সমাজে প্রতিফলিত হোক ইজতেমার শিক্ষা

প্রতিবারের মতো এবারও রাজধানীর অদূরে টঙ্গীর তুরাগতীরে শুরু হয়েছে বিশ্ব ইজতেমা। বিগত কয়েক বছরের মতো এবারও দুই পর্বে অনুষ্ঠিত হবে ইজতেমা। প্রথম পর্ব শেষ হবে রোববার আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে; এর পর চার দিন বিরতি দিয়ে ১৯ জানুয়ারি শুরু হবে দ্বিতীয় পর্ব। ইসলামের মৌলিক মূল্যবোধগুলো প্রচারের উদ্দেশ্য সামনে রেখে গত শতকের বিশের দশকে ভারতের ইসলামি পণ্ডিত মুহাম্মদ ইলিয়াস কান্ধলভি কর্তৃক চালু করা এ সংস্কারবাদী আন্দোলন সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু নেই। স্থানীয়দের কাছে এটি নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ারও প্রয়োজন নেই বোধহয়। রাজধানীর প্রান্তে তুরাগতীরে প্রতি বছর লাখ লাখ মুসল্লির সরব উপস্থিতিই এর জনপ্রিয়তার জাজ্বল্যমান প্রমাণ। এর ব্যত্যয় দেখা যাচ্ছে না এ বছরও। দেশজুড়ে তীব্র শীত চলছে এখন। আর এটা উপেক্ষা করেই দলে দলে মুসল্লি উপস্থিত হচ্ছেন ইজতেমা ময়দানে। খেয়াল করার বিষয়, ইজতেমায় কেবল স্থানীয় মুসল্লিরাই অংশ নিচ্ছেন না; তাদের মাঝে বিদেশি মুসল্লির সংখ্যাও প্রচুর। যেহেতু ইজতেমার সঙ্গে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিও অনেকাংশে যুক্ত, সেহেতু কর্তৃপক্ষের কাছে প্রত্যাশাÑআগত সব মুসল্লির সুবিধাদির প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখা। প্রতি বছরই এ উপলক্ষে  প্রশাসন তথা সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে। আয়োজনকারীরা বছরের পর বছর ইজতেমাটি আয়োজন করার ফলে তাদেরও এক ধরনের দক্ষতা তৈরি হয়েছে লাখ লাখ মুসল্লির জন্য প্রয়োজনীয় সেবা প্রদানের ব্যাপারে; অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে তুরাগের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের বসবাসকারীরাও। সেজন্যই সম্ভবত ক’বছর ধরে ইজতেমা ঘিরে তেমন কোনো অব্যবস্থাপনার খবর মিলছে না। এবার প্রধান ভাবনা হচ্ছে রেকর্ডভাঙা শীত নিয়ে। প্রশাসনের উচিত এদিকে নজরদারি বাড়ানো যেন প্রচণ্ড শীত মুসল্লিদের সেখানকার প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ডে তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে না পারে। এ লক্ষ্যে করণীয় নির্ধারণ ও তার বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টরা পিছপা হবেন না বলেই বিশ্বাস।

প্রতিবারের মতো এবারও আমরা বেশি করে চাইবÑতাবলিগ জামাতের মূল শিক্ষা যেন দেশে দেশে সমাজ ও জীবনে প্রতিফলিত হয়। গতবার ইজতেমা ঘিরে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছিল। এবারও তেমন একটি অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা রয়েছে, যা দ্রুততার সঙ্গে অ্যাড্রেস করা হয়। শেয়ার বিজ বিশ্বাস করে, অমন দু-একটি ঘটনার পক্ষে তাবলিগ জামাতের মূল ঐক্যে জোরালো প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব নয়। সেটা করেওনি। তা সত্ত্বেও ইজতেমার মুরব্বিদের ভবিষ্যতে আরও বেশি সচেতন হওয়া উচিত এসব ব্যাপারে। সবারই মাথায় রাখা দরকার, তাবলিগ অরাজনৈতিক হওয়ার কারণেই এর জনপ্রিয়তা এত বেশি এবং একই কারণে এটি ক্ষতিকর ও কৌশলী রাজনীতির সামনে কিছুটা হলেও নাজুক। ফলে খেয়াল রাখতে হবে, এটি যেন কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী বা মহলের হাতিয়ার হয়ে না পড়ে। ধর্মীয় অনুশাসনের বাইরেও তাবলিগ জামাতের প্রধান শিক্ষা হলো মুসলিম উম্মাহর ঐক্য। ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ হজের পরই সবচেয়ে বেশি মুসলিম এ জমায়েতে শামিল ও এর মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ হন। তাবলিগ জামাতের আরেকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে সহিষ্ণুতা। আমরা আন্তরিকভাবে চাইব, বিশ্ব ইজতেমা যে শিক্ষা মুসল্লিদের দিতে চায় সেগুলো তো বটেই, এর বাইরেও তাবলিগের যে সাংস্কৃতিক শিক্ষা রয়েছে, সেটি সবার মনকে প্রভাবিত করুক। এও প্রত্যাশা, যে আকাক্সক্ষা নিয়ে দলে দলে মুসল্লি বছরের পর বছর যোগদান করছেন ইজতেমায়, তাদের সেই মনোবাঞ্ছা পূরণ হোক। আর বিশ্ব ইজতেমার শিক্ষা সমাজে পরমতসহিষ্ণুতা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও ঐক্য বাড়িয়ে তুলুক। নানা কারণেই এর অভাব কিন্তু আরও বেশি করে পরিলক্ষিত হচ্ছে দেশে দেশে। আর তাই মানুষের মধ্যে এর চাহিদাও বেড়েছে।