‘সফলতার কোনো শর্টকাট পথ নেই’

একটি প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন বিভাগ-প্রধানের সাফল্যের ওপর নির্ভর করে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও’র সফলতা। সিইও সফল হলে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা বেশি হয়। খুশি হন শেয়ারহোল্ডাররা। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সিইও’র সুনাম। প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও), কোম্পানি সচিব, চিফ কমপ্লায়েন্স অফিসার, চিফ মার্কেটিং অফিসারসহ এইচআর প্রধানরা থাকেন পাদপ্রদীপের আড়ালে। টপ ম্যানেজমেন্টের বড় অংশ হলেও তারা আলোচনার বাইরে থাকতে পছন্দ করেন। অন্তর্মুখী এসব কর্মকর্তা সব সময় কেবল প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকেন। সেসব কর্মকর্তাকে নিয়ে আমাদের নিয়মিত আয়োজন ‘টপ ম্যানেজমেন্ট’। শেয়ার বিজের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এবার মেটলাইফ বাংলাদেশের (আমেরিকান লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি) প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) আলা উদ্দিন এফসিএ, সিজিএমএ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. হাসানুজ্জামান পিয়াস

আলা উদ্দিন এফসিএ, সিজিএমএ মেটলাইফ বাংলাদেশের (আমেরিকান লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি) প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিংয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। সম্পন্ন করেছেন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি পেশাগত ডিগ্রি। তিনি একজন চার্টার্ড গ্লোবাল ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও দি ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএবি) সম্মানিত ফেলো

শেয়ার বিজ: ক্যারিয়ারের গল্প দিয়ে শুরু করতে চাই

আলা উদ্দিন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করে রহমান রহমান হক চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি ফার্মে আর্টিকেলশিপ করি। এরপর ২০০২ সালে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশে যোগ দিই। ওই প্রতিষ্ঠানে প্রায় ছয় বছর অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফাইন্যান্স বিভাগের কয়েকটি পদে কাজ করি। পরে গ্রামীণফোনে চিফ অ্যাকাউন্ট্যান্ট হিসেবে তিন বছর কাজ করি। এরপর নোভারটিস বাংলাদেশ লিমিটেডে ডিরেক্টর (ফাইন্যান্স অ্যান্ড অ্যাডমিন) হিসেবে দুবছরের বেশি সময় দায়িত্ব পালন করি। ২০১৭ সালে মেটলাইফ বাংলাদেশের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগে রবি আজিয়াটা লিমিটেডে চার বছর করপোরেট ফাইন্যান্স প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করি।

শেয়ার বিজ: পেশা হিসেবে ফাইন্যান্সকে কেন বেছে নিলেন?

আলা উদ্দিন: পারিবারিকভাবে অনেকটা প্রভাবিত হয়েছিলাম চার্টার্ড অ্যাকাউন্টিং (সিএ) পড়তে। আমাদের পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। আমার মেন্টর ছিলেন বড় ভাই। তিনি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হওয়ায় স্কুলে পড়ার সময় থেকেই এ বিষয়ে জানতে পারি। তখন থেকেই চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে পড়ালেখা করি। সিএ শেষ করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নানা দায়িত্ব পালনের পর ফাইন্যান্স পেশায় চলে আসি।

শেয়ার বিজ: প্রতিষ্ঠানে দক্ষ ফাইন্যান্স কর্মকর্তার ভূমিকা গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে চাই

আলা উদ্দিন: দক্ষ ফাইন্যান্স কর্মকর্তার ভূমিকা ও গুরুত্ব অনেক। প্রতিষ্ঠানে ফাইন্যান্স পেশাজীবীর কাজের পরিধি দিন দিন বেড়ে চলেছে। ফাইন্যান্স কতটা শক্তিশালী, ফাইন্যান্স বিভাগের কর্মীরা কতটা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত তার ওপর অনেকাংশে প্রতিষ্ঠানের সফলতা নির্ভর করে। ফাইন্যান্স কর্মকর্তা প্রতিষ্ঠানে ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাই ফাইন্যান্স কর্মকর্তাকে দক্ষ হতে হয়। এ বিভাগ প্রতিষ্ঠানের মেরুদণ্ডের মতো। প্রতিষ্ঠানের সম্পদ সুরক্ষা ও পর্যবেক্ষণসহ পরিকল্পিত লক্ষ্য অর্জনে দৃঢ়তার সঙ্গে কাজ করেন ফাইন্যান্স কর্মকর্তা। এছাড়া তিনি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ আর্থিক নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। একই সঙ্গে ফাইন্যান্স প্ল্যানিং, বাজেটিং ও কস্ট কন্ট্রোলিংয়ের দায়িত্বে থাকেন ফাইন্যান্স কর্মকর্তা। তাছাড়া শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ বিবেচনা করে প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্বও ফাইন্যান্স কর্মকর্তার ওপর বর্তায়।

শেয়ার বিজ: ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট (এফআরএ) প্রতিষ্ঠানের ওপর কেমন প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন?

আলা উদ্দিন: অনেক সমালোচনার পর এফআরএ পাস হয়েছে। কাউন্সিল গঠন হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের ওপর কেমন প্রভাব ফেলবেÑতা বলা মুশকিল। কারণ কেবল আইনের মাধ্যমে সবকিছুর পরিবর্তন সম্ভব নয়। দেশে অনেক আইন রয়েছে, নতুন আইনের চেয়ে বিদ্যমান আইনের সুষ্ঠু ও সঠিক বাস্তবায়ন হলে ইতিবাচক প্রভাব দেখা যেত। এছাড়া আইনের সঠিক বাস্তবায়ন না হলে সুবিধার চেয়ে বরং বিষয়টি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা কিন্তু থেকে যাবে।

শেয়ার বিজ: বাংলাদেশের করনীতিকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

আলা উদ্দিন: করের বিষয়টি এমনভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যা সরকারের জন্য যেমন সুখকর নয়, তেমনি করদাতাদের জন্যও নয়। করপোরেট করের বিষয়টি নিয়ে আরও চিন্তার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে যারা কর দেন, তাদের ওপর বেশি কর চাপিয়ে দেওয়া হয়। আমার মনে হয় এর পুনর্মূল্যায়ন দরকার। ট্যাক্স অ্যাসেসমেন্টের ক্ষেত্রে এনবিআরের ইচ্ছামতো কর নির্ধারণের একটা বিষয় রয়েছে, যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। প্রায়ই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের করা কর দায় হিসাবের সঙ্গে তাদের বড় রকমের মতভেদ থাকে। ফলে তা মামলা পর্যন্ত বর্তায় এবং সর্বশেষ হাইকোর্ট পর্যায়ে নিষ্পত্তি হতে দীর্ঘ কালক্ষেপণ হয়। এতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেশ ঝামেলা পোহাতে হয়। এছাড়া ভ্যাটের বিষয়টি বেশ জটিল, এখানে নতুন আইন হলে বোধ হয় ভালো হবে। সরকারের উচিত, করহার কমিয়ে করের আওতা ও পরিধি বাড়ানো এবং কর ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি আরও সহজ করা। একই সঙ্গে ব্যবসাবান্ধব করনীতির আওতায় আসা ও কর কর্তৃপক্ষকে আরও ইউজার ফ্রেন্ডলি হওয়া উচিত।

শেয়ার বিজ: কর্মক্ষেত্রে ফাইন্যান্স কর্মকর্তার জন্য চ্যালেঞ্জিং বিষয় কী?

আলা উদ্দিন: ফাইন্যান্স কর্মকর্তাকে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো ‘না’ বলা। অনেক ফাইন্যান্সিয়াল কমপ্লায়েন্স মেনে তাকে কাজ করতে হয়, তাই কোনো খরচ কিংবা ফাইন্যান্স ইস্যু নিয়ে কাজ করতে গেলে ‘না’ বলতে হয়। এই ‘না’ বলাটা অনেকে অপছন্দ করেন। একদিকে তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা, অন্যদিকে ফাইন্যান্সিয়াল অবজেকটিভ ঠিক রেখে এগিয়ে যাওয়ার মধ্যে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আরেকটি চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানের অন্য সব বিভাগের কাজ সম্বন্ধে জানতে হয়, অনেক সময় অপ্রিয় সত্য বলতে হয়। এসব কিছু মিলিয়ে সবার সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রেখে ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা চ্যালেঞ্জের।

শেয়ার বিজ: পেশা হিসেবে ফাইন্যান্স কর্মকর্তাকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

আলা উদ্দিন: চ্যালেঞ্জিং ও চমৎকার একটি পেশা ফাইন্যান্স। যতই দিন যাচ্ছে, ততই এ পেশার ভূমিকা ও গুরুত্ব বাড়ছে। তাছাড়া প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা, ফাইন্যান্স ও অন্য বিভাগের কাজ সম্পর্কে দক্ষ ফাইন্যান্স কর্মকর্তা অবগত থাকেন। যে কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানে অনেকে এখন সিএফও বা ফাইন্যান্স থেকে সিইও হচ্ছেন।

শেয়ার বিজ: যারা পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের উদ্দেশে কিছু বলুন

আলা উদ্দিন: আগ্রহীদের স্বাগত জানাই। একই সঙ্গে বলতে চাই, সফলতার কোনো শর্টকাট পথ নেই। ফাইন্যান্সকে বেছে নিতে হলে পেশাগত ডিগ্রি জরুরি। কারণ এটা একটা বিশেষায়িত সেক্টর। আমরা অসুস্থ হলে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিই। একইভাবে পেশাগত ডিগ্রি থাকলে দ্রুত ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নেওয়া যেমন সহজ হয়, তেমনি ফাইন্যান্সের নানা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করা যায়। তাই এ পেশায় আসার আগে পেশাগত ডিগ্রি নেওয়া উচিত।

শেয়ার বিজ: সফল ফাইন্যান্স কর্মকর্তা হতে হলে কী কী গুণ থাকা জরুরি বলে মনে করেন?

আলা উদ্দিন: সফল হতে হলে প্রথমত ব্যবসা বুঝতে হবে। কর্মক্ষেত্রে সবার সঙ্গে ও সব বিভাগের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে কাজ করতে হবে। সততা থাকতে হবে। নতুন আইন-কানুন ও ব্যবসায়িক বিষয়াদির ব্যাপারে আপডেট থাকতে হবে। পরিশ্রমী হতে হবে।