‘সফলতার জন্য দরকার কাজে নিবেদিতপ্রাণ’

একটি প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন বিভাগ-প্রধানের সাফল্যের ওপর নির্ভর করে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও’র সফলতা।  সিইও সফল হলে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা বেশি হয়।  খুশি হন বিনিয়োগকারীরা। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সিইও’র সুনাম। প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও), কোম্পানি সচিব, চিফ কমপ্লায়েন্স অফিসার, চিফ মার্কেটিং অফিসারসহ এইচআর প্রধানরা থাকেন পাদপ্রদীপের আড়ালে। টপ ম্যানেজমেন্টের বড় অংশ হলেও তারা আলোচনার বাইরে থাকতে পছন্দ করেন। অন্তর্মুখী এসব কর্মকর্তা সব সময় কেবল প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকেন। সেসব কর্মকর্তাকে নিয়ে আমাদের নিয়মিত আয়োজন ‘টপ ম্যানেজমেন্ট’। শেয়ার বিজের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এবার ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও কোম্পানি সচিব মো. সরোয়ার কামাল এফসিএস। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. হাসানুজ্জামান পিয়াস

মো. সরোয়ার কামাল এফসিএস ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও কোম্পানি সচিব। অ্যাকাউন্টিংয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষে চার্টার্ড সেক্রেটারির পেশাগত ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। তিনি ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড সেক্রেটারিজ অব বাংলাদেশের (আইসিএসবি) একজন সম্মানিত ফেলো

শেয়ার বিজ: ক্যারিয়ারের গল্প দিয়ে শুরু করতে চাই…

মো. সরোয়ার কামাল: স্থানীয় একটি প্রাইভেট কোম্পানির অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফাইন্যান্স বিভাগে ক্যারিয়ার শুরু করি। কিছুদিন কাজ করার পর জিএসপি ফাইন্যান্স কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেডের কোম্পানি সেক্রেটারি বিভাগে জুনিয়র এক্সিকিউটিভ হিসেবে যোগ দিই। সাড়ে তিন বছর কাজ করার পর ২০১০ সালের আগস্টে ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট (এফএভিপি) ও কোম্পানি সচিব হিসেবে কাজ শুরু করি। সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পদোন্নতি পেয়ে বর্তমানে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্বরত আছি।

শেয়ার বিজ: পেশা হিসেবে কোম্পানি সচিব পেশাকে কেন বেছে নিয়েছিলেন?

সরোয়ার কামাল: পেশা হিসেবে সচিব পদটিকেই যে বেছে নেব এমন পরিকল্পনা ছিল না। ইচ্ছা ছিল ভালো কিছু করতে হবে, ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। আর এজন্য স্নাতকোত্তর শেষে পেশাগত কোর্স জরুরি বলে মনে হয়েছিল। তখন চার্টার্ড সেক্রেটারি কোর্সটি নতুন ও ব্যতিক্রম পেশাগত কোর্স মনে হয়েছিল। তাছাড়া সচিব পেশার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি কমপ্লায়েন্স ও আইনবিষয়ক নানা সেবা দেওয়া সম্ভব। এমন চিন্তা করেই চার্টার্ড সেক্রেটারি পেশাগত কোর্স করি এবং কোম্পানি সচিবকে পেশা হিসেবে বেছে নিই।

শেয়ার বিজ: প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সচিবের সম্পর্ক কেমন?

সরোয়ার কামাল: বলা যায় আত্মিক সম্পর্ক। কোম্পানি সচিব প্রতিষ্ঠানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি পদ। কোম্পানি সচিব একদিকে যেমন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা টিমের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, অন্যদিকে তিনি পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মধ্যে মুখ্য সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করেন। রেগুলেটরি বডিসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার দায়িত্ব কোম্পানি সচিবের। প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোম্পানি সচিবের সম্পর্ক একদিকে যেমন আইন ও বিধান দ্বারা নির্দিষ্ট, ঠিক তেমনি দায়িত্ববোধ হতেও উৎসারিত।

শেয়ার বিজ: প্রতিষ্ঠানে একজন সচিবের ভূমিকা ও গুরুত্ব সম্পর্কে কিছু বলুন।

সরোয়ার কামাল: প্রতিষ্ঠানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন কোম্পানি সচিব। বর্তমানে সারা বিশ্বে করপোরেট গভর্ন্যান্স একটা আলোচিত ইস্যু। সবাই এখন আইনকানুন, করপোরেট গভর্ন্যান্স ও কমপ্লায়েন্স পরিপালনে সচেতন। কোম্পানি সচিব ছাড়া এসব কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটি সঠিকভাবে চলছে কি না, তা দেখভাল করতে হয় তাকে। বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষের স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে কি না, সেটি দেখা সচিবের দায়িত্ব। একটি প্রতিষ্ঠান কমপ্লায়েন্স কমপ্লাই করছে কি না, আইনকানুন পরিপালন করছে কি না সবকিছু কোম্পানি সচিব দেখভাল করেন।

শেয়ার বিজ: কর্মক্ষেত্রে সচিবের জন্য চ্যালেঞ্জিং বিষয় কী?

সরোয়ার কামাল: সব কাজেই চ্যালেঞ্জ রয়েছে। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই এগিয়ে যেতে হয়। তবে হঠাৎ কোনো আইন-কানুন কিংবা কমপ্লায়েন্স এলে তা প্রতিষ্ঠানে বাস্তবায়ন করা অনেক সময় চ্যালেঞ্জের। আমাদের প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তারা আইন-কানুন পরিপালনে সর্বদা সচেষ্ট। এজন্য নতুন আইন বাস্তবায়ন করা তুলনামূলকভাবে সহজ। সচিবকে প্রতিষ্ঠানের শেয়ারহোল্ডার কিংবা স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করতে হয়। একইসঙ্গে সব বিভাগ নিয়ে কাজ করতে হয়, যা সচিবের জন্য ভীষণ চ্যালেঞ্জের।

শেয়ার বিজ: কর্মক্ষেত্রে সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক ধরে রাখতে আপনার মূলমন্ত্র কী?

সরোয়ার কামাল: সুসম্পর্ক ধরে রাখার মূলমন্ত্র হলো ইচ্ছাশক্তি। নিজে যদি সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে চাই। তাহলে দেখা যাবে, সুন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে আপনি যেমন সম্পর্ক ভালো রাখতে চান, অন্যরাও তেমনি আপনার সঙ্গে সুন্দর ব্যবহার করবে। এর মধ্য দিয়ে সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে।

শেয়ার বিজ: কোম্পানি সচিব পেশাকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

সরোয়ার কামাল: খুবই সম্মানজনক পেশা এটি। পদটি প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদ হিসেবে বিবেচিত। কোম্পানি সচিবকে টপ ম্যানেজমেন্ট ও উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কাজ করতে হয়। তাই তার অনেক কিছু শেখার সুযোগ আছে। নিজেকে উন্নত করার সুযোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে তার। আমি এ পেশার জন্য গর্ববোধ করি।

শেয়ার বিজ: যারা এ পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের উদ্দেশে আপনার পরামর্শ?

সরোয়ার কামাল: যারা এ পেশায় আসতে ইচ্ছুক, তাদের স্বাগত জানাই। পেশাটি নিশ্চিতভাবে তাদের ক্যারিয়ারকে অনেক উঁচুতে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে। একাডেমিক পড়ালেখার পাশপাশি পেশাগত কোর্স থাকলে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। কোম্পানি সচিব পেশার জন্য বিশেষ কোর্স হলো চার্টার্ড সেক্রেটারি। এটি সম্পন্ন করা যেতে পারে। দেশে কোম্পানি সচিব তথা চার্টার্ড সেক্রেটারির চাহিদা রয়েছে। দিনদিন কোম্পানির সংখ্যা বাড়ছে, ফলে সচিব পেশার পরিধি ও সুযোগ বাড়বে। পাশাপাশি উন্নত দেশগুলোয় কোম্পানি সচিবের গুরুত্ব সর্বজনস্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত। যারা চ্যালেঞ্জ নিতে পছন্দ করেন, পরিশ্রম করার মানসিকতা রাখেন, প্রতিষ্ঠানকে আইন সেবা দিতে চান, তাদের জন্য এটি একটি আদর্শ পেশা।

শেয়ার বিজ: সফল কোম্পানি সচিব হতে হলে কী কী গুণ থাকা জরুরি বলে মনে করেন?

সরোয়ার কামাল: সফল হতে হলে পেশায় নিবেদিতপ্রাণ হতে হবে, পরিশ্রমী হতে হবে। কঠোর পরিশ্রম আর ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে সাফল্যের স্বর্ণশিখরে পৌঁছানো সম্ভব। জানার আগ্রহ থাকতে হবে। ধৈর্যশীল হতে হবে। নতুন চ্যালেঞ্জ নেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। সততা থাকতে হবে।