সব ধরনের কোটা যৌক্তিক পর্যায়ে থাকা প্রয়োজন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. এসএমএ ফায়েজ। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৬তম উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান হিসেবে ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এছাড়া নিজের অনুষদের ডিন, শিক্ষক সমিতির সভাপতি, ফেডারেশন অব বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে বেসরকারি স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। অধ্যাপক ফায়েজ ১৯৬৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এমএস ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭৩ সালে যুক্তরাজ্যের অ্যাবারডিন ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। একই বছর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৮৬ সালে অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন।  ডাকসু নির্বাচন, কোটা সংস্কার আন্দোলন, প্রশ্ন ফাঁস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিষয়সহ চলমান বিভিন্ন ইস্যুতে সম্প্রতি কথা বলেছেন দৈনিক শেয়ার বিজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তৌহিদুর রহমান

শেয়ার বিজ: বর্তমানে দেশব্যাপী হাজার হাজার চাকরিপ্রত্যাশী সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করছেন এটাকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

অধ্যাপক . এসএমএ ফায়েজ: আমরা এখন অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক একটি বিশ্বে বাস করছি। অবশ্যই এখানে সবকিছুকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা হয়। সেখানে মেধাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মেধার স্বীকৃতির মাধ্যমেই টিকে থাকার প্রতিযোগিতায় একজন যথাযথভাবে নিজেকে প্রস্তুত করতে পারে। এখানে সবক্ষেত্রে মেধা সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পাবে, এটিই প্রত্যাশা। অন্যথায় আমরা বহির্বিশ্বের সঙ্গে তুলনা করলে দিন দিন পিছিয়ে পড়ব। এটি একটা নতুন ডাইমেনশন (আঙ্গিক )।

আরেকটি ডাইমেনশন হচ্ছে অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার মাধ্যমে বহু রক্তের বিনিময়ে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। তখন যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন, বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা অবশ্যই প্রয়োজন ছিল। সে কারণে সব ধরনের সরকারি চাকরি ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা প্রচলিত ছিল। এটা অবশ্যই যথার্থ ছিল। তবে সময় যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চাকরির যোগ্যতার ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের বয়সসীমা পার হয়ে যায়। এতে অনেক মুক্তিযোদ্ধার কোটা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছিল না, বিশেষ করে আমি যখন পিএসসিতে ছিলাম, সে সময়ে। মুক্তিযোদ্ধাদের যে সংখ্যাটা কোটায় পূরণ করা সম্ভব হতো না সেগুলোকে আমরা মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দিতাম।

পরবর্তী সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের বয়সসীমা পার হয়ে যাওয়ায় তাদের সন্তানদের দ্বারা এ কোটা পূরণের বিষয়টি উঠে আসে। পিএসসির তখনকার ‘ফুল কমিশনে (ঋঁষষ ঈড়সসরংংরড়হ)’ বিশদভাবে বিষয়টি আলোচনা হয়। সেখানে বেশ কিছু বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করা হয়েছিল। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে পত্রপত্রিকায় লেখালেখি চলছিল। একজন ভুয়া সনদধারীও চাকরি পাওয়ার চেষ্টা করছে কিনা, সে বিষয়টিও উঠে এসেছিল। এমনও লক্ষ করা গিয়েছিল, অনেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েও সনদ নেননি বা কোটা সুবিধা নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেননি। এরকম পরিস্থিতিতে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হয়তো নিজেও সুবিধা ভোগ করেছে, আবার তার সন্তানও সুবিধা পেল। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ও তার সন্তান বঞ্চিত হয়েছেন।

মোট কথা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত তালিকা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে কথা উঠেছে। এছাড়া দেশ স্বাধীন হওয়ার এত দিন পরে ও অদূর ভবিষ্যৎকে সামনে রেখে আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের দুই ভাগে বিভক্ত করা কতটুকু সমীচীন হবে, এ বিষয়টির ওপরও সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করা হয়েছিল। সরকারি চাকরিপ্রত্যাশীরা এখন দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে প্ল্যাকার্ড হাতে সভা-সমাবেশ করছে। আরেকটি বিষয় ছিল, একজন হয়তো অত্যন্ত মেধাবী কিন্তু তার পিতা বা দাদা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না বলে বঞ্চিত হচ্ছেন। অথচ সেও তো দেশকে অত্যন্ত ভালোবাসে। এও তো সত্য, যে যারা স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিল তাদের বাদ দিয়ে এ দেশের সবাই কোনো না কোনোভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছিলের। তবে এও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, যারা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন বা পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেনÑতাদের সন্তানদের জন্য একটি নির্দিষ্ট কোটা এখনও থাকার প্রয়োজন আছে।

শেয়ার বিজ: মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ সরকারি চাকরিতে মোট ২৫৮ ধরনের কোটা রয়েছে সাধারণ চাকরিপ্রত্যাশীরা এটা সংস্কারের দাবি জানাচ্ছেন….

অধ্যাপক . এসএমএ ফায়েজ: এ ক্ষেত্রে আমরা নারী কোটার কথা বলতে পারি। এটি একটু ভিন্ন ধরনের কোটা। যদিও চাকরির ক্ষেত্রে এখন নারীরা খুব বেশি পিছিয়ে নেই। বিভিন্ন ক্ষেত্রে তারা অপেক্ষাকৃত বেশি মেধাবী বলে প্রমাণ রাখতে পারছে। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা করার সময় বা পিএসসির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিষয়টি উপলব্ধি করেছি। আমি লক্ষ করেছি, অনেক মেয়ে কোটার মাধ্যমে নিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ না করে মেধাকে প্রাধান্য দিয়েছে। তারপরও লক্ষণীয় যে, দেশের নারী জনসংখ্যার তুলনায় চাকরি ক্ষেত্রে তাদের সংখ্যা এখনও অনেক কম। এজন্য আমি মনে করি, নারীদের জন্য নির্দিষ্ট কোটা এখনও থাকতে পারে। একইভাবে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধীদের জন্য কোটার প্রয়োজনের বিষয়ে দ্বিমত করার সুযোগ নেই।

জেলা কোটার বিষয়টি এখানে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা প্রয়োজন। দুটি দৃষ্টিভঙ্গি এখানে বিশেষভাবে কাজ করবে। একটি হলো ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী হিসেবে মেট্রোপলিটন সিটির রূপ ধারণ করেছে। যেখানে সব জেলার অধিবাসীরা বিভিন্নভাবে অংশগ্রহণ করছে। একইসঙ্গে যাতায়াতের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির কারণে যে জেলাগুলো আগে অনগ্রসর বিবেচনা করা হতো, সেগুলো এখন আর অনগ্রসর নয়। সুতরাং জেলা কোটার প্রয়োজনীয়তা এখন আর আছে বলে অনেকেই মনে করে না। তবে হিলট্র্যাক্টস বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কথা ভিন্ন। তারা এখনও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী।

তবে সব ক্ষেত্রেই কোটা একটি যৌক্তিক পর্যায়ে থাকা একান্ত প্রয়োজন, যাতে মেধার গুরুত্ব স্বীকৃতি পাওয়া থেকে বঞ্চিত না হয়। আমাদের অনেক কিছু নির্ভর করে সন্তানরা কতটুকু মেধাবী তার ওপর। সুতরাং মেধার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি ও মেধার বিকাশের সুযোগ প্রদানে সব ধরনের ব্যবস্থাই থাকা উচিত। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে যারা দেশ পরিচালনায় বিভিন্ন ধরনের ভূমিকা পালন করবে, তারা যদি সবচেয়ে মেধাবী হয়ে থাকে, তাহলে দেশই সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে। আমাদের দেশকে উত্তরোত্তর উন্নয়নের পথে নিয়ে যাওয়া স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল।

শেয়ার বিজ: বিশ্ব বাণিজ্যসহ নানা ক্ষেত্রে এখন নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে ফলে অর্থনৈতিক কূটনীতির গুরুত্ব বাড়ছে পাশাপাশি বাংলাদেশ ২০২৪ সালে এলডিসি থেকে বেরিয়ে যাবে এবং ২০৩০ সালে জাতিসংঘ ঘোষিত এসডিজি লক্ষ্য বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ রয়েছে ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় দক্ষতাসম্পন্ন আমলাতন্ত্র কি আমাদের দেশে তৈরি হচ্ছে?

অধ্যাপক . এসএমএ ফায়েজ: আমরা অনুন্নত দেশের পরিচিতি থেকে বেরিয়ে এসে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে অংশ নিতে যাচ্ছি। সেখানে মেধার প্রয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। আমাদের সব সময় মনে রাখতে হবে যে, আমরা একটি প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে বসবাস করছি। এ প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য সেভাবেই তৈরি হতে হবে। এজন্য সবার আগে আমাদের মেধাবী প্রজš§কে বিশেষভাবে কাজে লাগাতে হবে।

শেয়ার বিজ: বর্তমানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম কম যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি ব্যাপক আলোচিত হচ্ছে এতে উচ্চশিক্ষার মানে ধস নামছে বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা বিষয়টিকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

অধ্যাপক . এসএমএ ফায়েজ: বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাজ শুধু উচ্চশিক্ষা প্রদান করা নয়, সমাজ ও দেশের বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করে সেখান থেকে উত্তরণের পথ বাতলে দেওয়াটাও বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য, তাই গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকারকে দারুণভাবে এগিয়ে আসতে হবে। একইসঙ্গে একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে কাক্সিক্ষত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও একমাত্র মেধার বিষয়টি প্রাধান্য পাবে, এটিই আমাদের প্রত্যাশা।

বিভিন্ন সময়ে শোনা যায়, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা দারুণভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। একজন উপাচার্যের প্রধান দৃষ্টিভঙ্গি হওয়া উচিত মেধাকে লালন-পালন করা। মেধা উপেক্ষিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সেখান থেকে বেরিয়ে আসা খুবই কষ্টকর। শুধু তা-ই নয়, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়েও সবচেয়ে মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যদি সম্ভব না হয়, তাহলে আমাদের সন্তানরা শৈশব থেকেই মেধার মাধ্যমে উঠে আসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে। প্রকৃত শিক্ষা লাভ থেকেও তারা দারুণভাবে বঞ্চিত হবে। সবচেয়ে মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই তাদের বেতনের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। যাতে সবচেয়ে মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা প্রাথমিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার প্রতি যথাযথভাবে আকৃষ্ট হয়। দেশের জনগণ প্রকৃতভাবে শিক্ষিত হলে দেশ এগিয়ে যাবে বহুদূর। এটিই বতর্মান বিশ্বের একটি স্বীকৃত শর্ত।

শেয়ার বিজ: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী গত এক বছরে দেশের উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা এক লাখ বেড়েছে এছাড়া সার্বিক বেকারত্বও বেড়েছে বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

অধ্যাপক . এসএমএ ফায়েজ: বাংলাদেশে সাধারণ শিক্ষার বাইরে ভোকেশনাল বা টেকনিক্যাল ট্রেনিংয়ের সুবিধাগুলো সৃষ্টি হয়েছে। তার প্রতিও যেন আমাদের সন্তানরা আকৃষ্ট হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। যোগ্য কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন জনশক্তি তৈরিতে এটি সহায়ক হবে। যেটা এ দেশের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। এর মাধ্যমে বেকারত্ব থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে মনে করি। এক্ষেত্রেও সরকারকে কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান আরও বেশি তৈরি করা হয়। এর মাধ্যমে আমরা আরও বেশি দক্ষ জনশক্তি বিদেশে পাঠাতে পারব, যা বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা রাখবে। এক্ষেত্রে দেশের চাহিদার সঙ্গে সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্যান্য দেশের চাহিদার কথা মাথায় রাখতে হবে।

শেয়ার বিজ: গত কয়েক বছর ধরে পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচনা হচ্ছে বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখেন?

অধ্যাপক . এসএমএ ফায়েজ: আমরা অনেক দিন ধরে দেখে আসছি বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় এমনকি প্রাথমিকেও প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটছে। বিষয়টি এ পর্যায়ে গড়িয়েছে যে, ঘোষণা দিয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে। এ প্রশ্ন দিয়েই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ফাঁস হওয়া প্রশ্নে নেওয়া পরীক্ষাকে কোনোভাবেই পরীক্ষা বলা যায় না। আমাদের প্রত্যাশা ছিল, যেমন করেই হোক এটি বন্ধ করতে হবে।

আশার কথা হলো, চলতি এইচএসসি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি তেমন শোনা যায়নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ করার লক্ষ্যে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহণ করছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। আমরা মনে করি তারা দেশবাসীকে আশ্বস্ত করতে পারবে যে, ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রশ্ন ফাঁস হবে না। প্রশ্নপত্র কী ধরনের হবে, তা প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি মাথায় না রেখে মেধা যাচাইয়ের বিষয়টি নিয়ে বেশি চিন্তা করতে হবে। প্রশ্নপত্র কোনোভাবেই ফাঁস হবে না, এটি নিশ্চিত করাই হবে করণীয়। প্রশ্ন ফাঁস হবে বলে প্রশ্নের নিয়ম বা স্টাইলটাই বদলে দিলাম, বিষয়টা যেন এমন না হয়। প্রশ্ন ফাঁস হবে না, এটাই মূল কথা।

শেয়ার বিজ: সম্প্রতি রাজধানীর সাতটি কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়েছে এর পক্ষেবিপক্ষে ব্যাপক আন্দোলনও হয়েছে একজন শিক্ষার্থী চোখও হারিয়েছেন বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?

অধ্যাপক . এসএমএ ফায়েজ: ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যখন সৃষ্টি হয়, তখন এ বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ এজন্য বলা হতো যে, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে এ বিশ্ববিদ্যালয়কে আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল। কোনো কলেজকে তখন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে অধিভুক্ত করা হয়নি। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর এ অঞ্চলের অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। যে কারণে এ অঞ্চলের যেসব কলেজ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ছিল, সেগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়ে যায়। এর মধ্য দিয়ে আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চরিত্র থেকে বেরিয়ে আসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

আবার বাংলাদেশ সৃষ্টির পরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সৃষ্টির মধ্য দিয়ে এসব কলেজ এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়। তবে যেসব বিষয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হতো না, সেগুলো বিশেষ করে গার্হস্থ্য অর্থনীতি, চিকিৎসা বিজ্ঞান, টেক্সটাইল ও লেদার টেকনোলজির মতো বিষয়ের কলেজগুলো সেগুলো ‘কনস্টিটিউয়েন্ট কলেজ’ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত থেকে যায়। তবে সম্প্রতি হঠাৎ করেই দেখা গেল রাজধানীর সাতটি কলেজের লেখাপড়ার মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তাদের অধিভুক্ত করা হয়। স্বাভাবিকভাবেই এ বিষয়টি উঠে আসে যে, আমরা কি শুধু এ সাত কলেজেরই মান ধরে রাখার চেষ্টা করব নাকি সামগ্রিকভাবে সব কলেজের মান ধরে রাখতে হবে। এখানে আমরা লক্ষ করেছি, এ বিষয়ে যথেষ্ট আন্দোলন হয়েছে। আমি মনে করি, সম্পূর্ণ বিষয়টি নিয়ে একটি সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার লক্ষ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন। যেখানে সুচিন্তিত মতামতের মধ্য দিয়ে প্রকৃতপক্ষেই যেটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ বা বেশি প্রয়োজনীয় সেটি বেরিয়ে আসবে। এমন আলোচনা আগে অনুষ্ঠিত হলে এ ধরনের জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না।

শেয়ার বিজ: দীর্ঘ প্রায় ২৮ বছর ধরে ডাকসু নির্বাচন হচ্ছে না তবে সম্প্রতি ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের বেশ জোরালো আন্দোলন করতে দেখা গেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য হিসেবে কী কারণে দীর্ঘদিন ডাকসু নির্বাচন হচ্ছে না বলে আপনি মনে করেন?

অধ্যাপক . এসএমএ ফায়েজ: সর্বশেষ ১৯৯০ সালে ডাকসু নির্বাচনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান মিঞা। তবে তিনি দ্বিতীয়বার নির্বাচন দেওয়ার পদক্ষেপ গ্রহণ করেও পিছিয়ে আসেন। পরবর্তী সময়ে যারা উপাচার্য হয়েছিলেন অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দিন আহমদ, অধ্যাপক ড. এ কে আজাদ চৌধুরীÑতারা ডাকসু নির্বাচনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেও পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন। আমার কাছে মনে হয়েছে, ডাকসু নির্বাচনের বিষয়টি এখন এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে নির্বাচন গ্রহণকারী কোনো পক্ষই হারতে রাজি নয়।

যদিও আমি অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলাম। এর মধ্যে নিয়মিত সমাবর্তন করা, প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয় দিবস পালনের ক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়া, অধ্যাপক ইমেরিটাস পদে সর্বসম্মতভাবে আটজন বিশিষ্ট অধ্যাপককে নিয়োগ দেওয়ার মতো বিষয়গুলো ছিল। যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে চলছিল তখন ডাকসু নির্বাচনের ঘোষণা দিয়ে সে পরিবেশ নষ্ট হতে পারে, এমনটি দৃশ্যমান হওয়ার কারণে ডাকসু নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়া থেকে বিরত ছিলাম। আগের প্রচেষ্টাগুলো থেকে ফিরে না এলেও ডাকসু নির্বাচনের ঘোষণা দিয়ে হয়তো ফিরে আসতে হবে। তা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশের ক্ষেত্রে একটি অন্তরায় হওয়ার সুযোগ ছিল বলে প্রতীয়মান হয়েছিল।

তবে সময়ের সঙ্গে অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়। ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ডাকসুর বিষয়ে আগের চেয়ে সচেতনতা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন যেটি বেশি প্রয়োজন তা হচ্ছে, সব ছাত্র সংগঠন ও ছাত্রছাত্রী আবাসিক হলগুলোয় নির্বিঘেœ থাকতে পারেÑএমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি হওয়া। এটি সম্ভব না করে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা হয়তো সম্ভব হবে, তবে তা কতটুকু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় হবে সে সন্দেহ অবশ্যই থেকে যায়। আমি আশা করব, বর্তমান উপাচার্য এসব দিক যথাযথ গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন। এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোকে সর্বোচ্চ সচেতনতার মধ্য দিয়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া।

শেয়ার বিজ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ইনস্টিটিউটে এখন সান্ধ্যকালীন কোর্সে বেশ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে নিয়ে সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন এবং এটি বন্ধের দাবিতে আন্দোলনও করেছেন নিয়ে আপনার বক্তব্য কী?

অধ্যাপক . এসএমএ ফায়েজ: বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গুণগত শিক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষকরা এগুলো ধরে রাখতে পারছে কিনা বা বিশ্ববিদ্যালয় তা নিশ্চিত করতে পারছে কিনা, তা অবশ্যই ভেবে দেখতে হবে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গগুলো জনগণের কল্যাণে কাজ করছে এবং ‘পাবলিক গুডস’ কনসেপ্ট ধারণ করেই এগিয়ে যাচ্ছে। এখানে ‘ইউজার-টু-পে (User-to-pay)’ বিষয়টি কাজ করার কথা নয়। ‘ইউজার-টু-পে’ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কোনোভাবেই বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিচালিত হতে পারে না। সেখানে সান্ধ্যকালীন কোর্স হতে পারে, যেখানে বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি কোনোভাবেই কাজ করবে না বা শিক্ষার গুণগত মানের প্রশ্নে কোনোভাবেই আপস করা হবে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এটি আরও বেশি প্রযোজ্য এজন্য যে, এ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে জনগণের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। আগে সান্ধ্যকালীন কোর্স অনেক সহনীয় পর্যায়ে ছিল। এটি এখন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে অনেকেই মনে করে।

শেয়ার বিজ: স্যার আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ

অধ্যাপক . এসএমএ ফায়েজ: আপনাকেও ধন্যবাদ।