্ছেন। সেবা বিলের সঙ্গে ভ্যাট নিয়ে পস মেশিন থেকে চালান (সফটওয়্যার জেনারেটেড ইনভয়েস বা রিসিট) দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ভ্যাট কর্মকর্তারা পারসোনার কর্মকর্তাদের পস সফটওয়্যার সিস্টেম থেকে এসব ইনভয়েস প্রিন্ট দিতে বলেন। প্রিন্ট দেওয়ার পর দেখা যায়, যেসব গ্রাহককে ইনভয়েস দেওয়া হয়েছে, তার বেশিরভাগই সফটওয়্যার থেকে মুছে ফেলা হয়েছে। এছাড়া শাখাগুলো থেকে কিছু প্রতিষ্ঠানের কিছু ব্যক্তিগত চালান উদ্ধার করা হয়, যাতে প্রতিষ্ঠানের নাম ছাড়া কিছুই নেই। ধারণা করা হচ্ছে, অনেক গ্রাহক ভ্যাট দিলেও পস মেশিন থেকে ইনভয়েস বা চালান নেন না। তাদের কাছ থেকে ভ্যাট নিয়ে এ ব্যক্তিগত চালান দেওয়া হয়। ফলে এসব ভ্যাট সরকারি কোষাগারে জমা হয় না।
চিঠিতে আরও বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটির একটি শাখা থেকে ১৭টি বাণিজ্যিক চালান উদ্ধার করা হয়। পরে তা সফটওয়্যার থেকে প্রিন্ট দেওয়া হয়। এতে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি ১৭টি বাণিজ্যিক চালান গ্রাহকদের দিয়ে ভ্যাট আদায় করলেও মাত্র তিনটি চালানের তথ্য সফটওয়্যারে এন্ট্রি দিয়েছে, যা শাখাটির ইস্যু করা বাণিজ্যিক চালানের ১৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ। বাকিগুলো এন্ট্রি না দিয়ে মুছে ফেলা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি সব শাখায় ৮২ দশমিক ৩৫ শতাংশ চালানের তথ্য কৌশলে অন্যত্র গোপন করার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে আসছে। প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে কর্মকর্তারা দেখতে পান, প্রতিষ্ঠানটি শতভাগ সেবাপ্রদানের বিপরীতে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে ভ্যাটসহ সেবামূল্য নেয়; কিন্তু নামমাত্র সেবা পস সফটওয়্যারে ধারণ করে বাকি সিংহভাগ সেবামূল্য কৌশলে অন্যত্র সরিয়ে বছরের পর বছর ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে আসছে। তবে তথ্য মুছে ডিজিটাল জালিয়াতির মাধ্যমে কী পরিমাণ ভ্যাট দেওয়া হয়েছে, তা হিসাব করা হচ্ছে। ফাঁকির হার বছরে কয়েক কোটি টাকা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সূত্রমতে, ২০০৮ সালে বিউটি পার্লারসহ ১০ খাতে ভ্যাট আদায়ে ইসিআর বা পস মেশিন বাধ্যতামূলক করে এনবিআর। ১০ খাতে ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশ। এক্ষেত্রে ‘ফিসক্যাল মেমোরি’ ধারণে সক্ষম ইসিআর বা পস মেশিন বসানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। কারণ ফিসক্যাল মেমোরি ধারণে সক্ষম ইসিআর বা পস মেশিন থেকে তথ্য মুছে ভ্যাট ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু পারসোনার পস মেশিন ফিসক্যাল মেমোরি ধারণে সক্ষম নয়। ফলে সহজে তথ্য মুছে ফেলা যায়। ফাঁকি রোধে সব শাখার মেশিন জব্দ করা জরুরি। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটি প্রতিমাসে কী পরিমাণ সেবা দেয় এবং ভ্যাট আদায় করে, তা জানাও জরুরি। প্রতিষ্ঠানটির সঠিক সেবা প্রদান ও ভ্যাট আদায়ের জন্য মূসক গোয়েন্দা ও ভ্যাট কমিশনারেটের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে এক মাসব্যাপী সব শাখা তদারকি করতে এনবিআরের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে মূসক নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের একজন কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, এমন স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানটি ডিজিটাল জালিয়াতির আশ্রয় নেবে ভাবা যায় না। ধারণা করা হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানটি জন্মলগ্ন থেকেই এভাবে ফাঁকি দিয়ে আসছে। তবে আমরা ফাঁকি উদ্ঘাটনের চেষ্টা করছি।

সর্বশেষ..



/* ]]> */