সবচেয়ে বড় ভাসমান পেয়ারা হাট

ভারতের কেরালা কিংবা থাইল্যান্ডের ভাসমান বাজারগুলোর অনুরূপ আটঘর-কুরিয়ানা ভাসমান পেয়ারা হাট। এ হাটের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ঝালকাঠির ভীমরুলিও। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর বা বর্ষাকালের শুরু থেকে শরতের মাঝামাঝি পর্যন্ত এ হাটে বেচাকেনার প্রধান পণ্য পেয়ারা।

ঐতিহ্যবাহী এ হাটটি পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলায় অন্তর্গত হলেও বরিশাল ও ঝালকাঠি জেলা শহর থেকে বেশ কাছে। তিন জেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় তিন দিক থেকে তিনটি খাল এসে মিসেছে এক মোহনায়। এ মোহনায় অসংখ্য ছোট নৌকায় পেয়ারা বেচাকেনা চলে। এজন্য এটি ‘ভাসমান হাট’ নামে বেশি পরিচিত। অনেকের মতে, এ হাটটিই দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় ভাসমান হাট।

তিন জেলায় প্রায় শত বছর ধরে বাণিজ্যিকভাবে পেয়ারা চাষ হচ্ছে। জেলাগুলোর ২৬ গ্রামের প্রায় ৩১ হাজার একর জমির ওপর গড়ে উঠেছে ছোট-বড় অনেক পেয়ারা বাগান। বর্তমানে পেয়ারা চাষের সঙ্গে সরাসরি জড়িত প্রায় ২৫ হাজার পরিবার।

নদীবেষ্টিত এ অঞ্চলে রয়েছে অনেক খাল ও নদী। তাই এসব খাল বা নদীকে কেন্দ্র করে আটঘর, কুরিয়ানা ও ভীমরুলিতে বছরের পর বছর ধরে এসব ভাসমান হাট গড়ে উঠেছে বলে জানান স্থানীয়রা। সঙ্গত কারণে পণ্য পরিবহন কিংবা বিক্রির জন্য নানা ধরনের নৌযানই প্রধান মাধ্যম।

আড়তদারদের বড় নৌকা বা ট্রলার নদী-খালে ঢুকলেই শুরু হয়ে যায় ভাসমান হাটের দৈনন্দিন কার্যক্রম। বড় নৌকাকে কেন্দ্র করে চাষিদের পেয়ারা বোঝাই ডিঙিনৌকাগুলো ভিড় করে। অবশ্য সূর্যোদয়ের আগেই চাষিরা পেয়ারা বাগান থেকে পেয়ারা সংগ্রহ করেন। এরপর তুলনামূলক ছোট নৌকাযোগে তারা হাটে নিয়ে আসেন পেয়ারা। পাইকাররা সেসব কিনে ট্রলারে করে নিয়ে যান দেশের বিভিন্ন স্থানে। ভাসমান এ হাটগুলোয় পেয়ারার পাশাপাশি পান-সুপারি, আমড়া, কাঁচাকলা, পেঁপে প্রভৃতি পণ্যের পসরা নিয়ে সাজিয়ে বসেন বিক্রেতারা। অনেক ক্রেতা নৌকায় বসেই কেনাকাটা করেন। চমৎকার দৃশ্যের সৃষ্টি হয় তখন। এসব দেখতে জুলাই থেকে আগস্ট পর্যন্ত পর্যটকদের ভিড় লেগেই থাকে।

প্রতিবছরের মতো এবারও এসব এলাকায় পেয়ারার বাম্পার ফলন হয়েছে। ভরা মৌসুমে এখন চাষিরা পেয়ারা সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

কথা হয় ফরিদপুর থেকে আটঘর পেয়ারা বাগান ও ভাসমান হাট দেখতে আসা আরিফুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এখানকার পেয়ারা সম্পূর্ণ কেমিক্যালমুক্ত। খেতে সুস্বাদু। নদী-খালের পাশে বড় আকারের বাগানগুলো দেখতে বেশ ভালো লাগছে। আর গাছ থেকে সরাসরি পেয়ারা পেড়ে খাওয়ার অনুভূতিই অন্যরকম।’

কয়েকজন চাষির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিবছরই পেয়ারার বাম্পার ফলন হয়। তবে ন্যায্য দাম পান না তারা। মধ্যস্বত্বভোগীরাই লাভবান হন। অনেক সময় চাষিরা পানির দামে পাইকারদের কাছে পেয়ারা বিক্রি করেন। এ প্রসঙ্গে কুরিয়ানার চাষি সঞ্জয় মণ্ডল বলেন, মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে পেয়ারার চাষ করেছি। কিন্তু স্থানীয় বাজারে তুলনামূলক কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। আমরা অনেকেই মহাজনদের কাছে পেয়ারা বিক্রি করি। তারা দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পাইকারদের কাছে বিক্রি করেন। এতে মধ্যস্বত্বভোগী মহাজন ও পাইকাররাই বেশি লাভবান হচ্ছেন।

হাটবার

আটঘর, কুরিয়ানা ও ভীমরুলির ভাসমান পেয়ারার হাটের অবস্থান পাশাপাশি। একই ধরনের হাট হলেও সময়সূচি ভিন্ন।

কুরিয়ানা হাট: পিরোজপুর জেলার নেছারাবাদ উপজেলায় হাটটি অবস্থিত। আশেপাশের সব গ্রামেই পেয়ারা বাগান রয়েছে। বাগান থেকে চাষিরা নৌকায় করে সরাসরি হাটে পেয়ারা নিয়ে আসেন। প্রতিদিন বসে এই হাট।

আটঘর হাট: পিরোজপুরের আটঘরে সোম ও শুক্রবার এই হাট বসে। হাটটি আকারে বেশ বড়। কুরিয়ানা থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান।

ভীমরুলি হাট: ঝালকাঠি শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে ভীমরুলি গ্রামের ছোট্ট খালজুড়ে সারা বছরই বসে এই ভাসমান হাট। পেয়ারার মৌসুমে জমজমাট হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

পর্যটকদের ভিড়ে মুখর

খাল, নদী ও সবুজ বাগান এ তিনে মিলে অপরূপ। নদী ও খালের সৌন্দর্য ভীষণ মনোমুগ্ধকর। একই সঙ্গে সবুজ ফলের বাগান যে কোনো মানুষের চোখ জুড়িয়ে দেয়। সঙ্গত কারণে মুগ্ধ বেড়াতে আসা দর্শনার্থীও। তাই ভাসমান হাটগুলোয় ক্রেতা-বিক্রেতার পাশাপাশি পর্যটক ও প্রকৃতিপ্রেমীদের ভিড় লেগে থাকে বছরজুড়ে। পেয়ারার মৌসুমে তুলনামূলক বেশি ভিড় লক্ষ্য করা যায়। অনেকে পিকনিক স্পট হিসেবেও ব্যবহার করেন এলাকাটি।

পর্যটকদের আকর্ষণের জন্য কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ডিঙিনৌকা ও ইঞ্জিনচালিত ট্রলার। এখানে ঘুরে বেড়ানোর জন্য এগুলো বেশ চমৎকার মাধ্যম। তবে থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই। ভাসমান হাট ঘিরে পর্যটককেন্দ্র গড়ে তোলার পদক্ষেপ নেওয়া হলে এটি দেশের পাশাপাশি বিদেশেও জনপ্রিয় হয়ে উঠবে বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

Pojotoভাসমান হাটে ঘুরে বেড়ানোর সময় কথা

হয় স্থানীয় প্রবীণ পেয়ারা ব্যবসায়ী সন্তোষ কুমারের সঙ্গে। অতীতের তুলনায় এখন পর্যটকদের ভিড় বেড়েছেÑএমনই দাবি তার। বিশেষ করে শুক্র ও শনিবার ছুটির দিনে সমাজের নানা শ্রেণির মানুষের ভিড় বেড়ে যায়। পর্যটকদের চাহিদা পূরণে স্থানীয় অনেকেই ইঞ্জিনচালিত নৌকা চালু করেছেন। অনেকে খাবারের দোকানও বসিয়েছেন।

হাট দেখতে আসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মাহবুবুল আলম বলেন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা এ নৌপথে ঘুরতে হলে বৈঠার নৌকাই ভালো। এখানকার প্রকৃতি অপরূপ। স্থানীয়রা বেশ আন্তরিক। তিনি আরও জানান, অনেক দূর থেকে এসে জানতে পারলেন এখানে থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই। থাকতে হবে স্বরূপকাঠি, ঝালকাঠি কিংবা বরিশাল গিয়ে। এখানে থাকতে পারলে ঘোরাঘুরিটা আরও ভালো হতো।

যেভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে বরিশালে নদী ও সড়কপথে যাওয়া যায়। রাজধানীর সদরঘাট থেকে অনেক লঞ্চ ছেড়ে যায় বরিশাল কিংবা পিরোজপুরের হুলারহাটের উদ্দেশে। সড়কপথে সায়দাবাদ ও গাবতলী থেকে বেশ কয়েকটি পরিবহনের এসি-ননএসি বাস চলাচল করে ঝালকাঠি রুটে। হ