সবুজ ব্যাংকিং কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশ অনেক দেশের চেয়ে এগিয়ে

তানিম আসজাদ: পরিবেশবান্ধব অর্থায়ন নিয়ে আলাপ-আলোচনা এখন আর নতুন কোনো বিষয় নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা, পরিবেশ দূষণ কমানো ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য বিশ্বজুড়ে যেসব প্রচেষ্টা চলছে, তারই একটি অংশ হলো পরিবেশবান্ধব অর্থায়ন। অর্থাৎ প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর নয় কিংবা তুলনামূলক কম ক্ষতিকর এমন সব বাণিজ্যিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রধানত ঋণ আকারে অর্থ জোগান দেওয়া। সাধারণভাবে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানই যাবতীয় বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে ঋণের মূল জোগানদাতা। সে কারণে পরিবেশবান্ধব অর্থায়নের সঙ্গে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

বাংলাদেশে পরিবেশবান্ধব ব্যাংকিং ধারণাটি আনুষ্ঠানিকভাবে ২০১১ সালে প্রবর্তন করা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক তখন থেকেই বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে বহুমুখী টেকসই ব্যাংক খাতে দিকনির্দেশনা প্রদান শুরু করে। ওই বছর জানুয়ারি মাসে দেশের সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক পরিবেশ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার নীতিমালা জারি করে, যা দেশে পরিবেশবান্ধব ব্যাংকিংবিষয়ক প্রথম নীতি নির্দেশনা। এরপর থেকে গত সাত বছরে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের নির্দেশনা ও পরামর্শ জারি করা হয়েছে পরিবেশবান্ধব ব্যাংকিংকে উৎসাহিত ও সম্প্রসারিত করার জন্য।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিবেশবান্ধব ব্যাংকিং-সংক্রান্ত কার্যক্রমগুলোকে চারটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে: নীতিনির্ধারণী উদ্যোগ, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবেশবান্ধব ব্যাংকিং কার্যক্রমের পরিবীক্ষণ, বিভিন্ন ধরনের পরিবেশবান্ধব পণ্য ও সেবা খাতের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব পরিবেশ ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত কার্যাবলি। এ চারটি কাজের মধ্যে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবেশবান্ধব ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিবীক্ষণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এটি এজন্য যে নীতি যা-ই থাকুক, তা বাস্তবে তখনই অর্থবহ হবে যখন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সক্রিয়ভাবে পরিবেশবান্ধব বা সবুজ অর্থায়ন বাড়াবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ উপাত্ত থেকে দেখা যায়, গত বছর বা ২০১৭ সালে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো মোট ১৭ হাজার ৩৮০ কোটি টাকার সমপরিমাণ সবুজ অর্থায়ন করেছে, যার মধ্যে প্রত্যক্ষ সবুজ অর্থায়ন মাত্র এক হাজার ৩৫৩ কোটি টাকা। বাকি ১৬ হাজার ২৭ কোটি টাকা পরোক্ষ সবুজ অর্থায়ন হয়েছে। এর মানে হলো, পরিবেশবান্ধব মোট অর্থায়নের প্রায় আট শতাংশ গত বছর সরাসরি পরিবেশবান্ধব বিভিন্ন প্রকল্পে গিয়েছে। ২০১৬ সালে এই হার ছিল সাড়ে আট শতাংশ, যদিও টাকার অঙ্কে তা কিছুটা কমÑএক হাজার ১৯৬ কোটি টাকা। তার মানে, সরাসরি পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে অর্থায়নের হিস্যা তুলনামূলক কমেছে।

কোনো খাতে বা কোনো ধরনের প্রকল্পে অর্থায়ন করা হলে তা সরাসরি পরিবেশবান্ধব বিবেচনা করা হয়, তা একবার দেখে নেওয়া যাক। বাংলাদেশ ব্যাংক এরকম ১১টি খাত নির্ধারণ করেছে। এগুলো হলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি দক্ষতা, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিকল্প জ্বালানি, আগুনে পোড়ানো ইট, নন-ফায়ার ব্লক ব্রিক, পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতযোগ্য পণ্য, গ্রিন ইন্ডাস্ট্রি, কারখানার কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং বিবিধ। এ থেকেই বোঝা যায় যে প্রত্যক্ষ সবুজ অর্থায়নের পরিধিটা বেশ বড়। এসব খাতের মধ্যে তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতে প্রত্যক্ষ সবুজ অর্থায়নের প্রায় অর্ধেকটাই চলে গিয়েছে। এরপর আছে আগুনে পোড়ানো ইট (১৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ) ও গ্রিন ইন্ডাস্ট্রি বা সবুজ কারখানা (১৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ) খাতদ্বয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অবশ্য এও জানাচ্ছে, উল্লিখিত ১১টি খাতের মধ্যে ৫০টির বেশি পণ্য ও সেবা রয়েছে। কিন্তু এর হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এটি স্পষ্ট নয় যে, পরোক্ষ সবুজ অর্থায়ন বলতে কী বোঝানো হচ্ছে বা কোন ধরনের অর্থায়নকে পরোক্ষ পরিবেশবান্ধব অর্থায়ন বিবেচনা করা হচ্ছে। অথচ পরোক্ষভাবে পরিবেশবান্ধব প্রকল্প বা কর্মসূচিতে অর্থায়নের ক্ষেত্রে নানা ধরনের অস্বচ্ছতা ও অনিয়মের সুযোগ থেকে যায়। এসব পরোক্ষ প্রকল্প কতটা ফলপ্রসূ সে প্রশ্নও ওঠে। কাজেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দিক থেকে পরোক্ষ সবুজ অর্থায়নের বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। যেহেতু মোট পরোক্ষ সবুজ অর্থায়নের একটি হিসাব পাওয়াই যাচ্ছে, সেহেতু এর খাতভিত্তিক অর্থায়ন সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ না করার কোনো কারণ নেই।

পরিবেশবান্ধব অর্থায়নের ক্ষেত্রে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এগিয়ে আছে। মোট সবুজ অর্থায়নের প্রায় ৮০ শতাংশ এসেছে এসব ব্যাংক থেকে। এটাই স্বাভাবিক। কেননা, ৪০টি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক দেশে ব্যবসা করছে এবং আর্থিক খাতের সিংহভাগই তাদের নিয়ন্ত্রণে। বিদেশি ৯টি বাণিজ্যিক ব্যাংক মিলে মোট সবুজ অর্থায়নের ১৮ শতাংশ জোগান দিয়েছে। বাকি দুই শতাংশের মধ্যে দেড় শতাংশই এসেছে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে, যদিও ৩৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগই কোনো সবুজ অর্থায়ন করে না। রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো নামমাত্র সবুজ অর্থায়ন করছে। এমনিতেই এসব ব্যাংকঋণ নিয়ে নানা অনিয়মে জড়িত। পরিবেশবান্ধব অর্থায়নের নামে এসব ব্যাংক থেকে অর্থ লোপাটের পথ সুগম হওয়ারই সম্ভাবনা বেশি।

সবুজ ব্যাংকিংয়ের একটি উপাদান হলো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজেদের পরিবেশবান্ধব কার্যালয় ব্যবস্থাপনা। ২০১৭ সাল শেষে দেশের ৫৭টি ব্যাংকের ১০ হাজার ৩৯টি শাখার মধ্যে মাত্র ৫৩৩টি শাখা সৌরবিদ্যুৎ চালিত। ২০১৬ সাল শেষে এই সংখ্যা ছিল ৫২২। তার মানে এক বছরে মাত্র ১১টি নতুন শাখা সৌরবিদ্যুৎচালিত হয়েছে। অন্যদিকে ৩৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র দুটি সৌরবিদ্যুৎচালিত, যা কিনা ২০১৬ সালে ছিল তিনটি। আবার সৌরবিদ্যুৎচালিত অটোমেটেড টেলার মেশিন (এটিএম) বুথ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (এসএমই) ইউনিটের সংখ্যাও খুব বেশি নয়, মাত্র ২১৭টি। এগুলোতে সারা দেশে ১০ হাজার ১৩৫টি এটিএম বুথ রয়েছে। বোঝাই যায়, সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে ব্যাংকের শাখা চালানোর বিষয়ে আগ্রহ খুব জোরালো নয়। তবে এটাও ঠিক যে দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় বিকল্প উৎস হিসেবে সৌরবিদ্যুতের প্রতি আগ্রহ অনেকটাই ম্রিয়মাণ হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সবুজ ব্যাংকিংয়ের আরেকটি উপাদান হিসেবে অনলাইন, ইন্টারনেট ও মোবাইল ব্যাংকিংকে বিবেচনা করে থাকে। এর পেছনে যুক্তি হলোÑএগুলোয় কোনো কাগজের ব্যবহার নেই বললেই চলে। গত বছর শেষে দেশে বিভিন্ন ব্যাংকের মোট সাত হাজার ৯৬৫টি শাখা অনলাইনের আওতায় চলে এসেছে, যা কিনা মোট শাখার প্রায় ৮০ শতাংশ। এটি বেশ সন্তোষজনক অগ্রগতি। তবে এই সময়কালে মোট ১০ কোটি ব্যাংক হিসাবধারীর মধ্যে মাত্র তিন শতাংশ ইন্টারনেট ব্যাংক হিসাবের সুবিধা পেয়েছে। অবশ্য মোবাইল ব্যাংকিং সুবিধা পাচ্ছে প্রায় ২০ শতাংশ। আগামী দিনে এদিকে দ্রুত অগ্রগতি হবে বলে আশা করা যায়।

বস্তুত সবুজ অর্থায়নের বিষয়টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যগুলোর (এসডিজি’স) সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পৃক্ত। এসডিজি’স-এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্যই হলো পরিবেশবান্ধব সবুজ পৃথিবী। সুবজ পৃথিবী ও সবুজ দেশের জন্য সবুজ অর্থায়ন যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। সবুজ ব্যাংকিং কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের অনেক দেশের চেয়েই এগিয়ে আছে। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি বছর মাত্র এ বিষয়ে গাইডলাইন বা নির্দেশিকা জারি করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সবুজ ব্যাংকিং বিষয়ে সক্রিয়তা এশিয়ার বিভিন্ন দেশকে উৎসাহিত করেছে।

তবে সবুজ অর্থায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিহিত রয়েছে বিদ্যমান আর্থ-সামাজিক কাঠামোর মধ্যে। বিশেষ করে দেশজুড়ে যখন উন্নয়নের নামে নানা ধরনের ভাঙচুর আর নির্মাণ চলছে, তখন সবুজ অর্থায়ন ও পরিবেশবান্ধব কর্মকাণ্ডকে অগ্রাধিকারের তালিকায় রাখা হচ্ছে না। রাস্তা নির্মাণ বা প্রশস্ত করতে হলে গাছ কাটতে হবে, কারখানার জন্য বন-জঙ্গল উজাড় করে দিতে হবে, তাপবিদ্যুতের জন্য সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য হুমকিতে ফেলতে হবে, অবকাঠামো নির্মাণের জন্য নদী দখল ও ভরাট করতে হবে এই ধরনের উন্নয়নযজ্ঞ আর যা-ই হোক দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না, মানুষের বৃহত্তর কল্যাণে আসতে পারে না। যৌক্তিক প্রয়োজনে গাছ কাটার যেমন বিকল্প নেই, তেমনই সম্ভাব্য সবক্ষেত্রেই সবুজায়নের প্রয়াসটা অব্যাহত রাখতে হবে। শিল্প-কারখানা থেকে বিভিন্ন নির্মাণকাজে যতটুকু সম্ভব, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, উপাদান ও কৌশল ব্যবহারের চেষ্টা জরুরি। সেক্ষেত্রে সবুজ অর্থায়ন হবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

 

অর্থনৈতিক সাংবাদিক