‘সফল হতে হলে অবশ্যই ভালো নেতৃত্বদানের গুণাবলি থাকতে হবে’

একটি প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন বিভাগ-প্রধানের সাফল্যের ওপর নির্ভর করে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও’র সাফল্য। সিইও সফল হলে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা বেশি হয়।  খুশি হন শেয়ারহোল্ডাররা। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সিইও’র সুনাম। প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও), কোম্পানি সচিব, চিফ কমপ্লায়েন্স অফিসার, চিফ মার্কেটিং অফিসারসহ এইচআর প্রধানরা থাকেন পাদপ্রদীপের আড়ালে। টপ ম্যানেজমেন্টের বড় অংশ হলেও তারা আলোচনার বাইরে থাকতে পছন্দ করেন। অন্তর্মুখী এসব কর্মকর্তা সব সময় কেবল প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকেন। সেসব কর্মকর্তাকে নিয়ে আমাদের নিয়মিত আয়োজন ‘টপ ম্যানেজমেন্ট’। শেয়ার বিজের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এবার ন্যাশনাল ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক লিমিটেডের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, এফসিএ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. হাসানুজ্জামান পিয়াস

মোহাম্মদ মিজানুর রহমান এফসিএ ন্যাশনাল ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক লিমিটেডের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিংয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। সম্পন্ন করেছেন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি পেশাগত ডিগ্রি। তিনি দি ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএবি) একজন সম্মানিত ফেলো

শেয়ার বিজ: ক্যারিয়ারের গল্প দিয়ে শুরু করতে চাই…

মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, এফসিএ: ক্যারিয়ার শুরু করি ২০০৫ সালে প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফাইন্যান্স বিভাগের প্রধান হিসেবে। ২০১২ সাল পর্যন্ত ওই প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করি। ওই সময়ের মধ্যে সিএফও এবং হেড অব এইচআরএম হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি অ্যাসিসট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট থেকে ভাইস প্রেসিডেন্ট, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও সর্বশেষ এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে পদোন্নতি পাই। প্রাইম ফাইন্যান্সের ২০১০ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন আইসিএবি কর্তৃক বাংলাদেশের সব বার্ষিক প্রতিবেদনের মধ্যে শ্রেষ্ঠ নির্বাচিত হয়। পরবর্তীকালে প্রতিবেদনটি সাফা (সাউথ এশিয়ান ফেডারেশন অব অ্যাকাউন্ট্যান্টস), যা সার্কভুক্ত দেশগুলোর সব বার্ষিক প্রতিবেদনের মধ্যে প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জন করে। ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে এটা আমার পেশাগত উল্লেখযোগ্য অর্জন। এরপর ২০১২ সালে ন্যাশনাল ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক লিমিটেডের সিএফও এবং সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে যোগ দিই। পদোন্নতি পেয়ে বর্তমানে সিএফও এবং সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি।

শেয়ার বিজ: পেশা হিসেবে ফাইন্যান্সকে কেন বেছে নিয়েছিলেন?

মিজানুর রহমান: ফাইন্যান্স বিভাগের প্রতি ভালো লাগা ও ভালোবাসা থেকেই পেশা হিসেবে নেওয়া। আর এর পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রয়েছে আমার বাবার। অবশ্য আমাদের সময়ে যারা ভালো রেজাল্ট করত, তাদের বেশিরভাগই ডাক্তার অথবা ইঞ্জিনিয়ার হতে চাইত। কিন্তু বাবা বিজনেস নিয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করলে কেমন মূল্যায়ন করা হয়, সে সম্পর্কে বলতেন। সুতরাং প্রথম থেকেই অ্যাকাউন্টিং-ফাইন্যান্স বিষয়টি মাথায় ঢুকে যায়। অনেক স্বপ্ন নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিংয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করি। প্রতিষ্ঠানে ফাইন্যান্সের ভূমিকা ও গুরুত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারি। ফাইন্যান্স পেশাতেই ক্যারিয়ার গড়ার জন্য অটুট থাকি। এরপর রহমান রহমান হক (কেপিএমজি) অডিট ফার্ম থেকে সিএ আর্টিকেলশিপ করে স্বল্পসময়ের মধ্যে সিএ সম্পন্ন করি।

শেয়ার বিজ: প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে একজন দক্ষ ফাইন্যান্স কর্মকর্তার ভূমিকা ও গুরুত্ব সম্পর্কে বলুন…

মিজানুর রহমান: প্রধান অর্থ কর্মকর্তা তথা ফাইন্যান্স কর্মকর্তার ভূমিকা ও গুরুত্ব ব্যাপক। প্রতিষ্ঠানে ফাইন্যান্স বিভাগ অনেকটা ছাতার মতো। কারণ অন্য সব বিভাগের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে কাজ করে এ বিভাগটি। প্রতিষ্ঠানের সবকিছু ফাইন্যান্স বিভাগ যেভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারে, তা আর অন্য কোনো বিভাগের পক্ষে সম্ভব নয়। ফাইন্যান্স প্ল্যানিং, বাজেটিং, কস্ট কন্ট্রোল, ইন্টারনাল কন্ট্রোল, নতুন পণ্য ও সেবার কস্ট বেনিফিট পর্যালোচনা প্রভৃতি বিষয় নিয়ে কাজ করা যায়। এছাড়া দেশের অর্থনীতি ও সরকারের অর্থনৈতিক নানা পলিসির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিনিয়োগের ক্ষেত্র নির্ধারণে সাহায্য করা যায়। অর্থাৎ নানা ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাহায্য করা যায়।

শেয়ার বিজ: ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট (এফআরএ) প্রতিষ্ঠানের ওপর কেমন প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন?

মিজানুর রহমান: ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিংয়ের স্বচ্ছতা বাড়ানোর জন্য আইনটি করা হয়েছে। এটা ভালো উদ্যোগ। এর মাধ্যমে অডিটররা জবাবদিহির আওতায় আসবেন। এখন আইনের মাধ্যমে একটা কাউন্সিল গঠন করা হচ্ছে। তারাই বিষয়টি দেখভাল করবে। আইনের সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে বার্ষিক প্রতিবেদনে আরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।

শেয়ার বিজ: বাংলাদেশের ট্যাক্স পলিসিকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

মিজানুর রহমান: ট্যাক্স পলিসি নিয়ে আরও চিন্তার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করি। ট্যাক্স অ্যাসেসমেন্টের ক্ষেত্রে কখনও কখনও বেশ ঝামেলার সৃষ্টি হয়। এছাড়া প্রায়ই কর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মতবিরোধ হয়। কিছু বিষয় রয়েছে যেখানে করদানকারী একভাবে বোঝেন আর কর কর্তৃপক্ষ অন্যভাবে ব্যাখ্যা দিয়ে থাকে, যা বেশ সমস্যার সৃষ্টি করে। তাই আইনটি আরও স্পষ্ট ও সহজ করা দরকার। কর দিতে গিয়ে যেন হয়রানি না হতে হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করা দরকার। একই সঙ্গে করদানের প্রক্রিয়া আরও সহজ করা ও কর কর্তৃপক্ষকে আরও বন্ধুভাবাপন্ন হতে হবে।

শেয়ার বিজ: কর্মক্ষেত্রে ফাইন্যান্স কর্মকর্তার জন্য চ্যালেঞ্জিং বিষয় কী?

মিজানুর রহমান: সব ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এগুলো মোকাবিলা করেই এগিয়ে যেতে হয়। ইন্টারনাল কন্ট্রোল সিস্টেম ঠিক রাখা, ফাইন্যান্সিয়াল কমপ্লায়েন্স কমপ্লাই করা, সময়ের সঙ্গে আইন-কানুন, তথ্যপ্রযুক্তি, ব্যবসার পরিবেশ-পরিস্থিতির পরিবর্তনকে মেনে নিয়ে ব্যবসাকে এগিয়ে নেওয়ার মধ্যেও চ্যালেঞ্জ থাকে। তবে এসব চ্যালেঞ্জকে আমরা উপভোগ করি।

শেয়ার বিজ: পেশা হিসেবে ফাইন্যান্সকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

মিজানুর রহমান: পেশা হিসেবে অনেক আকর্ষণীয় ও ইন্টারেস্টিং। একসময় ভালো ছাত্রছাত্রীরা সাধারণত এ পেশায় ক্যারিয়ারের কথা চিন্তা করতেন না। কিন্তু বর্তমানে সেই ধারা থেকে মানুষ বের হয়ে এসেছে। ফাইন্যান্স পেশা এক বিশেষ স্থান দখল করে নিয়েছে।

শেয়ার বিজ: যারা এ পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের উদ্দেশে আপনার পরামর্শ…

মিজানুর রহমান: তরুণদের স্বাগত জানাই। তবে ফাইন্যান্স বিভাগের কাজের প্রতি ভালোবাসা আছে কিনা, সেটা জেনে-বুঝে আসা উচিত। সৎ, ন্যায়পরায়ণ ও পরিশ্রমের মাধ্যমে এ পেশায় অনেক দূর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।

শেয়ার বিজ: সফল ফাইন্যান্স কর্মকর্তা হতে হলে কী কী গুণ থাকা জরুরি বলে মনে করেন?

মিজানুর রহমান: সফল হওয়ার জন্য সৎ ও পরিশ্রমী হতে হবে। লক্ষ্য থাকতে হবে। সাহসী হতে হবে। সময়ের সঙ্গে আপডেট থাকাটাও জরুরি। সফল হতে হলে অবশ্যই ভালো নেতৃত্বদানের গুণাবলি থাকতে হবে।