প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

সবুজ অর্থায়ন কার্যক্রমে ধীরগতি

শেখ শাফায়াত হোসেন: ২০১৮ সালের শেষ দিকে ব্যাংক ও ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর (এনবিএফআই) সবুজ অর্থায়ন কার্যক্রমে ধীরগতি নেমে আসে। সবুজ অর্থায়নসংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্টের হালনাগাদ ত্রৈমাসিক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
এতে বলা হয়, গত অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের তুলনায় সবুজ অর্থায়ন কার্যক্রম আট দশমিক ১৩ শতাংশ কমে যায়। গত অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মেনে পরিবেশবান্ধব বিভিন্ন প্রকল্পে তিন হাজার ১৯৪ কোটি ৬৭ লাখ টাকার ঋণ মঞ্জুর করেছে। বিতরণ করে দুই হাজার ৩৭২ কোটি টাকা। যেখানে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সামগ্রিক ঋণ মঞ্জুরি ছিল দুই লাখ ৫১ হাজার ৬৬৮ কোটি ৩৭ লাখ টাকা এবং সামগ্রিক বিতরণ ছিল দুই লাখ ৪৪ হাজার ৩৬৩ কোটি ৯৪ লাখ টাকা।
সেদিক দিয়ে আলোচ্য প্রান্তিকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট ফান্ডেড ঋণ মঞ্জুরির এক দশমিক ২৭ শতাংশ এবং বিতরণের শূন্য দশমিক ৯৭ শতাংশ ছিল সবুজ অর্থায়নে। যদিও ২০১৬ সাল থেকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ফান্ডেড ঋণের অন্তত পাঁচ শতাংশ সবুজ অর্থায়ন করার একটি লক্ষ্য নির্ধারণের নির্দেশনা দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ করা ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ডিসেম্বর ত্রৈমাসিকে ৫৮টি ব্যাংকের মধ্যে ৩৮টি ব্যাংক এবং ৩৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১১টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান সবুজ অর্থায়ন কার্যক্রমে অংশ নিয়েছে।
সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্টের মহাব্যবস্থাপক খন্দকার মোরশেদ মিল্লাত শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আগে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যখন সবুজ অর্থায়নসংক্রান্ত প্রতিবেদন দাখিল করত তখন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ দুই ধরনের সবুজ অর্থায়নের প্রতিবেদন পেশ করত। এখন একেবারে নির্দিষ্ট, অর্থাৎ আট শ্রেণির ৫২টি সবুজ পণ্যে এবং বেশকিছু সবুজ উদ্যোগে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থায়নের প্রতিবেদন করছে। প্রতিবেদনে তথ্যের সংমিশ্রণ কমে যাওয়ায় গত ডিসেম্বর প্রান্তিকে সবুজ অর্থায়ন কমতে পারে। তাছাড়া বছরের শেষ দিকে ব্যাংকগুলোর স্থিতিপত্র ভালো দেখানোর জন্যও অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকের ঋণ বিতরণের তুলনায় আদায়ে ঝোঁক থাকে।’ এই দুটি কারণে আলোচ্য প্রান্তিকে সবুজ অর্থায়ন কার্যক্রমে নিন্ম গতি এসেছে বলে মনে করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই মহাব্যবস্থাপক। আগামী মার্চ প্রান্তিকে এই কার্যক্রম নিশ্চিতভাবে বাড়তির ধারায় থাকবে বলে আশা করছেন তিনি।
২০১৮ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সবুজ অর্থায়নের আওতায় ঋণ বিতরণ ছিল দুই হাজার ৫৮২ কোটি টাকা।
তবে আলোচ্য প্রান্তিকে সবুজ অর্থায়ন কার্যক্রম কিছুটা কমলেও জলবায়ু ঝুঁকি তহবিলের ব্যবহার বেড়েছে। ব্যাংকগুলো এই তহবিলের দুই কোটি ৩৬ লাখ টাকা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় পাঁচ কোটি টাকা অনুদান ও হৃাসকৃত হার সুদের ঋণ হিসেবে ব্যবহার করেছে। এ সময় ৪১টি ব্যাংক ও ১৮টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ডিসেম্বর প্রান্তিকে পরিবেশবান্ধব ঝুঁকি মান নির্ণয় সম্পন্ন করেছে।
প্রতিবেদনের তথ্যমতে, একটি ছাড়া সব ব্যাংক নিজস্ব সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স ইউনিট গঠনের পাশাপাশি ‘গ্রিন ব্যাংকিং পলিসি গাইডলাইন’ প্রণয়ন করেছে। এছাড়া একটি ছাড়া সব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ‘গ্রিন ব্যাংকিং পলিসি গাইডলাইন’ রয়েছে।
সৌরশক্তি, বায়োগ্যাস প্রকল্প ও শিল্প-বর্জ্য শোধনাগার প্রকল্পের (ইটিপি) মতো পরিবেশবান্ধব পণ্যে অর্থায়নের দিগন্ত প্রসারিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০০৯ সালে এ খাতের জন্য নিজস্ব তহবিল থেকে ২০০ কোটি টাকার একটি ঘূর্ণায়মান পুনঃঅর্থায়ন স্কিম চালু করে। ঘূর্ণায়মান ওই তহবিল থেকে এ পর্যন্ত ৪০১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা ঋণ হিসেবে বিতরণ করে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। এর মধ্যে গত ডিসেম্বর ত্রৈমাসিকে বিতরণ করা হয় ২০ কোটি ১৩ লাখ টাকা। ৩৬টি ব্যাংক ও ২২টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ওই তহবিলের ঋণ বিতরণের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে অংশগ্রহণমূলক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। শুরুতে গ্রিন ব্যাংকিং অ্যান্ড সিএসআর ডিপার্টমেন্ট থেকে এ-সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালিত হলেও পরে বিভাগটির নাম পরিবর্তন করে সাসটেইনেইবল ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্ট করা হয়।
তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, গত অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সবুজ অর্থায়ন কার্যক্রমে সবচেয়ে বেশি ঋণ বিতরণ করেছে বেসরকারি ব্যাংকগুলো। এই ব্যাংকগুলো বিতরণ করেছে দুুই হাজার ৭০ কোটি ৫১ লাখ টাকা। রাষ্ট্রীয় মালিকানার ব্যাংকগুলো সবুজ অর্থায়ন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ২৯ কোটি ১৮ লাখ টাকার ঋণ বিতরণ করেছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিতরণ করেছে ২৬৩ কোটি টাকা। বিশেষায়িত ও বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোসহ সব ব্যাংক এ খাতে দুই হাজার ৩৭২ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছে।
এই অর্থায়নের মধ্যে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সবুজ অর্থায়নের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থায়ন রয়েছে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতে ৮১১ কোটি ৬২ লাখ টাকা। এরপর সবুজ ইট প্রস্তুত খাতে ৫৯৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এরপর পুনরুৎপাদন ও পুনরুৎপাদনযোগ্য পণ্যে ৩৭৪ কোটি টাকা, সবুজ বিনির্মাণে ২৬৬ কোটি ৩২ লাখ টাকা, জ্বালানি সক্ষমতা খাতে ৭০ কোটি টাকা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ৬১ কোটি ৬২ লাখ টাকা অর্থায়ন করে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো।
ব্যাংক ও আার্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরে পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনা নিয়েও ওই প্রতিবেদনে কিছু তথ্য দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ১০ হাজার ৫৩০টি শাখার মধ্যে ৫৭৭টি শাখায় সৌরবিদ্যুৎ রয়েছে। ছয় হাজার ৭৭৬টি এটিএম বুথের মধ্যে ৯২টি এটিএম বুথ সৌরবিদ্যুতে চলে। তবে ১৬ হাজার ৮১৮টি এজেন্ট আউটলেটের মধ্যে পাঁচটি আউটলেট সৌরবিদ্যুতে চলে।
পুনরর্থায়ন স্কিম ছাড়াও এডিবির সহায়তায় ইটভাটার সক্ষমতা বাড়ানোর আলাদা একটি প্রকল্প, শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকগুলোর জন্য একটি পুনরর্থায়ন স্কিম এবং গ্রিন ট্রান্সমিশন ফান্ড নামে আলাদা একটি তহবিল থেকে সবুজ অর্থায়নে সমর্থন দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সর্বশেষ..